সহিংসতার আশঙ্কায় ভারতের মণিপুর রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মণিপুর
সহিংসতার আশঙ্কায় ভারতের মণিপুর রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মণিপুর

মণিপুর রাজ্য সরকারে উপজাতীয় বিধায়কদের অংশগ্রহণ, আবার সংঘর্ষ

প্রায় এক বছর ধরে চলা রাষ্ট্রপতি শাসনের অবসান এবং নতুন রাজ্য সরকার গঠনের পর গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যে আবার তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে। গত বুধবার রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিংয়ের শপথ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে।

কুকি-জো বিধায়ক (এমএলএ) নেমচা কিপগেনকে খেমচাঁদ উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এরই বিরোধিতায় বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে কুকি-জো সম্প্রদায়ের একাংশ। আজ শুক্রবার রাজ্যজুড়ে তারা ধর্মঘটের ডাক দেয়। পার্বত্য ও উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে এ ধর্মঘট সফল হয়েছে বলেও জানা গেছে।

এর আগে কুকি-জো বিক্ষোভকারীরা ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে দক্ষিণ মণিপুরের চুরাচাঁদপুর জেলার তুইবং এলাকায় জড়ো হতে শুরু করে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, একটা পর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে প্রবল সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীরা পাথর ছোড়ে এবং টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে, লাঠিপেটা চালায়।

বিরোধিতার কারণ

কিছু কুকি-জো সংগঠন আগেই বলেছিল, যতক্ষণ না তাদের প্রাথমিক দাবি অর্থাৎ ‘পৃথক প্রশাসন’ (কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মতো ভিন্ন প্রশাসনের মর্যাদা) দাবি মেনে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেওয়া না হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো উপজাতীয় বিধায়ক সরকারে যোগ দেবেন না। যদি কোনো এমএলএ সরকারে যোগ দেন, তবে সেই অংশগ্রহণকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে চিহ্নিত করা হবে।

২০২৩ সালের মে মাস থেকে চলা জাতিগত হিংসায় মণিপুরে ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। গৃহহীন হয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। সহিংসতা এখনো পুরোপুরি থামেনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ওই অঞ্চল পরিদর্শনে যাননি।

এসব কারণের পাশাপাশি আরও একাধিক কারণ দেখিয়ে সরকারে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলো। উপজাতীয় এমএলএদের সাবধান করে দিয়ে তারা বলেছে, সরকারে যোগ দিলে কুকি-জোদের সামাজিক সংগঠনগুলো তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।

সামাজিকভাবে বর্জন

এসব সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকারের অনুরোধে নেমচা কিপগেন, এলএম খাউতে এবং এনগুরসাংলুর সানাট নতুন সরকারে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর জেরে কুকি-জো কাউন্সিল এই তিন উপজাতীয় বিধায়ককে সামাজিকভাবে বর্জনের ডাক দেয়। আজ শুক্রবার কুকি-জো অধ্যুষিত জেলা—যেমন চুরাচাঁদপুর, কাংপোকপি এবং ফেরজলে ধর্মঘট পালিত হয়েছে। অফিস-কাছাড়ি, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ থেকে যানবাহন পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

তবে উপজাতীয় বিধায়কদের সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে উপজাতি সমাজের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে। প্রধান সংগঠন কুকি-জো কাউন্সিল সরকারের যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করলেও দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগঠন থাদু ইনপি মণিপুর নেমচা কিপগেনসহ কিছু সংগঠন এই নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে।

থাদু ইনপির বক্তব্য, সরকারে যোগদানের মাধ্যমে উপজাতীয় সমাজ তাদের মতামত তুলে ধরতে পারবে এবং অনেক ক্ষেত্রে উপজাতীয় সমাজের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে পারবে। এর অন্যতম হলো, ত্রাণশিবিরে বসবাসকারী উপজাতীয় সমাজের বাস্তুচ্যুত মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া। তারা প্রায় তিন বছর ধরে চরম কষ্টের মধ্যে রয়েছেন।

নতুন মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ সিং জানিয়েছেন, তাঁর সরকারের প্রথম কাজ হবে ২০২৩ সাল থেকে ত্রাণশিবিরে বসবাসরত অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। ৫ ফেব্রুয়ারি বিধানসভায় নতুন সরকার তাদের আস্থা ভোটে জয়লাভের পর এই কাজ তিনি সুষ্ঠুভাবে করতে পারবেন বলে আশা করছেন।

তবে খেমচাঁদ আস্থা ভোটে জয়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়। এর বড় কারণ, মণিপুরের পরিস্থিতি ওপরে ওপরে শান্ত থাকলেও ভেতরে প্রবল উত্তপ্ত। সব পক্ষেরই বক্তব্য, আপাতত শান্তি ফিরলেও দোষীদের শাস্তি হয়নি এবং মূল রাজনৈতিক সংঘাতের ইস্যুগুলো অপরিবর্তিতই থেকে গেছে।

এ অবস্থায় নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় মেইতেই প্রধান এলাকা এবং উপজাতি সমাজের মানুষ বসবাস করেন এমন অঞ্চলের মধ্যে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। উপজাতীয় জেলা সদরগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে বিক্ষোভকারী এবং আধা সামরিক বাহিনীর মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে না পড়ে। তবে শুক্রবারও পরিস্থিতি যথেষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে।