হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—দুপক্ষেরই ঘনিষ্ঠ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ প্রচারের সমর্থক রক্ষণশীলদের প্রিয়পাত্র অরবান। তবে তিনি বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেতৃত্বের কট্টর প্রতিপক্ষ। গতকাল রোববার অরবান হাঙ্গেরির পার্লামেন্ট নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন।
৬২ বছর বয়সী ভিক্টর অরবানের এ পরাজয় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। এর মধ্য দিয়ে রক্ষণশীল খ্রিষ্টান গণতন্ত্রের স্বঘোষিত ‘চ্যাম্পিয়নের’ টানা ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটছে, যার প্রভাব দেখা যাবে ওয়াশিংটন থেকে ব্রাসেলস, এমনকি মস্কো অবধি।
অরবান জাতীয়তাবাদী দল ফিদেজের নেতা। ২০১০ সাল থেকে তিনি হাঙ্গেরিতে ক্রম–কর্তৃত্ববাদী শাসন চালিয়ে এসেছেন। গতকালের নির্বাচনে অরবানের দলের ভরাডুবি হয়েছে। জয় পেয়েছে পিটার মাজিয়ারের মধ্য ডানপন্থী তিসজা পার্টি। ৪৫ বছর বয়সী পিটার নিজেও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মধ্য ডানপন্থী, সোশ্যাল–রক্ষণশীল সদস্য।
কমিউনিস্ট যুগের অবসানের পর হাঙ্গেরির রাজনৈতিক ইতিহাসে এবারের নির্বাচনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হচ্ছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স হাঙ্গেরিতে গিয়েছিলেন। ‘ট্রাম্পের বন্ধু’ অরবানের পক্ষে নজিরবিহীন নির্বাচনী প্রচারে যোগ দেন ভ্যান্স। তবে শেষ রক্ষা হলো না। দ্রুতই নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়েছেন অরবান।
নিজের প্রচার দলের সদর দপ্তরে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে অরবান বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল খুবই ‘স্পষ্ট’।
বিবিসির খবরে বাংলাদেশ সময় আজ সোমবার সকালে বলা হয়েছে, ৯৮ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে পিটারের মধ্য ডানপন্থী তিসজা পার্টি ১৩৮টি আসনে জয় পেয়েছে। অরবানের জাতীয়তাবাদী দল ফিদেজ পেয়েছে ৫৫টি আসন। কট্টর ডানপন্থী আওয়ার হোমল্যান্ড ৬টি আসনে জয় পেয়েছে। হাঙ্গেরিতে ১৯৯টি আসনে পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছে। দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজনীয় ১৩৩টি আসনের চেয়ে অতিরিক্ত পাঁচটি আসন পেয়েছে পিটারের দল।
অরবান অভিবাসনবিরোধী। সেই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধরত ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার কট্টর সমালোচক। এমনকি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিষেধাজ্ঞা আরোপের কড়া সমালোচনা করেছেন হাঙ্গেরির এ কট্টর ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী। এবারের নির্বাচনের প্রচারে অরবান একটি আশঙ্কা বারবার উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তা হলো—পিটার ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে রাশিয়ার যুদ্ধে হাঙ্গেরিকেও জড়াবেন।
রাজধানী বুদাপেস্টে বিজয় ভাষণে পিটার তাঁর হাজারো সমর্থকের উদ্দেশে বলেন, ‘আজ আমরা এক অলৌকিক কাজ করেছি, হাঙ্গেরি ইতিহাস রচনা করেছে।’ সেই সঙ্গে ‘মসৃণ ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের’ আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুদাপেস্টে দানিয়ুব নদীর তীরে পিটারের হাজারো সমর্থক উল্লাসে মেতে উঠেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই তরুণ। তাঁরা এবারই প্রথম ভোট দিয়েছেন। নতুন ভোটারদের বড় অংশের সমর্থন পেয়েছেন পিটার। বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নজরে এনে পিটার এমন সাফল্য পেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ফিদেজ পার্টির ভোটার ও সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন ভিক্টর অরবান। তিনি বলেন, ‘আমরা কখনো হাল ছাড়ি না।’ দলকে এখন পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
