নরেন্দ্র মোদি সরকারের তৈরি আইনের বিরোধিতায় এবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে সরকারপন্থী হিসেবে পরিচিত সাংবাদমাধ্যম, যাকে ভারতে ‘গোদি মিডিয়া’ও ডাকা হয়। অন্ধ মোদিভক্ত বলে যেসব সংবাদমাধ্যম কয়েক বছর ধরে একাংশের কাছে চিহ্নিত, যাদের মালিক মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানিরা, তারাও ওই আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছে। বলেছে, এই আইনের বিধি বদল না হলে তথ্যানুসন্ধানী সাংবাদিকতা বলে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। নিউজরুম বন্ধ হয়ে যাবে।
ভারতের ২১টি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সংগঠন ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিএনপিএ) আজ মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রীয় ওই আইন চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার এজলাস এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে নোটিস পাঠিয়েছেন। ১৭ নভেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানি।
ডিএনপিএর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে দ্য হিন্দু, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে, এনডিটিভি, জি, নেটওয়ার্ক১৮–সহ দেশের ২১টি সংবাদমাধ্যম। কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি ‘ডিজিটাল পারসোনাল ডেটা প্রোটেকশন আইনকে (ডিপিডিপি) চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তারা বলেছে, এই আইন বলবৎ হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, এই আইনের বিধিগুলো দেশের প্রতিটি নিউজরুম বন্ধ করে দেবে।
ডিএনপিএর আইনজীবী মাধবী দিওয়ানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে ‘লাইভ ল সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, আজ প্রধান বিচারপতির এজলাসে তিনি বলেন, আমরা ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম। এই প্রথম আমরা একযোগে আবেদন করেছি। কারণ, এই আইন খবরের ধ্যানধারণাই বদলে দেবে। সাংবাদিকদের যদি ডেটা নীতির ওপর নির্ভর করতে হয়, যদি খবর প্রকাশে অনুমতির জন্য প্রতীক্ষা করতে হয়, তা হলে প্রতিবেদন করা অর্থহীন হয়ে যাবে।
কারণ, এই বিধি মানলে একজন সাংবাদিক যাঁর বিরুদ্ধে খবর করতে চাইছেন, তাঁর কাছ থেকে তাঁকে আগাম অনুমতি নিতে হবে। মাধবী দিওয়ানের প্রশ্ন, অনুমতি নিয়ে খবর প্রকাশ করতে হলে সে খবরের কোনো মানেই থাকবে না।
আবেদনের শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি আবেদনকারীদের বলেন, ‘আপনারা এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। আপনারাই সরকারকে পরামর্শ দিতে পারেন, কী করা হলে এই আইনের অপব্যবহার হবে না।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, নাগরিকদের অধিকার ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে একটা ভারসাম্য আনা প্রয়োজন। প্রত্যুত্তরে আইনজীবী দিওয়ান বলেন, এই আইন আদৌ সাংবাদিকদের জন্য করা হয়নি। কী জন্য এটা তৈরি, তা বোঝা দুষ্কর। অনুমতি নিয়ে খবর প্রকাশ করতে গেলে নিউজরুম বন্ধ করে দিতে হবে। কিছু গড়বড় হলে সাংবাদিকদের ফল ভুগতে হবে। এই ব্যবস্থা সেন্সরশিপের প্রাক্–মুহূর্ত।
ডিএনপিএর মূল আপত্তি, সাংবাদিকতা করার ক্ষেত্রে আইনে স্পষ্টভাবে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা নিয়ে অনুসন্ধানী খবর করতে গেলে সেই ব্যক্তি বা সংস্থার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের জন্য তাঁর সম্মতি নিতে হবে। ফলে হবে কী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির খবর করাই দুষ্কর হয়ে উঠবে। কারণ, তিনি সজাগ হয়ে যাবেন। জনস্বার্থে প্রকাশিত কোনো খবরের তথ্য সরিয়ে ফেলা বা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দেওয়ার দাবি তোলা হতে পারে।
ডিএনপিএ মনে করে, সাংবাদিকতার স্বার্থ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার স্পষ্ট সুরক্ষা আইন থাকা জরুরি।
সরকারি ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়েও ডিএনপিএ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আইনের ধারা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকার সংবাদমাধ্যমের কাছে ব্যক্তিগত তথ্য দাবি করতে পারে। ফলে সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর সূত্রের যোগাযোগ ফাঁস হওয়ার সম্ভাবনা প্রবলভাবে থেকে যাচ্ছে। যেসব সূত্র সরকারি সংস্থা, করপোরেট সংস্থা বা নির্বাচনী কারচুপির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের তথ্য দিতে আগ্রহী, তারা অনাগ্রহ প্রকাশ করতে পারে। সূত্রের গোপনীয়তা ব্যাহত হলে জনস্বার্থে দুর্নীতির মতো খবরের প্রকাশও কমে যাবে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর এই সংগঠন তথ্য জানার অধিকার আইন বা আরটিআই অ্যাক্টের সংশোধন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে। তারা বলেছে, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধের ফলে সরকারি দপ্তর বা জনজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। বাধা সৃষ্টি হবে। জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে তথ্য জানানোর পথেও বাধা সৃষ্টি করা হবে। ফলে জনতার তথ্য জানার অধিকার খর্ব হবে।
ডিএনপিএ গত আগস্টে কেন্দ্রীয় সরকারকে নিজেদের এসব আপত্তি ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল; কিন্তু সরকার মৌখিক আশ্বাস দিলেও লিখিতভাবে তা লিপিবদ্ধ করেনি। আইনে কোনো স্পষ্ট সুরক্ষা দেওয়া হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরে সাংবাদিকতায় কোন ধরনের সুরক্ষা রয়েছে, সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারকে তা জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, এ দেশের সাংবাদিকদেরও এমনই সুরক্ষা দেওয়া দরকার।
ডিপিডিপি আইনটি ২০২৩ সালে তৈরি করেছে। এর বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিধিমালা ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশিত হয়। ওই আইনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান ২০২৭ সালের মে মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগেই ডিএনপিএ দ্বারস্থ হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের।