
রাশিয়ার অধিকৃত পূর্ব ইউক্রেনে ড্রোন হামলার প্রতিশোধ নিতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নজিরবিহীন ও ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। গতকাল রোববার ভোরে চালানো এ হামলায় দুই শিশুসহ অন্তত চারজন নিহত এবং চার শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, এই হামলায় রাশিয়া তাদের পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওরেসনিক’ ব্যবহার করেছে।
ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দিবাগত রাত থেকে শুরু হওয়া এই সমন্বিত হামলায় রাশিয়া মোট ৬০০টি ড্রোন এবং ৯০টি বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। আকাশ, সমুদ্র ও স্থলভাগ থেকে এই বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এর মধ্যে ৫৪৯টি ড্রোন এবং ৫৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস বা জ্যাম করতে সক্ষম হলেও বাকিগুলো বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। ১৯টি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে বলেও জানানো হয়।
রাজধানী কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, রাজধানীতেই ২ জন নিহত এবং ৫৬ জন আহত হয়েছেন। শহরের প্রতিটি জেলাতেই কমবেশি ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন রয়েছে। একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর সেখানে আগুন ধরে যায় এবং একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্রে হামলার কারণে মানুষ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে আটকা পড়েন। এ ছাড়া কিয়েভের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রধান জানিয়েছেন, সেখানেও ২ জন নিহত ও ৯ জন আহত হয়েছেন। হামলার তীব্রতায় শহরের কেন্দ্রস্থল ও সরকারি দপ্তরের কাছাকাছি ভবনগুলো কেঁপে ওঠে। বহু বাসিন্দা জীবন বাঁচাতে পাতাল রেলস্টেশনে আশ্রয় নেন। রাজধানী ছাড়াও চেরকাসি অঞ্চলে ১১ জন এবং দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে ৭ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া মধ্য ইউক্রেনের বিলা তেরকভা শহরে তাদের অত্যাধুনিক ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে। তিনটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র একটি পানি সরবরাহ কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে, একটি বাজার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এবং ডজনখানেক আবাসিক ভবন ও সাধারণ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওরা আসলেই উন্মাদ।
ইউক্রেনে রাশিয়ার এই ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরে প্রথমবারের মতো একাধিক ওয়ারহেড (বোমা বহনে সক্ষম অংশ) সমৃদ্ধ ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়া। গত জানুয়ারিতে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় লভিভ অঞ্চলে দ্বিতীয়বারের মতো এটি ব্যবহার করা হয়।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ওরেসনিক শব্দের অর্থ ‘হেজেলনাটগাছ’ (একধরনের বাদামগাছ)। এই ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের চেয়ে ১০ গুণ গতিতে (ম্যাক ১০) ছুটতে পারে এবং মাটির নিচে ‘তিন, চার বা তার চেয়ে বেশি তলা’ গভীর বাংকার ধ্বংস করতে সক্ষম।
পুতিন আরও জানান, অস্ত্রটি ‘উল্কাপিণ্ডের মতো’ ছুটে চলে এবং এটি যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ফাঁকি দিতে সক্ষম। এমনকি সাধারণ ওয়ারহেড যুক্ত করলেও এ ধরনের কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা পারমাণবিক হামলার মতোই বিধ্বংসী হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার রাতে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা পূর্ব ইউক্রেনের স্টারোবিলস্ক শহরের একটি কলেজের ছাত্রাবাসে ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। মস্কোর দাবি, ওই হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৪২ জন আহত হন, যাদের অধিকাংশই তরুণী। এই ঘটনার পর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, এর জন্য দায়ীদের ‘অনিবার্য ও কঠোর শাস্তি’ পেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও কিয়েভে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছিল।
২০২২ সালে ইউক্রেনে সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু করার পর থেকে রাশিয়া প্রায় প্রতিদিনই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়ে আসছে। তবে রোববারের এই হামলাকে যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ রাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্যদিকে রাশিয়া বরাবরের মতোই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেঙ্কো জানিয়েছেন, আবাসিক ভবনসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি জেলার ৪০টি স্থানে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাজারে ২২ বছর ধরে কাজ করা কিয়েভের ৫৫ বছর বয়সী বাসিন্দা সভেতলানা ওনোফ্রিচুক বলেন, ‘এটি ছিল এক ভয়ানক রাত। পুরো যুদ্ধের সময়ে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি আর কখনো দেখা যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘খুব দুঃখের সঙ্গে এখন আমাকে কিয়েভ ছাড়তে হচ্ছে। এখানে আর থাকার কোনো উপায় নেই। আমার কাজ শেষ, সব শেষ, সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’
হামলার প্রত্যক্ষদর্শী কিয়েভের ৭৪ বছর বয়সী বাসিন্দা ইয়েভহেন জোসিন বলেন, ‘বিস্ফোরণের পর ধাক্কায় আমরা ছিটকে পড়ি। তবে সৌভাগ্যবশত আমরা দুজনেই বেঁচে গেছি। কিন্তু আমার অ্যাপার্টমেন্টটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।’