হাঙ্গেরির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নোরা শুলৎস বলেন, অরবানের দলের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল উদ্ভাবনী চিন্তার অভাব। এবার নিয়ে টানা তৃতীয় নির্বাচনে ফিদেজ অনেকটা একই রকম বার্তা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিলেন। তা হলো, পরিবারের পাশে থাকা এবং হাঙ্গেরিকে যুদ্ধ থেকে রক্ষা করা। কিন্তু এখন মানুষ নতুন কিছু চাইছে বলে মনে হচ্ছে।
অরবানকে আবারও জেতাতে পূর্ণ সমর্থন এবং সব ধরনের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অরবানকে নির্বাচিত করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি ভিডিওবার্তা দেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে নিজের প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্টকে বুদাপেস্টে পাঠান ট্রাম্প। দুদিনের সফরে দেওয়া বক্তব্যে জেডি ভ্যান্স হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী আর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ প্রচারণার সমর্থকদের অভিন্ন আদর্শের ওপর জোর দেন।
১৯ বছর বয়সী ভোটার ডোরা ফ্রিসফালুসি বলেন, এবারের নির্বাচনে মানবাধিকার, পরিবারের অধিকার ও শিশুদের অধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসেছিল। কিন্তু ফিদেজ সেসবের ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারেনি।
অরবান অভিবাসনবিরোধী। সেই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধরত ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার কট্টর সমালোচক। এমনকি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিষেধাজ্ঞা আরোপের কড়া সমালোচনা করেছেন হাঙ্গেরির এ কট্টর ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী।
এবারের নির্বাচনের প্রচারে অরবান একটি আশঙ্কা বারবার উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তা হলো, পিটার ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে রাশিয়ার যুদ্ধে হাঙ্গেরিকেও জড়াবেন।
বিপরীতে পিটারের দল নির্বাচনী প্রচারের সময়ে কার্যত প্রায় পুরোটাই অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার বিষয়গুলো সামনে এনেছে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও এসব বিষয় ছিল। হাঙ্গেরির ভঙ্গুর অর্থনীতির পেছনে অরবান সরকারের অব্যবস্থপনার অভিযোগ তোলা হয়েছে। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা অরবানের পরিবারের সদস্য আর রাজনৈতিক মিত্রদের সম্পদশালী করেছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়।
অরবানকে আবারও জেতাতে পূর্ণ সমর্থন এবং সব ধরনের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অরবানকে নির্বাচিত করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি ভিডিও বার্তা দেন। বুদাপেস্টে কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটির (সিপিএসি) বার্ষিক বৈঠকের সকালে ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়।
এরপর পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে নিজের প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্টকে বুদাপেস্টে পাঠান ট্রাম্প। দুদিনের সফরে দেওয়া বক্তব্যে জেডি ভ্যান্স হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী আর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ প্রচারণার সমর্থকদের মধ্যকার অভিন্ন আদর্শের ওপর জোর দেন।
গতকাল সকালেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্পপুত্র ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ‘হাঙ্গেরির বন্ধুদের’ প্রতি তাঁর বাবার ‘বন্ধু ও মিত্র’ ভিক্টর অরবানকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে হাঙ্গেরির ভোটাররা স্বাধীন চিন্তাভাবনা করা ও ‘হাঙ্গেরি ফার্স্ট’ নীতির পক্ষে থাকা একজনকে ভোট দেবেন।
হাঙ্গেরির ভোটাররা মার্কিন প্রশাসনের এমন অবস্থান থেকে এমন এক সময় মুখ ফিরিয়ে নিলেন যখন পুরো ইউরোপে ট্রাম্প ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। ইউরোপের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দূরত্ব অনেকটাই বেড়ে গেছে।
