
সাইপ্রাসের লারনাকায় ২২ বছর বয়সী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আহমেদ ইমনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সে দেশে চলমান তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। ৯ দিন ধরে অনুসন্ধানের পর মামলাটি এখন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে রূপ নিয়েছে।
লারনাকা অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা এ ঘটনায় তদন্ত চালাচ্ছেন। তাঁরা বলেছেন, শাহরিয়ার আহমেদ ইমনের অপহরণ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তাঁরা একজন ২২ বছর বয়সী বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই সন্দেহভাজন ব্যক্তি শাহরিয়ারকে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি পুলিশকে কোফিনাউ অভিবাসী অভ্যর্থনাকেন্দ্র এবং স্থানীয় কসাইখানার কাছাকাছি একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যান। সেখান থেকেই মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
ওই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গতকাল রোববার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ সোমবার রিমান্ড শুনানির জন্য তাঁকে লারনাকা ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে হাজির করার কথা আছে।
ফরেনসিক দল মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার স্থানটি ঘিরে রেখেছে। ঘটনার বিস্তারিত আলামত সংগ্রহের জন্য তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে তারা।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শাহরিয়ার কয়েক মাস আগে লারনাকা শহরের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ওরোকলিনি এলাকার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। ১২ জুন শাহরিয়ার তাঁর ফ্ল্যাটমেটদের বলেছিলেন, তিনি কোফিনাউতে একটি কারখানায় কাজে যোগ দিতে যাচ্ছেন। সেটি ছিল তাঁর কাজের প্রথম দিন।
ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শাহরিয়ার বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। এর পর থেকে তাঁর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। সর্বশেষ ১২ জুন রাতের দিকে শাহরিয়ার এক বন্ধুকে একটি ডিজিটাল লোকেশন পিন পাঠিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পরই তাঁর ফোনের সিগন্যাল বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর ঘটনাটি বড় ধরনের ঘটনায় মোড় নেয়। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা ওই শিক্ষার্থীর বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দাবি করে। শিক্ষার্থীর বাবা গ্রিসে থাকেন।
এই মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় গতকালের গ্রেপ্তারের ঘটনার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আগে। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুক্তিপণসংক্রান্ত বার্তা প্রকাশ পায়।
ওই ডিজিটাল পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, গতকাল ১০ হাজার ইউরো এবং আজ আরও ২৫ হাজার ইউরো দিতে হবে। পাশাপাশি হুমকি দেওয়া হয়, কর্তৃপক্ষকে জানালে শাহরিয়ারের বাবা তাঁর সন্তানের মুখ আর কখনো দেখতে পাবেন না।
পুলিশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব বার্তার সত্যতা যাচাই করছে এবং একই সঙ্গে পুরো ঘটনার তদন্ত আরও গভীরভাবে এগিয়ে নিচ্ছে।
শাহরিয়ার নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবার প্রথম থেকেই সন্দেহ করছিল, এটি একটি অপহরণের ঘটনা হতে পারে। তারা মুক্তিপণের দাবি এবং শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন থেকে পাঠানো একটি লোকেশন পিন পাওয়ার পর বিষয়টি পুলিশকে জানায়। তবে গতকাল সন্দেহভাজনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ঘটনাটি আসলে অপহরণ ছিল না; বরং হত্যাকাণ্ডের পর অপহরণের নাটক সাজানো হয়েছে।
পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বীকার করেছেন, তিনি শাহরিয়ারকে তাঁর অরোকলিনির বাসা থেকে ফুসলিয়ে কোফিনাউ–এর একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যান। একই সন্ধ্যায় তাঁকে গলা ও পিঠে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। এরপর তিনি মরদেহটি ঘাস ও আগাছা দিয়ে ঢেকে রাখেন, শাহরিয়ারের মোবাইল ফোন চুরি করেন এবং পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য একটি ভুয়া অপহরণের নাটক সাজান।
গতকাল দুপুরে অভিযুক্ত ব্যক্তি লারনাকার সিআইডি কর্মকর্তাদের নিয়ে সে স্থানটিতে যান এবং লুকিয়ে রাখা মরদেহের অবস্থান দেখিয়ে দেন। হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও নিহত শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখার স্থানটি দেখান তিনি। এটির অবস্থান কোফিনাউ অভিবাসী অভ্যর্থনাকেন্দ্র ও স্থানীয় একটি কসাইখানার কাছাকাছি। ফরেনসিক দল পরে মরদেহটি উদ্ধার করে। এটিতে পচন ধরেছিল।
প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ধারালো ছুরিকাঘাতের পাশাপাশি ২২ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থীর গলায় শ্বাসরোধের স্পষ্ট চিহ্ন আছে।
তদন্তে আরও জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিন আগে একটি বাসে শাহরিয়ারের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির দেখা হয়। ওই সময় শাহরিয়ারের কোনো মন্তব্যে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এরপরই অভিযুক্ত ব্যক্তি একটি চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে শাহরিয়ারকে ফাঁদে ফেলেন।
তবে ব্যক্তিগত বিরোধের দাবি থাকলেও কর্তৃপক্ষ এখনো হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত চলছে।