ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) বিরুদ্ধে কংগ্রেসের বিক্ষোভ। ২০ জানুয়ারি ২০২৬, কলকাতা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) বিরুদ্ধে কংগ্রেসের বিক্ষোভ। ২০ জানুয়ারি ২০২৬, কলকাতা

ভারতে সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে মুসলিম, অভিবাসী ও আদিবাসীদের কীভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে

ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনে চলমান ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশিত এক জুরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ কাজ অত্যন্ত তাড়াহুড়া এবং অগোছালোভাবে করা হচ্ছে। ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালার সঠিক নিয়ম এখানে মেনে চলা হচ্ছে না।

গত ২০ ডিসেম্বর নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে ভারত জোড়ো অভিযান, পিইউসিএল এবং এনএপিএম আয়োজিত ‘সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার রক্ষা’–বিষয়ক এক জাতীয় সম্মেলনে জুরি সদস্যরা রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, বিহার, গুজরাট, তামিলনাড়ু, গোয়া এবং উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মানুষের অভিজ্ঞতা শোনেন।

নির্বাচন কমিশনের বুথ লেভেল কর্মকর্তাদের (বিএলও) মাধ্যমে পরিচালিত এই সংশোধন প্রক্রিয়া তাদের ওপর কী রূপ প্রভাব ফেলছে—সেখানে সাধারণ মানুষ সেসব বিষয় জানিয়েছেন।

বিভিন্ন রাজ্যে বিএলও কর্মকর্তাদের আত্মহত্যা, শিক্ষকদের ওপর চাপ এবং এর প্রতিবাদ ও জেলা কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণে এই সংশোধন প্রক্রিয়াটি ইতিমধ্যে বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে সাধারণ নাগরিকেরা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া, তথ্যের অমিল এবং হঠাৎ করে নথিপত্র দাবির কারণে গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।

জুরি বোর্ড সাক্ষ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে জানিয়েছে, নথিপত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ২০০৩ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে সংযোগ খোঁজার কারণে সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে অভিবাসী, দরিদ্র এবং যাঁদের স্থায়ী ঘরবাড়ি নেই, তাঁরা চরম সমস্যার মুখে পড়ছেন। এ ছাড়া অনুপস্থিতি, ধর্ম, পরিচয়, জীবনযাত্রার মান, বয়স, এমনকি লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে অনেক প্রান্তিক মানুষ এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

বাদ পড়া অভিবাসীরা

রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে দেখা গেছে, অনেক কৃষিশ্রমিক কাজের প্রয়োজনে অন্য রাজ্যে থাকায় বাড়িতে অনুপস্থিত ছিলেন। ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, তাঁরা ভোটার হওয়ার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ছত্তিশগড়ের বস্তার অঞ্চলে নিষিদ্ধ মিলিশিয়া গোষ্ঠী ‘সালওয়া জুডুম’-এর সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষ নাম নিবন্ধন ফরম পাননি। প্রায় ৬৪৪টি গ্রাম ধ্বংস হয়েছে এবং ৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

মিলিশিয়া গোষ্ঠী রাজ্যে অনেকের ঘর পুড়িয়ে দেওয়ায় তাঁরা নথিপত্র হারিয়েছেন। সাবেক বিধায়ক মণীশ কুঞ্জামের মতে, বিএলও কর্মকর্তারা এসব এলাকায় খুব কমই যান এবং এই অঞ্চলে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার ভোটার বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা–কর্মীদের বিক্ষোভ। ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, হুগলি

ধর্ম বা পরিচয়

গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ রাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটারদের নাম নিবন্ধনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের বস্তি ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাঁদের ‘অবৈধ বাসিন্দা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আহমেদাবাদের আকবরনগরের একটি মুসলিম বসতি ভেঙে দেওয়ার পর হাইকোর্ট পুনর্বাসনের নির্দেশ দিলেও বিজেপি–দলীয় যোগী আদিত্যনাথের সরকার বস্তিটি নির্দেশ মানছে না। ‘উচ্ছেদ’ হওয়া বাসিন্দাদের অবৈধ বলে তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় নেওয়া হচ্ছে না।

এ ছাড়া তামিলনাড়ুর মুদুমালাই বনাঞ্চলের আদিবাসীদের মতো অনেক গোষ্ঠী সরকারি প্রকল্পের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের জবলপুরে প্রায় ১৫০ জন ভাসমান ভোটারকে ‘রোহিঙ্গা’ বা ‘বাংলাদেশি’ বলে তকমা দেওয়া হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম কেটে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অথচ তাঁদের কাছে ১৯৮৪ সাল থেকে তাঁদের পূর্বপুরুষদের ভোটার হওয়ার প্রমাণ রয়েছে।

বস্তিবাসী

মহানগর এলাকার বস্তিবাসী, বিশেষ করে তামিলনাড়ুর অনেক মানুষ এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছেন। মুম্বাই, জলন্ধর ও হায়দরাবাদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চবিত্ত এলাকার ৭৪ শতাংশ মানুষ ভোটার হতে পারলেও বস্তি এলাকার ৫০ শতাংশের কম মানুষ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে পেরেছেন।

জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা

বিহারে জীবিত থাকলেও অনেক বয়স্ক মানুষকে তালিকায় ‘মৃত’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর ফলে তাঁরা বৃদ্ধ ভাতা পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। ২০২৫ সালের আগস্টে বিহারের আরার এক চালককে ভুল করে মৃত ঘোষণা করার খবর পাওয়া গিয়েছিল। একইভাবে গুজরাটের আহমেদাবাদেও ১ হাজার ২০৬ জনকে তালিকায় ‘মৃত’ দেখানো হয়েছে।

নারী ও ট্রান্সজেন্ডাররা বাদ

রাজ্যগুলোতে নারী ভোটারের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। এর একটি কারণ হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের ‘স্বীকৃত আত্মীয়’ হিসেবে মানছে না। ফলে বিয়ের পর যাঁরা পৈতৃক গ্রাম ছেড়ে এসেছেন, তাঁরা সহজে যাচাইযোগ্য আত্মীয় খুঁজে পাচ্ছেন না। এ ছাড়া পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ট্রান্সজেন্ডারদেরও আবাসন সমস্যার কারণে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

ধারাবাহিক প্রভাব

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির নাম তালিকা থেকে বাদ পড়লে তাঁর সন্তানদের নামও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। কারণ, তাঁরা মা-বাবার তথ্য প্রমাণ করতে পারছেন না যে তিনি ভারতের নাগরিক। এ ছাড়া ভোটার কার্ডের নম্বর (ইপিআইসি) ও নামে ভুল থাকার কারণেও অনেকের নাম কাটা যাচ্ছে।

সম্মেলনে জানানো হয়, বিএলও কর্মকর্তারা প্রচণ্ড চাপের মধ্যে কাজ করছেন। কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন বিএলও কর্মকর্তাদের এই মানসিক চাপের বিষয়টি স্বীকার করছে না। এ ছাড়া ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে সংযোগ খোঁজা এবং নথিপত্রের কঠিন শর্ত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সবশেষে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ছাড়াই ভোটার তালিকার সঙ্গে আধার কার্ড যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারি বা হয়রানি হতে পারে। এতে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।