
১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট ফ্রান্সের প্যারিসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন প্রিন্সেস ডায়ানা। তিনি ছিলেন যুক্তরাজ্যের বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লসের প্রথম স্ত্রী। প্রথম আলোর ‘ফিরে দেখা’ সিরিজের আজকের আয়োজন তাঁকে নিয়ে।
রাত তখন গভীর। প্যারিসের একটি হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সবচেয়ে আলোচিত সদস্যদের একজন। লন্ডনসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে তখনো কেউ জানত না, কী ভয়াবহ খবর অপেক্ষা করছে।
তারপর এল সেই খবর। প্যারিসের স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করা হলো—প্রিন্সেস ডায়ানা আর নেই।
শোকের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে দেশে দেশে। কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে চলে গেছেন সেই মানুষটি, যাঁকে সে সময় প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত নারী হিসেবে বর্ণনা করা হতো।
১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন প্রিন্সেস ডায়ানা। আজ তাঁর মৃত্যুর ২৯ বছর পূর্ণ হলো।
প্রায় তিন দশক হলো, ডায়ানা শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর জীবন, কর্ম ও মৃত্যু নিয়ে জনসমাজে ও গণমাধ্যমে চর্চা থেমে নেই। বিশেষ করে তাঁর মৃত্যু ঘিরে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে। আর তা হলো, ডায়ানার মৃত্যু কি সত্যি একটি দুর্ঘটনা ছিল?
এ প্রশ্ন থেকেই সামনে এসেছে নানা সন্দেহ, জল্পনা ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব।
যেমন ব্রিটিশ রাজপরিবার-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ টম সাইকস ২০২৫ সালের আগস্টে তাঁর নিজস্ব সাবস্ট্যাক প্ল্যাটফর্মে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। শিরোনাম—‘কেন আমি বিশ্বাস করি, রাজকুমারী ডায়ানাকে হত্যা করা হয়েছিল’। নিবন্ধে তিনি লেখেন, ডায়ানার মৃত্যু ঘিরে এত বেশি প্রশ্ন ও অসংগতি রয়েছে যে এটিকে নিছক একটি দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া কঠিন।
ডায়ানার ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে তাকাব তাঁর বর্ণিল ও ঘটনাবহুল জীবনের নানা অধ্যায়ে।
অসুখী শৈশব
ডায়ানা ফ্রান্সিস স্পেন্সারের জন্ম ১৯৬১ সালের ১ জুলাই। যুক্তরাজ্যের নরফোকের স্যান্ড্রিংহামের পার্ক হাউসে ব্রিটেনের অভিজাত স্পেন্সার পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা জন স্পেন্সার, মা ফ্রান্সিস স্পেন্সার।
ডায়ানার বয়স যখন সাত বছর, তখন তাঁর মা–বাবার বিচ্ছেদ হয়। তাঁর মা ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় বিয়ে করেন।
১৯৭৫ সালে ডায়ানার দাদা অ্যালবার্ট স্পেন্সারের মৃত্যুর পর জন স্পেন্সার উত্তরাধিকারসূত্রে অষ্টম আর্ল স্পেন্সার হন। এরপর ডায়ানার নামের আগে ‘লেডি’ যুক্ত হয়। তিনি পরিচিত হন ‘লেডি ডায়ানা স্পেন্সার’ নামে।
ডায়ানার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন ১৯৭৬ সালে। সৎমা রেইনের সঙ্গে ডায়ানার সম্পর্ক খারাপ ছিল। পরবর্তী সময়ে ডায়ানা তাঁর শৈশবের পুরো সময়কেই ‘খুবই অসুখী’ ও ‘ভীষণ অস্থিতিশীল’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
শিক্ষাজীবন
