জার্মানির ঐক্য দিবসে বার্লিন প্রাচীর স্মৃতিসৌধের প্রতীকী দেয়ালের দুই পাশে দাঁড়িয়ে দুই তরুণ দর্শনার্থী। বার্লিন, জার্মানি। ৩ অক্টোবর ২০২৬
জার্মানির ঐক্য দিবসে বার্লিন প্রাচীর স্মৃতিসৌধের প্রতীকী দেয়ালের দুই পাশে দাঁড়িয়ে দুই তরুণ দর্শনার্থী। বার্লিন, জার্মানি। ৩ অক্টোবর ২০২৬

দুই জার্মানি এক হওয়ার ৩৬ বছর পর কেন সেখানে উগ্র ডানপন্থার উত্থান হচ্ছে

একসময় একটি দেয়াল জার্মানিকে দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিল। একদিকে ছিল পশ্চিম জার্মানি, অন্যদিকে পূর্ব জার্মানি। ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ভিন্ন অর্থনীতি ও ভিন্ন জীবন-অভিজ্ঞতার মধ্যে বেড়ে উঠেছিল দুই প্রজন্মের মানুষ। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর সেই বিভাজন অবসানের পথ খুলে যায়। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর বার্লিনে ঐতিহাসিক জার্মান রাইখস্টাগ বা বুন্দেসটাগের ভবনের সামনে উৎসবমুখর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একীভূত হয়।

৩৬ বছর পর সেই ঐতিহাসিক ঐক্যের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে জার্মানি। তবে এবার শুধু উৎসব নয়, আলোচনায় উঠে আসছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—পুনরেকত্রীকরণের মাধ্যমে যে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেগুলো আজ কতটা নিরাপদ?

সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে পূর্ব জার্মানিতেও সেই আন্দোলনের ঢেউ এসে লেগেছিল। ১৯৯০ সালের পুনরেকত্রীকরণ শুধু দুটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক একীকরণ ছিল না; ছিল ঐক্যের সঙ্গে নতুন প্রত্যাশা। পূর্ব জার্মানির মানুষের জন্য তা ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ। তখন সবাই বিশ্বাস করেছিল, পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান এবং পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনেরও স্থায়ী বিজয় ঘটবে।

কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় পর সেই আশাবাদে ভাটা পড়েছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অনাস্থা এবং উগ্র ডানপন্থার উত্থান জার্মান গণতন্ত্রের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। জার্মানির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের একটি কারণ উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির শক্তিশালী হয়ে ওঠা। তবে এই প্রবণতাকে এখন কেবল পূর্ব জার্মানির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলেও ইদানীং উগ্র ডানপন্থা উল্লেখযোগ্যভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে।

জার্মানির ঐক্যের ৩৬তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন উপলক্ষে ব্রেমেন টাউন হলের সামনে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। ব্রেমেন, জার্মানি। ৩ অক্টোবর ২০২৬

৩৬ বছর আগে পুনরেকত্রীকরণের পর পূর্ব জার্মানির মানুষের কাছে পশ্চিমের মতো সমৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি তৈরি হয়েছিল, বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে কঠিন ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ৪১ (১৯৪৯-১৯৯০) বছর ধরে চলা দুই ধরনের অর্থনৈতিক ও সমাজ ব্যবস্থা সহসাই এক করে ফেলা সহজ কাজ ছিল না। পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে দ্রুত রূপান্তরের ফলে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যাপক বেকারত্ব দেখা দেয়।

১৯৯০ সালের পর বহু পূর্ব জার্মান প্রথমবারের মতো বেকারত্বের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। এর প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে নয়, মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পড়ে।

পূর্বের মানুষের হতাশা ক্রমেই বাড়তে থাকে। বিশেষ করে পূর্ব জার্মানির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারীকরণের দায়িত্ব পাওয়া ট্রইহ্যান্ডআনস্টাল্ট দ্রুতই আশার প্রতীক থেকে তীব্র সমালোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই অভিজ্ঞতার ক্ষত এত দিন পর আজও পুরোপুরি মুছে যায়নি; কিন্তু আজকের জার্মানিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য শুধু পূর্বাঞ্চলে নেই। পশ্চিম জার্মানিতেও এমন অঞ্চল রয়েছে, যেখানে মানুষ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে একের পর এক সংকটের প্রভাবে বদলে গেছে জার্মান সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

গত দুই দশকে জার্মান সমাজ একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা, ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ, ২০০৭–০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ, জলবায়ু সংকট, করোনা মহামারি, অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক ও ট্রাম্পের ক্ষমতায়ন—সব মিলিয়ে সমাজে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে জার্মানির রাজনীতিতে যে স্থিতিশীলতার ধারণা ছিল, তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর মানুষের আস্থায়ও টান পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক অসন্তোষের জায়গা তৈরি হয়েছে। আর সেই অসন্তোষকে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতি কাজে লাগাচ্ছে—এমন রাজনৈতিক বিশ্লেষণও উঠে আসছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উগ্র ডানপন্থী ও অভিবাসীবিরোধী দল অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড বা এএফডির ভোটারদের বড় অংশ এখন পশ্চিম জার্মানিতেও রয়েছে। ফলে পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে উগ্র ডানপন্থার উত্থানকে কেবল পূর্ব জার্মানির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।

জার্মানির ঐক্য দিবসের ৩৬তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে ব্রেমেন টাউন হলের সামনে (বাঁ থেকে) শার্লট মের্ৎস, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস, পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ বুন্দেসটাগের প্রেসিডেন্ট ইউলিয়া ক্লকনার, ফার্স্ট লেডি এলকে বুডেনবেন্ডার, প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার, উচ্চকক্ষ বুন্দেসরাতের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেয়াস বোভেনশুল্টে ও কার্স্টিন ক্রুগার। ব্রেমেন, জার্মানি। ৩ অক্টোবর ২০২৬

হতাশা কোনো মানুষের উগ্র ডানপন্থী দলকে ভোট দেওয়ার একটি ব্যাখ্যা হতে পারে; কিন্তু তা একমাত্র কারণ নয়। সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, জার্মানির ঐক্যের ইতিহাসকে শুধু ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর একটি দিনের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। এটি একই সঙ্গে সাফল্যের, প্রত্যাশার, হতাশার, ভুল সিদ্ধান্তের এবং নতুন করে নিজেদের প্রশ্ন করার ইতিহাস। জার্মানির ঐক্যের ৩৬ বছর তাই অর্জন, অস্বস্তি ও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সময়।

এ বছর জার্মানির ঐক্য দিবসের কেন্দ্রীয় আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে বন্দর শহর ব্রেমেন। ২ থেকে ৪ অক্টোবর উত্তর জার্মানির এই শহরে উদ্‌যাপিত হবে নানা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে থাকবে রাজনৈতিক বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নাগরিক মিলন। পুনরেকত্রীকরণ অনুষ্ঠানে এবারের স্লোগান ‘সম্মিলিত শক্তি, একটি দেশ’।