নির্বাচনের আগের দিনও প্রচারে নেমে অরবান ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। বলেন, হাঙ্গেরির মানুষের অর্থ সহায়তা হিসেবে ইউক্রেনকে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনা করেন। অভিযোগ করেন, বুদাপেস্টে একটি ইউক্রেনপন্থী সরকার বসানোর ষড়যন্ত্র চলছে। এ জন্য হাঙ্গেরিকে অশান্ত করতে চান জেলেনস্কি।
অরবান প্রথমবার হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৯৮ সালে। ২০০২ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এরপর ২০১০ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরেন তিনি। এরপর টানা তিনবার পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের অভিযোগ, অরবান অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছেন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করেছেন। সংবাদমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
প্রধানমন্ত্রী অরবান নিজের ও তাঁর দলের পক্ষে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজিয়েছেন বলেও অভিযোগ বিরোধীদের। দেশে–বিদেশে বলা হয়ে থাকে, অরবান শাসক দলের অনুকূলে সংবিধান পুনর্লিখন এবং সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করেছেন।
এখন এ সবকিছু পাল্টে ফেলা হয়তো খুব সহজ হবে না। কেননা এখন হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট এ নির্বাচনের ফলাফল অনুমোদন করবেন এবং পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যান্ডেট দেবেন। তিনি অরবানের ঘনিষ্ঠজন। এ ছাড়া হাঙ্গেরির সুপ্রিম কোর্ট, প্রসিকিউটরের কার্যালয় ও সাংবিধানিক আদালতেও অরবানের ঘনিষ্ঠ লোকজন রয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে সাড়াজাগানো ফলাফল করা পিটারও একসময় অরবানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। দীর্ঘদিন ফিদেজ পার্টির সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের দিক থেকে তিনি ক্রমেই জনপ্রিয় হতে শুরু করেন। দেশজুড়ে প্রান্তিক পর্যায়ে একের পর এক সফর করে নিজের সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। ওই সময় একেক দিনে সাতবার বক্তব্য দেওয়ারও রেকর্ড আছে তাঁর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পিটারের চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি রয়েছে। হাঙ্গেরির হাসপাতালগুলোয় টয়লেট পেপারের মতো নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় পণ্যের অপর্যাপ্ততা এবং রেলের মতো নানা অবকাঠামোর দুরবস্থা নিয়ে সামজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ভোটারদের মনোযোগ কেড়েছেন। জনমত গড়ে তুলেছেন।
পিটার নিজেও বুদাপেস্টের রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। চলতি শতকের শুরুর দিকে তাঁর এক স্বজন দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পিটারের মা হাঙ্গেরির বিচার বিভাগে কর্মরত ছিলেন। পিটার ছাত্রজীবনে যোগ দেন ফিদেজ পার্টিতে। দলের উদীয়মান তারকা রাজনীতিক ধরা হতো তাঁকে। তবে অরবানের সরকারের নীতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে না পেরে দল ছেড়ে দেন।
পোল্যান্ডের ওয়ারশভিত্তিক সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজের হাঙ্গেরি–বিষয়ক নীতিসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ ইলোরা গিজিনস্কা বলেন, হাঙ্গেরির রাজনৈতিক দলগুলো অনেকটা রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে বিগত বছরগুলোয়। ছোট গ্রামগুলোর দিকে তাদের নজর খুব একটা ছিল না। এ শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে প্রথমবারের মতো বাজিমাত করেছেন পিটার।
জানা গেছে, এবারের নির্বাচনের প্রাক্কালে ভিক্টর অরবান যখন রাজধানীতে জেডি ভ্যান্সকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনী প্রচার করছিলেন, সমাবেশ করছিলেন, ছবি তুলছিলেন, ঠিক তখনো পিটার ছিলেন গ্রামের পথে, প্রান্তিক ভোটারদের কাছে। বিশেষ করে তরুণ ও নতুন ভোটারদের মন জয়ে ছুটছিলেন তিনি।