
বিশ্বের বাকি অংশ থেকে নিজেদের ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করার এক বিশাল ও ধীরগতির প্রক্রিয়া শুরু করেছে রাশিয়া। অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটির লাখ লাখ মানুষ ক্রমে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন এবং এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি হতে চলেছে ভয়াবহ।
বছরের শুরুতে ইরানের হুট করে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার তুলনায় রাশিয়ার এই প্রক্রিয়াটি কিছুটা বিভক্ত ও অস্পষ্ট। রাশিয়ার বিভিন্ন শহর ও প্রদেশে ধাপে ধাপে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা, নির্দিষ্ট কিছু ডেটা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি এবং দেশটির মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘টেলিগ্রাম’ অ্যাপে নতুন করে বাধার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া চলছে।
রাশিয়ার এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘এটি একটি পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ। এর অর্থ ১০০ বছর পিছিয়ে যাওয়া। খুব শিগগিরই হয়তো তারা কাগজের চিঠি, টেলিগ্রাফ আর ঘোড়ায় চড়ে বার্তা পাঠানোর যুগে ফিরে যাবে।’
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘এটি একটি পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ। এর অর্থ ১০০ বছর পিছিয়ে যাওয়া।’
ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ওপেন অবজারভেটরি অব নেটওয়ার্ক ইন্টারফেয়ারেন্স (ওওএনআই)-এর গবেষক আর্তুরো ফিলাস্তো বলেন, রাশিয়ার এই শাটডাউন ইরানের চেয়ে ‘অনেক বেশি অস্পষ্ট ও সহজে চোখে পড়ে না’। কারণ ইরানের তুলনায় রাশিয়ার ইন্টারনেট অবকাঠামো অনেক বেশি বিকেন্দ্রীভূত।
ফিলাস্তো বলেন, ‘রাশিয়ায় অনেক বেশি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) রয়েছে। তারা অনেকটা স্বাধীনভাবে তাদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। ফলে দেশজুড়ে একযোগে সেন্সরশিপ কার্যকর করা বেশ কঠিন।’
এই শাটডাউন মূলত সরকারি নির্দেশনায় বিভিন্ন নেটওয়ার্কে বসানো বিশেষ যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল। ওওএনআই-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ মার্চ থেকে টেলিগ্রাম অ্যাপে বাধা দেওয়ার হার বাড়ছে। ৫০০টির বেশি নেটওয়ার্কে পরীক্ষার পর এই পরিষেবায় ব্যাপক হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
‘আমি এখন পায়রা দিয়ে চিঠি পাঠানোর কথা ভাবছি। প্রতি মাসে ইন্টারনেটের জন্য টাকা দিই, কিন্তু মনে হয় আমাকে লুট করা হচ্ছে। তারা আমার টাকা নিয়ে যাচ্ছে অথচ আমি আধুনিক সভ্যতার কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না!’বেলারুশের একটি টিভি স্টেশনে প্রচারিত ভিডিওতে এক রুশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী
বেলারুশের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত ভিডিওতে এক রুশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি এখন পায়রা দিয়ে চিঠি পাঠানোর কথা ভাবছি। প্রতি মাসে ইন্টারনেটের জন্য টাকা দিই, কিন্তু মনে হয় আমাকে লুট করা হচ্ছে। তারা আমার টাকা নিয়ে যাচ্ছে অথচ আমি আধুনিক সভ্যতার কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না!’
সেন্সরশিপ এড়ানোর টুল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যামনেসিয়া ভিপিএন’-এর বিশ্লেষকরা বলছেন, আগের তুলনায় এবার টেলিগ্রাম বন্ধ করার চেষ্টা অনেক বেশি ব্যাপক এবং রাশিয়ার উন্নত কারিগরি সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গসহ এক ডজনের বেশি অঞ্চলে ইতিমধ্যে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন আর কোনো কিছু ভেঙে যাওয়া বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ভয় না করে রুশ নিয়ন্ত্রকেরা আরও কঠোরভাবে ও বড় পরিসরে সব ব্লক করে দিচ্ছে।
সামনের দিনগুলোতে এই কড়াকড়ি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এপ্রিলের শুরু থেকে টেলিগ্রাম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে বলে রুশ কর্তৃপক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম সংস্থা রোস্টেলিকম-এর প্রধান গত মার্চে বলেছিলেন, হোয়াটসঅ্যাপ এখন ‘মৃত’ এবং টেলিগ্রামও একই পথে হাঁটবে। এই দুই জনপ্রিয় অ্যাপের বদলে সরকার নিয়ন্ত্রিত নতুন অভ্যন্তরীণ মেসেজিং সেবা ‘ম্যাক্স’ চালু করার পরিকল্পনা করছে ক্রেমলিন।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বাসাবাড়ির ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ না করা হলেও সেই প্রযুক্তি রাশিয়ার হাতে রয়েছে। তাঁরা বলেন, ‘আমরা ইরানে যেভাবে শাটডাউন হতে দেখেছি, রাশিয়াতেও অচিরেই তা একইভাবে কার্যকর হতে পারে।’