তেলবাহী জাহাজের ইঞ্জিন রুমে মার্কিন হামলার ঘটনার ভিডিও প্রকাশ করেছে সেন্টকম
তেলবাহী জাহাজের ইঞ্জিন রুমে মার্কিন হামলার ঘটনার ভিডিও প্রকাশ করেছে সেন্টকম

ওমান উপকূলে জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৩ ভারতীয় নাবিক নিহত, মার্কিন কূটনীতিককে তলব

ওমান উপকূলে ইরানসংশ্লিষ্ট একটি তেলের ট্যাংকারে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। নয়াদিল্লি আজ বৃহস্পতিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে ঘটনাটিতে তিন নাবিক নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছিল।

ইরানভিত্তিক জাহাজে ওয়াশিংটনের অবরোধের অংশ হিসেবে এ মার্কিন অভিযান চালানো হয়। গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের এ নৌ অবরোধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম হরমুজ প্রণালিতে কোনো নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটল।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ অবরোধের পর থেকে মার্কিন বাহিনী এখন পর্যন্ত আটটি জাহাজ বিকল করেছে ও ১০০টিরও বেশি জাহাজের পথ ঘুরিয়ে দিয়েছে।

ইরানভিত্তিক জাহাজে ওয়াশিংটনের অবরোধের অংশ হিসেবে এ মার্কিন অভিযান চালানো হয়। গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের এ নৌ অবরোধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম হরমুজ প্রণালিতে কোনো নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটল।

এদিকে ওমান উপকূলে আরেকটি তেলের ট্যাংকারকে কেন্দ্র করে পৃথক একটি ঘটনা ঘটেছে বলে আজ জানিয়েছে ওমানে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাস। ভারতের নাবিকদের সংগঠন ‘ফরওয়ার্ড সিমেনস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’ জানিয়েছে, ওই জাহাজটির নাম ‘এমটি জলবীর’।

ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল তিন নাবিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে শুরুতে নিখোঁজ হওয়া তিন ভারতীয় নাবিকের মরদেহ উদ্ধার ও শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা মারা গেছেন বলে এখন নিশ্চিত হওয়া গেছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট শেয়ার করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, পালাউয়ের পতাকাবাহী ‘সেত্তেবেলো’ নামের জাহাজটিকে মার্কিন বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলার জন্য বারবার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু নাবিকেরা তা মানতে ব্যর্থ হন। এরপর একটি মার্কিন বিমান থেকে জাহাজটির ইঞ্জিন রুম লক্ষ্য করে ‘নির্ভুল নিশানাযোগ্য গোলা’ নিক্ষেপ করা হয়।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে শুরুতে নিখোঁজ হওয়া তিন ভারতীয় নাবিকের মরদেহ উদ্ধার ও শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা মারা গেছেন বলে এখন নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সর্বানন্দ সোনোয়াল, ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী

তিন নাবিক নিহত হওয়ার খবরটি নিশ্চিত করার আগে ভারত সরকার জানিয়েছে, ওমান উপকূলের কাছে সেত্তেবেলো জাহাজে হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। তবে ২১ ভারতীয় ক্রু বা নাবিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ‘এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’

ইরান ইস্যুতে চলমান সংঘাতের মধ্যে তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়ে থাকে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকেও মার্কিন বাহিনী ভারতীয় ক্রুসহ পালাউয়ের পতাকাবাহী একটি তেল ট্যাংকারে আঘাত হেনেছিল। সেন্টকম জানিয়েছে, ‘ম্যারিভেক্স’ নামের ওই জাহাজও মার্কিন নির্দেশনা মানতে ব্যর্থ হওয়ায় ওমান উপসাগরে সেটির ওপর গুলি চালানো হয়।

ভারতের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওমানের সামরিক বাহিনী হামলার ঘটনাটিতে ২৪ ক্রুর সবাইকে উদ্ধার করেছে।

মার্কিন কূটনীতিককে তলব

সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার জানায়, তেলবাহী ওই জাহাজে হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিককে তলব করেছে ভারত। গতকাল বুধবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়াদিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত প্রধানকে ডেকে এ হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে।

নিহত ভারতীয় নাবিকেরা হলেন—আদিত্য শর্মা, শিবানন্দ চৌরাসিয়া ও পাটনালা সুরেশ।

এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো না হলেও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাগারাজ নাইডু মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন জেসন মিকসকে তলব করেন।

মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘আমরা ওমান উপকূলে বাণিজ্যিক জাহাজ সেত্তেবেলোর ওপর হামলার নিন্দা জানাচ্ছি।’

ভারত বলেছে, এ অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ওপর ধারাবাহিক হামলা ‘গভীর উদ্বেগের’ বিষয় এবং চলমান সংঘাতের সরাসরি ফল। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক জলপথে বাধাহীন নৌ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে দেশটি।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাহাজে হামলার এ ঘটনার পর ভারত সরকার দিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন মিশনের উপপ্রধানকে তলব করেছে।

বর্তমানে কাজাখস্তান সফরে রয়েছেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গর।

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় বিদেশি কোনো দেশের রাষ্ট্রদূত বা কূটনীতিককে তলব করল ভারত।

কূটনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এমটি ম্যারিভেক্স তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় ভারতের যে প্রতিক্রিয়া ছিল, সেত্তেবেলোতে হামলার ঘটনায় তার তুলনায় অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে নয়াদিল্লি।

জাতিসংঘে ভারতের কড়া বার্তা

জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হারিশ পারভাথানেনি বলেছেন, ভারত বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘোর বিরোধী। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় এক কোটি ভারতীয় বসবাস ও কাজ করেন। তাঁদের নিরাপত্তা ভারতের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

হারিশ বলেন, এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর ভারতের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা নির্ভরশীল। ফলে বড় ধরনের কোনো অস্থিরতা ভারতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

পারভাথানেনি আরও বলেন, এ অঞ্চলের দেশ এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হামলার কারণে বহু ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি বলেন, সংঘাতের বিস্তার ও আরও দেশ এতে জড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ বেড়েছে। প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ এবং স্বাভাবিক জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়া ভারতের ওপরও প্রভাব ফেলছে।