ডায়ানার প্রাথমিক পড়াশোনা বাড়িতেই শুরু হয়েছিল একজন গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে। পরে তিনি নরফোকের কিংস লিনে অবস্থিত সিলফিল্ড প্রাইভেট স্কুলে আনুষ্ঠানিক পড়ালেখা শুরু করেন। ৯ বছর বয়সে তিনি নরফোকের থেটফোর্ডের কাছে মেয়েদের আবাসিক বিদ্যালয় রিডলসওয়ার্থ হল স্কুলে ভর্তি হন।
১৯৭৩ সালে ডায়ানা কেন্টের সেভেনওকসে অবস্থিত ওয়েস্ট হিথ গার্লস স্কুলে ভর্তি হন। পড়াশোনায় তিনি খুব একটা ভালো ছিলেন না। ও লেভেল পরীক্ষায় দুবার অকৃতকার্য হন। তবে সংগীত (বিশেষ করে পিয়ানো বাজানো), নাচ ও গার্হস্থ্যবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর বিশেষ প্রতিভা ছিল। সামাজিক কার্যক্রমে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে একটি পুরস্কার দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ। ১৯৭৭ সালে ১৬ বছর বয়সে তিনি এই স্কুল ছাড়েন। ভর্তি হন সুইজারল্যান্ডের একটি ফিনিশিং স্কুলে। এখানে এক টার্ম পড়েন।
১৯৭৯ সালে যুক্তরাজ্যে ফেরেন ডায়ানা। বসবাস শুরু করেন লন্ডনে। তিনি লন্ডনে কম বেতনের নানা চাকরি করেন। কিছুদিন এক মার্কিন দম্পতির সন্তানের দেখাশোনা করেন। এ ছাড়া কাজ করেন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক হিসেবেও।
চার্লসের সঙ্গে প্রেম
ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে স্পেন্সার পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ছিল। এই ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ডায়ানা ছোটবেলা থেকে তৎকালীন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে ‘আন্টিলিলিবেট’ বলে ডাকতেন। ডায়ানাদের বাড়ির কাছের স্যান্ড্রিংহাম হাউসে রাজপরিবারের সদস্যরা প্রায়ই ছুটি কাটাতে আসতেন। তখন রানির দুই ছেলে যুবরাজ অ্যান্ড্রু ও অ্যাডওয়ার্ডের সঙ্গে খেলতেন ডায়ানা।
রানির বড় ছেলে ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী যুবরাজ চার্লসের (বর্তমান রাজা) সঙ্গে ডায়ানার প্রথম দেখা হয় ১৯৭৭ সালে। ডায়ানার বয়স তখন ১৬ বছর, চার্লসের ২৯ বছর। ডায়ানার বড় বোন লেডি সারার সঙ্গে চার্লসের তখন প্রেমের সম্পর্কে চলছিল।
১৯৮০ সালের গ্রীষ্মে শহরের বাইরে এক সপ্তাহান্তের অবকাশযাপনে অতিথি হিসেবে অংশ নেন চার্লস ও ডায়ানা। সেখানে ডায়ানার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন চার্লস। তিনি ডায়ানাকে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ডায়ানাকে রাজপরিবারের রাজকীয় প্রমোদতরি ব্রিটানিয়ায় নৌভ্রমণে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। দুজনের মধ্যকার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে থাকে।
চার্লস তাঁর পরিবারের সঙ্গে ডায়ানাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে তাঁকে বালমোরাল ক্যাসেলে আমন্ত্রণ জানান। এটি স্কটল্যান্ডে ব্রিটিশ রাজপরিবারের বাসভবন। এই সাক্ষাতে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও তাঁর স্বামী প্রিন্স ফিলিপের কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা পান ডায়ানা। তিনি লন্ডনে চলে এলে তাঁর সঙ্গে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ করতে থাকেন চার্লস। তখন চার্লসের সঙ্গে ডায়ানার প্রেমের খবর ছড়াতে শুরু করে।
জমকালো বিয়ে
