যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সরকার এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিনিধিরা। নয়াদিল্লি, ভারত; ২৫ জুলাই ২০২৬
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সরকার এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিনিধিরা। নয়াদিল্লি, ভারত; ২৫ জুলাই ২০২৬

সরকারের ওপর ‘আস্থা রেখে’ আন্দোলন প্রত্যাহার করল ককরোচ পার্টি

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর তাদের ওপর ‘আস্থা রেখে’ আন্দোলন প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।

আজ শনিবার নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস এ ঘোষণা দেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর ঘোষণা এল। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট–এর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়াও বিক্ষোভকারীদের আরও দুটি দাবি ছিল।

সংবাদ সম্মেলনে সিজেপি জানায়, আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো বিবেচনা করতে রাজি হয়েছে কেন্দ্র।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা জানান, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আনন্দ-উল্লাস করছেন সিজেপি সমর্থকেরা। জয়পুর, ভারত; ২৫ জুলাই ২০২৬

নাড্ডা আরও বলেন, নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পর যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, তাদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কেন্দ্র শিগগিরই নির্ধারণ করবে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ শেয়ার করা এক চিঠিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান লেখেন, গত ১০ দিনের ঘটনাপ্রবাহে তিনি মর্মাহত এবং দেশের ঐক্যের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় সিজেপি লিখেছে, ‘তেলাপোকা জিতেছে, গণতন্ত্র জিতেছে।’

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ডাকা ‘বিহার বনধ’ চলাকালে সতর্ক অবস্থায় পুলিশ সদস্যরা। পাটনা, ভারত। ২৫ জুলাই ২০২৬

রোববার মোমবাতি মিছিল

আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও পুলিশি নির্মমতার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের প্রতি সমবেদনা জানাতে আগামীকাল রোববার মোমবাতি মিছিলের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।

নিট প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে ডাকা বিক্ষোভে গত রোববার বিহার রাজ্যের অন্তত তিনটি জেলায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় পাথর ছোড়ার ঘটনাও ঘটে।

এই আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় জনশক্তি জনতা দল (জেজেডি) প্রধান ও লালু প্রসাদ যাদবের বড় ছেলে তেজ প্রতাপ যাদবকে আটক করে পুলিশ।

প্রশ্ন ফাঁসে জড়িতদের কড়া শাস্তি দিতে নতুন কঠোর আইন আনার কথা জানিয়ে গতকাল শুক্রবার রাতে একটি ভিডিও বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভিডিওতে তিনি ইতিবাচক মতামত ও পরামর্শের জন্য তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

ভিডিও বার্তায় মোদি বলেন, প্রশ্ন ফাঁস রোধে কঠোর ব্যবস্থার বিধান রেখে আগামী সপ্তাহেই পার্লামেন্টের চলতি অধিবেশনে একটি নতুন বিল আনা হবে।

‘বিহার বনধ’ চলাকালে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ছেন আন্দোলনকারীরা। পাটনা, ভারত; ২৫ জুলাই ২০২৬

এর আগেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা একটি খসড়া বিলে অনুমোদন দিয়েছে। এই বিলে প্রশ্ন ফাঁসের জন্য ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই খসড়া বিলটি পাস হয়।

নিট প্রশ্ন ফাঁসের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সিতে (এনটিএ) বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। সংস্থাটির ৪৭ জন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

কনস্টিটিউশন ক্লাবে সিজেপি নেতাদের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধি দলের বৈঠকের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

প্রধান বিচারপতিকে ‘ধন্যবাদ’

এদিকে হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের কয়েক মিনিট পর দিল্লির যন্তর মন্তরের মঞ্চ থেকে দেশটির প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য থেকে এই আন্দোলনের জন্ম হয়েছে।

সমর্থকদের উদ্দেশে দিপকে বলেন, ‘আমি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি যদি আমাদের “তেলাপোকা” না বলতেন, তাহলে আমি ভারতে আসতাম না। এই আন্দোলনও শুরু হতো না।’

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর যন্তর মন্তরে উদযাপনের অংশ হিসেবে স্যালুট জানাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা। নয়াদিল্লি, ভারত। ২৫ জুলাই ২০২৬

গত ১৫ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের পদবি নিয়ে একটি শুনানি হয়। সে সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেছিলেন, ‘এখানে তেলাপোকার মতো অনেক তরুণ আছে, যাদের কোনো চাকরি নেই, পেশাগত জীবনেও কোনো প্রতিষ্ঠা পায়নি।’

পরে সূর্য কান্ত ব্যাখ্যা দেন, তাঁর মন্তব্যটি বেকার তরুণদের উদ্দেশে নয়, আইনের ভুয়া ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশে করা হয়েছিল। পরে তিনি আরও বলেন, সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু তাঁর এসব ব্যাখ্যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়ানো ঠেকাতে পারেনি।

পরদিন ১৬ মে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে থাকা ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্সে’ প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক প্রতিক্রিয়া জানান। একসময় আম আদমি পার্টির (আপ) যোগাযোগ কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করা অভিজিৎ এই দিনই ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) গঠনে ঘোষণা দেন।

ভারতের মুম্বাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভকারীরা। ২ জুন ২০২৬

অভিজিৎ তখন বলেছিলেন, সিজেপি ‘সব তেলাপোকার’ জন্য একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্ম। এর সদস্য হতে ‘বেকার হওয়া, অলস হওয়া, সব সময় অনলাইনে থাকা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারাকে’ যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। ব্যঙ্গাত্মকভাবে এসব যোগ্যতার কথা বললেও তা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

মে মাসের শেষ দিকে ভারতের নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে ক্ষোভ বাড়তে থাকলে সিজেপির তৎপরতা গতি পায়। জুনের শুরুর দিকে দিপকে ভারতে ফিরে এসে যন্তর মন্তরের কাছে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।

পরীক্ষায় অনিয়মের দায়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছিল আন্দোলনের মূল দাবি। ২৮ জুন শিক্ষাবিদ ও অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করলে আন্দোলন আরও গতি পায়। তিনি ২৬ দিন অনশনের পর চলতি সপ্তাহে তা প্রত্যাহার করেন।

অবস্থান কর্মসূচিতে সমর্থকদের উদ্দেশে কথা বলছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রধান অভিজিৎ দিপকে। নয়াদিল্লি, ভারত; ২০ জুন ২০২৬

আন্দোলন দ্রুত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের প্রধান প্রধান শহরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার লিখিতভাবে আশ্বাস দেয়—শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হবে না, সংসদে পরীক্ষা সংস্কার ও জবাবদিহির বিষয়টি উত্থাপন করা হবে এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

সরকারের আশ্বাসে ওয়াংচুক অনশন প্রত্যাহার করলেও ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকে সিজেপি। ২০ জুলাই আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটা করা ও সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও তারা আন্দোলন চালিয়ে যায়। আন্দোলনকারীদের অনমনীয় অবস্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হন।