
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে স্বাবলম্বী হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার লক্ষ্যে নিজেদের প্রথম আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন করেছে তুরস্ক।
এ ক্ষেপণাস্ত্রের বাংলা অর্থ বিদ্যুৎ বা বজ্র। তুর্কি ভাষায় নাম ‘ইলদিরিমহান’। এটি তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রে তৈরি করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার ইস্তাম্বুল এক্সপো সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘সাহা ২০২৬’ প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রদর্শনীতে ক্ষেপণাস্ত্রটির প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক নমুনা প্রদর্শন করা হয়।
ক্ষেপণাস্ত্রটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইলদিরিমহান ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বা সক্ষমতা ৬,০০০ কিলোমিটার (৩,৭২৮ মাইল)।
‘ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস’-এর মতে, যেসব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের (প্রায় ৩,৪১৮ মাইল) বেশি, সেগুলো আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা আইসিবিএম হিসেবে গণ্য করা হয়।
তুরস্ক থেকে উৎক্ষেপণ করা হলে এ ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হবে। ইলদিরিমহানের সর্বোচ্চ গতি হবে শব্দের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি (ম্যাক ২৫)। এতে চারটি রকেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর জ্বালানি হিসেবে থাকছে লিকুইড নাইট্রোজেন টেট্রঅক্সাইড। ক্ষেপণাস্ত্রটি ৩ হাজার কেজি ওজনের যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে পারবে।
তুরস্ক এখনো এ ক্ষেপণাস্ত্রের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেনি। গত মঙ্গলবার ইস্তাম্বুলে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের বলেন, ‘বর্তমান যুগে যেখানে অর্থনৈতিক ব্যয় একটি বড় ধরনের মারণাস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, সেখানে তুরস্ক তার মিত্রদের শুধু অস্ত্র নয়, বরং প্রযুক্তি ও একটি টেকসই নিরাপত্তাব্যবস্থা উপহার দিচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তুরস্কের এ আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড’-এর আঞ্চলিক পরিচালক ওজগুর উনলুহিসারসিকলি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমার মতে, এ মুহূর্তে কোনো তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করার জন্য তুরস্কের এই আইসিবিএমের প্রয়োজন নেই। তাই ক্ষেপণাস্ত্রটি নয়, বরং এটি তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করাই তুরস্কের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত
ইস্তাম্বুলভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক বুরাক ইলদিরিম মনে করেন, আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের এ নকশা পরোক্ষভাবে তুরস্কের বেসামরিক মহাকাশ গবেষণায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে এটি তুরস্কের নিজস্ব রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর বাণিজ্যিক প্রকল্প ‘ডেল্টা-ভি’র ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
বুরাক ইলদিরিম আল-জাজিরাকে আরও বলেন, ‘মহাকাশে কক্ষপথ স্পর্শ করা ও আন্তমহাদেশীয় পথ পাড়ি দেওয়ার পদার্থবিজ্ঞান একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। উভয় ক্ষেত্রেই একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। সেই অর্থে, একটি শক্তিশালী মহাকাশ গবেষণা কর্মসূচি থাকলে আইসিবিএম তৈরির সক্ষমতা অর্জন করা স্বাভাবিক বিষয়, যদিও রাজনৈতিকভাবে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।’
ক্ষেপণাস্ত্রটি ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ইলদিরিমহানের সর্বোচ্চ গতি শব্দের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি (ম্যাক ২৫)। এতে চারটি রকেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। ৩,০০০ কেজি ওজনের যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে পারবে ক্ষেপণাস্ত্রটি।
উচ্চাভিলাষ নাকি বাস্তবতা