১৯৮১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি উইন্ডসর ক্যাসেলে ডায়ানাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন চার্লস। এতে ডায়ানা এতটাই অবাক হয়েছিলেন যে প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন চার্লস হয়তো মজা করছেন। এর তিন দিন পর, ৬ ফেব্রুয়ারি, চার্লস ১৮ ক্যারেটের সাদা সোনার একটি আংটি দিয়ে ডায়ানাকে প্রস্তাব দেন। আংটিতে ছিল ১২ ক্যারেটের ডিম্বাকৃতির সিলন নীলকান্তমণি (স্যাফায়ার), যার চারপাশে বসানো ছিল ১৪টি একক হীরা।
প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বলেন ডায়ানা। ১৯৮১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি চার্লস ও ডায়ানার বাগ্দানের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। বাগ্দানের পর ডায়ানা স্কুলশিক্ষকের চাকরি ছাড়েন।
১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই লন্ডনের সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রালে ৩২ বছর বয়সী চার্লস ও ২০ বছর বয়সী ডায়ানার বিয়ে হয়। তাঁদের বিয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল বাকিংহাম প্যালেসে।
বহুল আলোচিত, জমকালো এই বিয়ে বিশ্ববাসীর ব্যাপক আগ্রহ-কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। বিয়ের অনুষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে টেলিভিশন ও রেডিওতে সম্প্রচার করা হয়। আনুমানিক ১০০ কোটি মানুষ তা দেখেন বা শোনেন। চার্লস-ডায়ানার বিয়ের শোভাযাত্রা দেখতে লন্ডনের রাস্তায় ভিড় করেছিলেন প্রায় ৬ লাখ মানুষ।
আইকন
বিয়ের মধ্য দিয়ে রাজপরিবারের সদস্য হয়ে ‘প্রিন্সেস অব ওয়েলস’ উপাধি পান ডায়ানা। তিনি দ্রুতই রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে যুক্ত হন। এই ভূমিকায় তিনি জনসাধারণের কাছ থেকে বিপুল উৎসাহ ও উষ্ণ অভ্যর্থনা পান।
ডায়ানা শতাধিক দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি কোথাও ছিলেন নেতৃত্বের ভূমিকায়, কোথাও পৃষ্ঠপোষক। গৃহহীন, প্রতিবন্ধী, শিশু ও এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত মানুষের কল্যাণে তিনি কাজ করেছেন। এসব বিষয় নিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ডায়ানা এককভাবে এবং স্বামী প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে যৌথভাবে বহু দেশ আনুষ্ঠানিক সফর করেছেন। তাঁর রাজকীয় ভূমিকা, অ্যাকটিভিজম, গ্ল্যামার, ফ্যাশন ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব তাঁকে আন্তর্জাতিক আইকনে পরিণত করে। এসব তাঁকে এনে দেয় দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা।
ডায়ানার কাছে পরিবার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডায়ানা-চার্লস দম্পতির প্রথম সন্তান প্রিন্স উইলিয়াম। তাঁর জন্ম ১৯৮২ সালের ২১ জুন। আর দ্বিতীয় সন্তান প্রিন্স হ্যারির জন্ম ১৯৮৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। প্রিন্সেস ডায়ানা ১৭ শিশুর ধর্মীয় অভিভাবক ছিলেন।
বিচ্ছেদ
রাজপরিবারের কঠোর নিয়মকানুন-প্রথার সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে ক্রমেই অস্বস্তি ও একাকিত্ব বোধ করতে থাকেন ডায়ানা। নিজের মতো করে কাজ করতে না পারায় তিনি ধীরে ধীরে হাঁপিয়ে উঠছিলেন।
বিয়ের পাঁচ বছর পর ডায়ানা-চার্লসের মধ্যকার অসামঞ্জস্য ও বয়সের ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ১৯৮৬ সালের দিকে চার্লস ও ডায়ানা—উভয়ের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ডায়ানা সম্পর্কে জড়ান সাবেক সেনা কর্মকর্তা জেমস হিউইটের সঙ্গে। অন্যদিকে চার্লস তাঁর সাবেক প্রেমিকা ক্যামিলা পার্কার বোলসের সঙ্গে আবার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
সময় যত গড়ায়, দাম্পত্যের টানাপোড়েন আরও বাড়তে থাকে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে ঘোষণা দেওয়া হয়, চার্লস ও ডায়ানা আলাদা থাকার ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন।
আলাদা থাকার ঘোষণার পরও ডায়ানা বড় বড় জাতীয় অনুষ্ঠানে রাজপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উপস্থিত থাকতেন। ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে ডায়ানা ঘোষণা দেন, তিনি জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতি কমিয়ে আনবেন, যাতে জনজীবনের দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখত পারেন।
১৯৯৫ সালের নভেম্বরে ডায়ানা একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর ব্যক্তিজীবনের অসুখিতা ও জনজীবনের নানা চাপের কথা তুলে ধরেন।
চার্লস-ডায়ানাকে আবার মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও তাঁর স্বামী প্রিন্স ফিলিপ। কিন্তু তাঁরা সফল হননি। বরং নানা ঘটনায় সন্দেহ, অবিশ্বাস, তিক্ততা আরও বাড়ে। ১৯৯৬ সালের ২৮ আগস্ট চার্লস ও ডায়ানার বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
স্থলমাইনবিরোধী প্রচারাভিযান
বিবাহবিচ্ছেদের পর চার্লস ও ডায়ানা তাঁদের সন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্ব সমানভাবে পালন করতে থাকেন। বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া সত্ত্বেও ডায়ানাকে রাজপরিবারের একজন সদস্য হিসেবে গণ্য করা হতো। উভয় পক্ষ এ বিষয়ে সম্মত হয় যে বিবাহবিচ্ছেদের পর ডায়ানার পরিচিতি হবে ‘ডায়ানা, প্রিন্সেস অব ওয়েলস’ নামে। তবে তাঁর নামের সঙ্গে ‘হার রয়্যাল হাইনেস’ উপাধি আর থাকবে না।
বিবাহবিচ্ছেদের পর ডায়ানা অধিকাংশ দাতব্য সংস্থার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন তিনি। জীবনের শেষ বছরে ডায়ানা স্থলমাইনবিরোধী প্রচারাভিযানের অন্যতম সোচ্চার ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।
পাপারাজ্জিদের নজরে
আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের বছরখানেক আগে ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ-পাকিস্তানি হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ হাসনাত খানের সঙ্গে ডায়ানার গোপন প্রেমের সম্পর্ক শুরু হয়। তাঁদের সম্পর্ক প্রায় দুই বছর স্থায়ী হয়েছিল।
হাসনাতের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর ১৯৯৭ সালের গ্রীষ্মে মিসরীয় ধনকুবের মোহাম্মদ আল-ফায়েদের ছেলে চলচ্চিত্র প্রযোজক দোদি আল-ফায়েদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান ডায়না।
ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্রতীরবর্তী শহর সেন্ট ট্রোপেজে আল-ফায়েদ পরিবারের প্রমোদতরিতে ডায়ানা-দোদির একসঙ্গে সময় কাটানোর নানা মুহূর্ত পাপারাজ্জিদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। পরে তাঁদের ঘনিষ্ঠতার আরও কিছু ছবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ডায়ানা-দোদির এ সম্পর্ক নিয়ে রাজপরিবারের কয়েকজন সদস্যের নেতিবাচক মনোভাব ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও এ সম্পর্ক নিয়ে অস্বস্তি-উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
মর্মান্তিক মৃত্যু
ভূমধ্যসাগরে অবকাশ কাটিয়ে ১৯৯৭ সালের ৩০ আগস্ট ইতালির সার্ডিনিয়া থেকে আল-ফায়েদ পরিবারের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ফ্রান্সের প্যারিসে যান ডায়ানা ও দোদি। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে প্যারিসের ল্য বুর্জে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর থেকেই তাঁদের অনুসরণ করতে শুরু করেন পাপারাজ্জিরা। তাঁদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিলেন ডায়ানা ও দোদি।
এই জুটি প্রথমে যান আল-ফায়েদের ভিলা উইন্ডসরে। কিছুক্ষণ সেখানে থেকে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে যান আল-ফায়েদ মালিকানাধীন রিটজ হোটেলে। তাঁরা হোটেলের ইম্পেরিয়াল স্যুটে ওঠেন।
ডায়ানা ও দোদি সন্ধ্যা ৭টার দিকে হোটেল থেকে আল-ফায়েদের রু আরসেন হুসায়ের অ্যাপার্টমেন্টে যান। রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত তাঁরা সেখানে অবস্থান করেন। তাঁরা প্যারিসের শে বেনোয়া রেস্তোরাঁয় নৈশভোজের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের হওয়ার পর পাপারাজ্জিরা তাঁদের পিছু নিলে তাঁরা গন্তব্য বদলে রিটজ হোটেলে ফিরে যান।
প্রথমে হোটেলের একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খাওয়ার কথা ভেবেছিলেন ডায়ানা-দোদি। কিন্তু পাপারাজ্জিদের উপস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁরা হোটেলের ইম্পেরিয়াল স্যুটেই রাতের খাবার খান।
দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে (৩১ আগস্ট প্রথম প্রহর) দিকে ডায়ানা ও দোদি হোটেলের পেছনের পথ দিয়ে কালো রঙের মার্সিডিজ গাড়িতে বের হন। গাড়ির পেছনের আসনে বসেছিলেন ডায়ানা ও দোদি।
গাড়িটি চালাচ্ছিলেন রিটজ হোটেলের নিরাপত্তা বিভাগের উপপ্রধান অঁরি পল। সামনের যাত্রীর আসনে ছিলেন দোদির দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোন্স। গন্তব্য ছিল রু আরসেন হুসায়ের অ্যাপার্টমেন্ট। পেছনের পথ দিয়ে বের হওয়ার পরও পাপারাজ্জিরা তাঁদের পিছু নেন।
পাপারাজ্জিদের পিছু ধাওয়া থেকে বাঁচতে গাড়িটি দ্রুতগতিতে ছুটছিল। হোটেল থেকে বের হওয়ার মাত্র প্রায় তিন মিনিটের মাথায় ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে গাড়িটি প্যারিসের পঁ দ্য ল’আলমা আন্ডারপাসের একটি কংক্রিটের পিলারে গিয়ে সজোরে ধাক্কা খায়। গাড়িটি দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই নিহত হন দোদি ও গাড়িচালক পল। গুরুতর আহত হন ডায়ানা ও ট্রেভর।
ঘটনার পরপরই উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে যান। এই দলে ছিলেন ফরাসি ফায়ার সার্ভিসের কর্মী জাভিয়ের গুরমেলোঁ। তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি গাড়ির কাছে গিয়ে দেখেন, ডায়ানা তখনো বেঁচে আছেন। তিনি নড়াচড়া করছিলেন, কথা বলছিলেন। তখন ডায়ানা তাঁকে বলেছিলেন, ‘হায় ঈশ্বর, কী হয়ে গেল!’
