রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রেমলিনে আর্চেঞ্জেল ক্যাথেড্রালে প্রার্থনা সভায় যোগ দিয়েছেন। গত আগস্টে এখানে রাজপুত্রের দেহাবশেষ পাওয়া যায়
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রেমলিনে আর্চেঞ্জেল ক্যাথেড্রালে  প্রার্থনা সভায় যোগ দিয়েছেন। গত আগস্টে এখানে রাজপুত্রের দেহাবশেষ পাওয়া যায়

বিশ্লেষণ

রাশিয়া কেন রাজপুত্রের দেহাবশেষ যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়েছে

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধরত রুশ সেনারা শীতের আগে নিজেদের অবস্থান গুছিয়ে নিচ্ছেন। ঠিক একই সময়ে ব্যতিক্রমী একধরনের সহায়তা পাচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের কাছে পাঠানো হয়েছে মস্কোর হয়ে ছয় শ বছরেরও আগে যুদ্ধ করা এক রাজপুত্রের দেহাবশেষের একটি অংশ।

ওই রাজপুত্রের নাম দিমিত্রি দনস্কয়। ১৩৮০ সালে কুলিকোভোর যুদ্ধ জয়ের জন্য রাশিয়ায় বিশেষ সম্মান পান তিনি। চলতি মাসের শুরুর দিকে তাঁর দেহাবশেষ থেকে ডান হাতের একটি অংশ ইউক্রেনে পাঠানো হয়। সেটি এখন দেশটিতে রাশিয়ার দখলে থাকা বিভিন্ন অঞ্চলে নেওয়া হচ্ছে।

দিমিত্রি দনস্কয়কে ‘সাধু সেনাপতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে রুশ অর্থোডক্স চার্চের ধর্মীয় নেতৃত্ব। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই ‘সাধু সেনাপতি’ অদৃশ্যভাবে রুশ সেনাদের সঙ্গে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ থাকবেন। এই ডান হাত দিয়েই তিনি কুলিকোভোর যুদ্ধে তলোয়ার চালিয়েছিলেন।

গত আগস্টে ক্রেমলিনের আর্চেঞ্জেল ক্যাথেড্রালে সংস্কারের সময় দনস্কয়ের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একে ‘অনন্য আবিষ্কার’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। আর রুশ ধর্মীয় নেতা প্যাট্রিয়ার্ক কিরিল উল্লেখ করছিলেন একে ‘ঈশ্বরের বিশেষ সংকেত’ বলে। যদিও অনেক ধর্মযাজকই এটি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর সমালোচনা করেছেন।

যুদ্ধে কোনো দেহাবশেষ পাঠানোর বিষয়টি অদ্ভুত মনে হতে পারে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রণক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে সম্ভাব্য সব ধরনের কৌশল খাটিয়েছে মস্কো। এই যুদ্ধকে ‘ঈশ্বর অনুমোদিত’ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে। ফলে পুতিনের ক্রেমলিন ও রুশ অর্থোডক্স চার্চের সম্পর্ক যেকোনো সময়ের তুলনায় ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাজপুত্র দনস্কয়ের দেহাবশেষ পাওয়াকে একে ‘অনন্য আবিষ্কার’ হিসেবে উল্লেখ করেন

যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ডহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সের্গেই চাপনিন বলেন, চার্চ রাষ্ট্রের সঙ্গে এমনভাবে একীভূত হয়ে গেছে যে দুটিকে আলাদা করা কঠিন। দনস্কয়ের মতো ঐতিহাসিক যোদ্ধাকে সামনে আনাটা যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের সংগঠিত করার ও মনোবল বাড়ানোর কৌশল হিসেবে কাজ করতে পারে। এর মাধ্যমে দনস্কয়ের মতোই রুশ সেনাদের মাতৃভূমির রক্ষক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

কারও কারও কাছে বিষয়টি কৌশলী মনে হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা অনেকেই কিন্তু সত্যিই ধর্ম পালনের দিকে ঝুঁকেছেন। ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে যাওয়া রাশিয়ার এক সেনাসদস্য সিএনএনকে বলেন, ‘সবকিছু যখন ভালো চলে, তখন আমরা সৃষ্টিকর্তার কথা বলি না। কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হলে সবাই সৃষ্টিকর্তার কথা বলি।’

ওই সেনাসদস্য বলেন, রাশিয়া থেকে যেসব জিনিস পাঠানো হয়েছে, সেগুলো দিয়ে একটি অস্থায়ী গির্জা তৈরি করা হয়েছে। সেনারা অভিযানে যাওয়ার আগে সেখানে প্রার্থনা করেন। ওই গির্জার ধর্মযাজকেরা নিয়মিত সেনাসদস্যদের কাছে ও তাঁদের হাসপাতালে যান। আরেক সেনাসদস্য বলেন, প্রার্থনা করা বা কোনো পবিত্র বস্তু স্পর্শ করার সুযোগ পেলে তা মানসিকভাবে কাজে লাগে।

তবে সবাই রাজপুত্রের দেহাবশেষ ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোকে সমর্থন করছেন না। ইউক্রেনে পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধরত এক রুশ সেনার ভাষায়, ‘একবিংশ শতাব্দীতে এসে সমস্যা সমাধানের জন্য এটি খুবই অপ্রচলিত একটি সমাধান। আমার মনে হয়, এই সামরিক অভিযানে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের মায়েদের কাছেই এসব ধর্মীয় জিনিসের প্রয়োজন বেশি।’