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক বুরাক ইলদিরিম সতর্ক করে বলেন, ‘সাহা ২০২৬ প্রদর্শনীতে যা দেখানো হয়েছে, সেটি মূলত একটি প্রাথমিক ধারণা বা কৃত্রিম নমুনা। এই ক্ষেপণাস্ত্রের কোনো সফল উড্ডয়ন পরীক্ষা এখনো হয়নি এবং এর কারিগরি বিষয় সম্পর্কেও খুব কম তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি সম্ভাব্য যে স্থানটিতে (সোমালিয়ার একটি ঘাঁটি) এর পরীক্ষা হওয়ার কথা, সেটিও এখনো তৈরি হয়নি। তাই এটি বর্তমানে একটি ঘোষিত লক্ষ্য মাত্র, ব্যবহারের জন্য তৈরি কোনো সক্ষমতা নয়।’
তবে ‘মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো আলী বাকির মনে করেন, এই প্রোটোটাইপ বা নমুনাটি আঙ্কারার জন্য একটি বড় সাফল্য। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এই অগ্রগতি তুরস্কের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও সক্ষমতা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এর মাধ্যমে তুরস্ক বিশ্বের সেই হাতে গোনা কয়েকটি দেশের তালিকায় নাম লেখাল, যাদের কাছে এমন উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি রয়েছে।’
বাকির আরও বলেন, ‘এ মাইলফলক শুধু আঙ্কারার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিই নয়, বরং এটি তাদের সক্ষমতাকেও আরও শক্তিশালী করবে। এর মাধ্যমে তুরস্ক নিজেকে একটি প্রধান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।’
কেন ‘ইলদিরিমহান’ তৈরি করল তুরস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার মধ্যেই তুরস্ক তাদের এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করল। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও উপসাগরীয় অঞ্চলে এখনো একধরনের নৌ–যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে।
একদিকে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি করেছে। এরই মধ্যে ইসরায়েল লেবানন ও গাজা উপত্যকায় হওয়া যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘন করে চলেছে।
গত মার্চে ইরান যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছিল, তখন তুরস্ক জানিয়েছিল, ৪ ও ৯ মার্চ তাদের দিকে ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে। তবে তেহরান এ হামলার কথা অস্বীকার করে ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েল অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে এটি করে থাকতে পারে।
আমার মতে, এ মুহূর্তে কোনো তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় তুরস্কের এই আইসিবিএমের প্রয়োজন নেই। তাই ক্ষেপণাস্ত্রটি নয়, বরং এটি তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করাই তুরস্কের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।ওজগুর উনলুহিসারসিকলি, ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড’–এর আঞ্চলিক পরিচালক
ইসরায়েলি হুমকি ও তুরস্কের অবস্থান
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর ঠিক কয়েক দিন আগে ইসরায়েলি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট তুরস্ককে ইসরায়েলের জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এক সম্মেলনে বেনেট তুরস্ককে ইরানের মতো একটি আঞ্চলিক শক্তির অংশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘তুরস্কের দিক থেকে একটি নতুন হুমকি তৈরি হচ্ছে। আমাদের অবশ্যই তেহরান ও আঙ্কারার শত্রুতা—উভয়টির বিরুদ্ধেই ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে লড়তে হবে।’
গত কয়েক মাসে ইসরায়েলের অন্য রাজনীতিবিদেরাও তুরস্কের বিরুদ্ধে একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে সৌদি আরব ও মিসরের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির বিষয়টি ইসরায়েলকে ভাবিয়ে তুলেছে।
অন্যদিকে, তুরস্ক শুরু থেকেই গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যামূলক যুদ্ধের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর সহায়তায় স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের ওপর অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের (ইসরায়েলি সেটলার) সহিংসতার বিরুদ্ধেও আঙ্কারা সব সময় সোচ্চার।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রকাশ্য শত্রুতা থাকলেও তুরস্কের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক ছিল কিছুটা বাস্তবসম্মত বা কৌশলগত। তবে ২০০২ সালে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার পর থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ইসরায়েলের নীতি ও কর্মকাণ্ডের ক্রমাগত কঠোর সমালোচনা করে আসছেন।