ডায়ানার হাত ধরে তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করেন জাভিয়ের। এরপর উদ্ধারকারীরা ডায়ানাকে গাড়ি থেকে বের করেন। গাড়ি থেকে বের করার সময় তাঁর হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ হয়। ঘটনাস্থলেই তাঁকে সিপিআর দেওয়া হয়। এতে তাঁর হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম ফিরে আসে।
ডায়ানা ও ট্রেভরকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ সময় ডায়ানার হৃৎস্পন্দন ছিল অনিয়মিত, তাঁর রক্তচাপ দ্রুত কমে যাচ্ছিল। দুজনকেই দিবাগত রাত দুইটার দিকে প্যারিসের পিতিয়ে-সালপেত্রিয়ের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে ডায়ানার জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু তাঁর আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সময় ভোর চারটার দিকে ডায়ানাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে চিকিৎসায় ট্রেভর প্রাণে বেঁচে যান।
শবযাত্রা-শেষকৃত্য
‘জনতার রাজকুমারী’ ডায়ানার আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদে গোটা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে যায়। সর্বত্র নেমে আসে শোকের ছায়া। ৩১ আগস্ট সন্ধ্যায় ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের রয়্যাল স্কোয়াড্রনের একটি উড়োজাহাজে করে ফ্রান্স থেকে ডায়ানার মরদেহ যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়। কফিন নিয়ে দেশে ফেরার এই যাত্রায় ছিলেন ডায়ানার দুই বড় বোন লেডি সারাহ ও লেডি জেন। আর ছিলেন সাবেক স্বামী চার্লস।
লন্ডনের আরএএফ নর্থহল্ট বিমানঘাঁটিতে উড়োজাহাজটি অবতরণ করে। রাজকীয় পতাকায় ঢাকা কফিনটি গ্রহণের জন্য সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। ৫ সেপ্টেম্বর রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ডায়ানার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
৬ সেপ্টেম্বর সকালে কেনসিংটন প্যালেস থেকে শুরু হয় ডায়ানার শেষযাত্রা। কফিনটি ছয়টি কালো ঘোড়ায় টানা একটি কামানের গাড়িতে বহন করা হয়। মায়ের শেষযাত্রায় ১৫ বছর বয়সী উইলিয়াম ও ১২ বছর বয়সী হ্যারিও যোগ দেন। তাঁদের বাবা চার্লসসহ রাজপরিবার ও স্পেন্সার পরিবারের সদস্যরা শবযাত্রায় কফিনের পেছনে হাঁটেন।
শবযাত্রা দেখতে বিপুলসংখ্যক শোকার্ত মানুষ রাস্তার দুই পাশে ভিড় করেন। প্রায় চার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে শবযাত্রা পৌঁছায় ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে। সেখানে ডায়ানার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান হয়।
ডায়ানার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানটি ২০০টির বেশি দেশে টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। বিশ্বের প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ এই অনুষ্ঠান দেখেন।
শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান শেষে ডায়ানার কফিন সড়কপথে নর্থ্যাম্পটনশায়ারের অলথ্রপে স্পেন্সার পরিবারের এস্টেটে নেওয়া হয়। এস্টেটের একটি ছোট দ্বীপে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
তদন্ত-ষড়যন্ত্রতত্ত্ব
১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দোদির বাবা মোহাম্মদ আল-ফায়েদ প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলের প্রাণহানির ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত। তিনি এ ঘটনায় ব্রিটিশ বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬ ও রানির স্বামী প্রিন্স ফিলিপের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।
১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে ফরাসি বিচারিক তদন্তে এ উপসংহার টানা হয় যে দুর্ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত কোনো কাজের ফল ছিল না। এর জন্য দায়ী ছিল গাড়িচালক পলের মদ্যপ অবস্থায় থাকা। অ্যালকোহলের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ওষুধের প্রভাবেও তিনি ছিলেন। এ অবস্থায় উচ্চ গতিতে গাড়ি চালানোর সময় তিনি গাড়ির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেননি।
ডায়ানা-দোদির মৃত্যুর কারণ ও পরিস্থিতি নিয়ে ২০০৪ সালে যুক্তরাজ্যে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত-অনুসন্ধানের পর ২০০৮ সালের রায়ে জুরি সিদ্ধান্ত দেন, গাড়িচালক পলের চরম অবহেলা, আর ডায়ানা-দোদির পিছু নেওয়া পাপারাজ্জিদের বেপরোয়া আচরণের কারণে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।
আনুষ্ঠানিক তদন্ত-অনুসন্ধানে যা-ই আসুক না কেন, ডায়ানার মৃত্যুর ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে। এমনকি তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরও কেউ কেউ সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহের নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, হাজির করছেন নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। আর এ কারণেই ডায়ানার মৃত্যু আজও আলোচনায়।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন, ওয়াশিংটন পোস্ট, পিপল, রয়্যাল ডট ইউকে ও বায়োগ্রাফি ডটকম।