গাজায় ইসরায়েলি হামলাকে ‘রক্তক্ষয়ী গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে গত মাসে ইস্তাম্বুলে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এরদোয়ান বলেন, ‘গণহত্যাকারী এই নেটওয়ার্ক কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিরীহ নারী ও শিশুদের হত্যা করছে।’
বিশেষজ্ঞ আলী বাকির আল-জাজিরাকে বলেন, শুধু ইসরায়েল ভীতিই আইসিবিএম তৈরির একমাত্র কারণ নয়। তবে এ ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন ও সময়কাল থেকে স্পষ্ট যে আঙ্কারা তাদের মিত্র ও শত্রু—উভয়কেই একটি বার্তা দিতে চায়। বিশেষত ‘ক্রমবর্ধমান আধিপত্যকামী ও আগ্রাসী ইসরায়েলের’ জন্য এটি একটি স্পষ্ট সংকেত।
বাকির আরও বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্রের এই উন্নয়ন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ও তাঁর দল একেপির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। তাঁদের মূল লক্ষ্য হলো, বিদেশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি শক্তিশালী দেশীয় শিল্প গড়ে তোলা। এটি কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ফল নয়, বরং তুরস্কের জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষার একটি দীর্ঘমেয়াদি সক্রিয় নীতি।’
বিশ্লেষকদের মতে, ‘ইলদিরিমহান’ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে তুরস্ক আসলে এই বার্তাই দিতে চায় যে তারা এমন এক দেশে পরিণত হতে চায়, যাকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে কেউ দমানোর বা চাপ দেওয়ার সাহস পাবে না।
সার্বভৌম সক্ষমতার প্রকাশ
ইস্তাম্বুলভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক বুরাক ইলদিরিম মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর ইসরায়েলের গভীর ও ভয়াবহ হামলার প্রবণতা আঙ্কারার নজরে এসেছে। তিনি বলেন, ‘তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ নেই, কিন্তু তাদের কৌশলগত স্বার্থ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। কয়েক বছরে রাজনৈতিক সম্পর্কেরও চরম অবনতি ঘটেছে। তুর্কি কর্মকর্তারা যখন দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা নিয়ে কথা বলেন, তখন তাদের ইঙ্গিত কোন দিকে, তা ভূরাজনৈতিক মানচিত্র দেখলেই বোঝা যায়।’
ইলদিরিম আরও বলেন, ‘তবে এ ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচনকে শুধু তুরস্ক-ইসরায়েল দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। তুরস্ককে একই সঙ্গে তার সীমান্তে যুদ্ধ-পরবর্তী সিরিয়া পরিস্থিতি, পূর্ব ভূমধ্যসাগরের অমীমাংসিত সংকট এবং ইরাকের উত্তেজনা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, সম্প্রতি ইরান থেকে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমার ওপর ন্যাটোর সহায়তায় ধ্বংস করা হয়েছে। তুরস্ক এখন অস্থিতিশীলতার বেড়াজালে বন্দী। তাই তারা বুঝতে পেরেছে যে জোটের বিমূর্ত আশ্বাসের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। তাদের এখন প্রয়োজন নিজস্ব ও কঠোর সার্বভৌম সক্ষমতা।’
বিশ্লেষকদের মতে, ‘ইলদিরিমহান’ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে তুরস্ক আসলে এই বার্তাই দিতে চায় যে, তারা এমন এক দেশে পরিণত হতে চায়, যাকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে কেউ দমানোর বা চাপ দেওয়ার সাহস পাবে না।
নিরাপত্তা ডকট্রিনে পরিবর্তন
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ‘হুরিয়েত ডেইলি নিউজ’-এর তথ্য অনুযায়ী, আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রটি উন্মোচনের সময় দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ বিশ্ব নিরাপত্তার চিত্র বদলে দিয়েছে।
ইয়াসার গুলের বলেন, ‘এ যুদ্ধগুলো থেকে পাওয়া তথ্য আমাদের নিরাপত্তা নীতি বা ডকট্রিন তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জও বাড়িয়ে দিয়েছে এগুলো।’
জার্মান মার্শাল ফান্ডের বিশেষজ্ঞ উনলুহিসারসিকলি মনে করেন, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং এর ফলে তৈরি হওয়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চ্যালেঞ্জগুলোই তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে ন্যাটোর সদস্য হিসেবে তুরস্কের জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের রপ্তানিমুখী নীতি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার ও সামগ্রিক শিল্প উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও আঙ্কারার অন্যতম লক্ষ্য।’
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলার প্রবণতা আঙ্কারার নজরে এসেছে। তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ নেই, কিন্তু তাদের কৌশলগত স্বার্থ সম্পূর্ণ বিপরীত। গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক সম্পর্কেরও চরম অবনতি ঘটেছে। তুর্কি কর্মকর্তারা যখন দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা নিয়ে কথা বলেন, তখন তাদের ইঙ্গিত কোন দিকে, তা ভূরাজনৈতিক মানচিত্র দেখলেই বোঝা যায়।
তুরস্কের সামরিক শক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ
ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী তুরস্কের। বর্তমানে দেশটি বিশ্বজুড়ে একটি উল্লেখযোগ্য অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে সামরিক খাতে এ স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা তুরস্ক দীর্ঘ সময় ধরেই করে আসছে।
১৯৮৫ সালে ‘প্রতিরক্ষা শিল্প উন্নয়ন ও সহায়তা প্রশাসন কার্যালয়’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়।
শুরুতে এ প্রতিষ্ঠান গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছিল। কিন্তু বিদেশ থেকে অস্ত্র কেনা এবং সেসবের ব্যবহারের ওপর নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়ায় তুরস্ক নিজস্ব উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
২০১০ সালের পর থেকে তুরস্ক দেশীয় নকশায় উন্নতমানের সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে বিশেষ মনোযোগ দেয়। ফলে তার প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে এক বিশাল উল্লম্ফন ঘটে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ইলদিরিমের মতে, ‘ইলদিরিমহান’ ক্ষেপণাস্ত্রের ঘোষণা দিয়ে আঙ্কারা আসলে বিশ্বকে দেখাতে চায়, তাদের সামরিক সক্ষমতা শুধু প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
ইলদিরিম বলেন, ‘আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তুরস্ক নিজেকে একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। আঙ্কারা বার্তা দিচ্ছে, তারা এখন দূর অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে ও কৌশলগত অংশীদার খুঁজে নিতে সক্ষম। এখানে মূল বিষয় শুধু ক্ষেপণাস্ত্রটি নয়, বরং তুরস্ক নিজেকে যে উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়, এটি তারই একটি বহিঃপ্রকাশ।’
ইলদিরিম আরও বলেন, ‘তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতের এ বিস্তার শুধু সাম্প্রতিক কোনো উত্তেজনার ফল নয়। দশক ধরে আঙ্কারা তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন দেশীয় প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির এ প্রচেষ্টার মূলে রয়েছে মূলত পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌমত্ব অর্জনের লক্ষ্য।’
ন্যাটোর শক্তি ও বিশ্ববাজারে তুর্কি অস্ত্রের জয়জয়কার
জার্মান মার্শাল ফান্ডের বিশেষজ্ঞ উনলুহিসারসিকলি বলেন, ‘নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ সম্মেলনে ন্যাটোর সব সদস্যদেশ তাদের জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তুরস্ক মূলত সেটিই কার্যকর করছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ন্যাটোর দক্ষিণ সীমান্তে তুরস্ক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। বিশেষ করে তুর্কি প্রণালিগুলোর মাধ্যমে কৃষ্ণসাগর ও ভূমধ্যসাগরের সংযোগ রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশটির ভূমিকা অপরিসীম। তাই একটি শক্তিশালী তুরস্ক মানেই ন্যাটোর সামগ্রিক শক্তি বৃদ্ধি পাওয়া।
বর্তমানে তুরস্কের হাজারো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্থল, আকাশ ও নৌবাহিনীর জন্য কাজ করছে, যা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তুরস্কের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ খাতের রপ্তানি রেকর্ড ১০ দশমিক ০৫ বিলিয়ন (১,০০৫ কোটি) ডলারে পৌঁছেছে।
তুরস্কের তৈরি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘বায়রাক্তার টিবি২’ ড্রোন। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তুরস্কের অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান ও কাতার। তবে তুরস্কের সবচেয়ে বিখ্যাত এ ড্রোন বাংলাদেশ, ইউক্রেন, ইরাক, কেনিয়া, জাপানসহ অন্তত ৩১টি দেশে রপ্তানি করা হয়েছে।