ভারতে ওডিশার ভুবনেশ্বরে নির্বাচনী প্রচারে নরেন্দ্র মোদি। গতকাল শুক্রবার:
ভারতে ওডিশার ভুবনেশ্বরে নির্বাচনী প্রচারে নরেন্দ্র মোদি। গতকাল শুক্রবার:

কেজরিওয়ালের মুক্তি সত্যিই কি ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে সুবিধা দেবে

‘ইন্ডিয়া’ জোটের সঙ্গী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের জামিন বিরোধীদের এতটাই চনমনে করে তুলেছে যে রাহুল গান্ধী ভোটের ভবিষ্যৎ জানিয়ে দিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার উত্তর প্রদেশের কনৌজ ও কানপুরের ভরা জনসভায় তিনি বলেছেন, ‘৪ জুনের পর নরেন্দ্র মোদি আর প্রধানমন্ত্রী থাকছেন না। মোদি জমানা শেষ। দরকার হলে এ কথা আমি লিখে দিতে পারি।’

সমাজবাদী পার্টির (এসপি) নেতা অখিলেশ যাদবকে পাশে নিয়ে এই ভবিষ্যদ্বাণীর পাশাপাশি রাহুল আরও কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, চার শ পার তো দূর অস্ত, বিজেপি এবার ১৮০ থেকে ২০০ আসনের মধ্যে থেমে যাবে। এই দাবি তিনি অবশ্য আগেও করেছিলেন। কিন্তু শুক্রবার তাঁর সঙ্গে তিনি বললেন, হাওয়া ঘুরে গেছে। উত্তর প্রদেশে ইন্ডিয়া জোট এবার ৮০ আসনের মধ্যে ৫০টি জিততে চলেছে।

উত্তর প্রদেশের কনৌজে সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রধান অখিলেশ যাদবের সঙ্গে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)। গতকাল শুক্রবার:

যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ৫০ আসন জেতার দাবি হয়তো আকাশকুসুম কল্পনা।

কেননা, পাশার দান ১৮০ ডিগ্রি উল্টে দিতে গেলে যে ঝড়ের প্রয়োজন, এখনো গোটা দেশে তার ছিটেফোঁটাও দৃশ্যমান নয়। তা সত্ত্বেও এ ধরনের আশার ফুলকি ঝরছে রাহুলসহ ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রায় সব নেতার ভাষণে।

এ জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই প্রধানত দায়ী। প্রচারে যে ধরনের মন্তব্য তিনি করছেন, তা বিজেপির ক্যাডারদের উজ্জীবিত করতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, মঙ্গলসূত্র ছিনিয়ে নেওয়া, সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে মুসলমানদের বাঁটোয়ারা করা, হিন্দুদের কোটা ছেঁটে মুসলমানদের সংরক্ষণ দেওয়ার মতো অলীক ও কাল্পনিক শঙ্কা প্রকাশের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় মেরুকরণ তীব্রতর হচ্ছে এমন লক্ষণও নেই। তৃতীয়ত, হুট করে আম্বানি-আদানির কালোটাকা প্রসঙ্গ কেন যে তিনি তুলতে গেলেন, সেই রহস্যের পর্দা এখনো ওঠেনি।

এই প্রথম দেখা গেল, মোদির কথা দলের কেউ লুফে নিলেন না। কেউ-ই এর ব্যাখ্যা দিলেন না। অথচ রাহুল দ্বিগুণ উৎসাহে আদানি-আম্বানি প্রসঙ্গে সরব। এসব প্রলাপের মধ্য দিয়ে মোদি নিজের অসহায়তা ও দুশ্চিন্তাই প্রকাশ করে ফেলেছেন বলে সব মহলে আলোচনা চলছে। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের নির্বাচনে কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদির এমন ‘বিচ্যুতি’ দেখা যায়নি।

বিরোধী শিবিরে দৃশ্য অন্য রকম। এই প্রথম দেখা যাচ্ছে, হীনবলবিরোধীরা সবাই তাদের প্রচারের অভিমুখ অভিন্ন রেখেছে। বিরোধী কৌশল যথেষ্ট স্পষ্ট। তীব্র বেকারত্ব, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বৃদ্ধি, কৃষক অসন্তোষ, গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষা, জাতগণনা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বেচ্ছাচার, দুর্নীতি এবং স্বৈরতন্ত্র ছাড়া বিরোধীরা অন্য কোনো বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছে না।

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় কারাগার থেকে বের হয়ে কেজরিওয়ালও বারবার একটা কথাই বলেছেন, ‘স্বৈরতন্ত্রের অবসান’ ঘটানোই তাঁর লক্ষ্য। হিন্দু-মুসলমান, রামমন্দির, পাকিস্তানের মতো চেনা ফাঁদে একজনও পা বাড়াচ্ছেন না। অতীতে এই ভুল বিরোধীরা বারবার করেছে। এবার একের পর এক জনসভায় বিরোধী নেতারা ১০ বছরের ‘সাফল্যের খতিয়ান’ পেশ করতে মোদিকে চাপ দিচ্ছেন। অথচ মোদি তার ধারকাছ দিয়েও হাঁটছেন না।

এর প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে। হঠাৎই অনুগত গণমাধ্যমে (গোদি মিডিয়া) বিরোধীরা কিছু বেশি জায়গা ও গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। মোদির ‘প্রলাপ’ নিয়ে অল্পবিস্তর লেখালেখিও হচ্ছে। ফলে ‘বিজেপি খুব স্বস্তিতে নেই’ কিংবা ‘চার শ পার অসম্ভব’ অথবা ‘মোদি চিন্তিত’ এমন সন্দেহ ও সংশয় ধীরে হলেও সব মহলে মাথাচাড়া দিচ্ছে।

কারাগার থেকে মুক্তির পর দিল্লির বাড়িতে মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। গতকাল শুক্রবার

সবচেয়ে বড় কথা, যেসব গণমাধ্যম রাহুল গান্ধীর বোধবুদ্ধি, নেতৃত্ব, অপরিপক্বতা নিয়ে বরাবর কটাক্ষ করেছে, নেতিবাচক প্রতিবেদন লিখেছে, হঠাৎই তারা সংযত। তৃতীয় দফার ভোটের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ নিয়ে সয়লাব। সব জায়গায় আলোচিত বিষয় এখন একটাই, তাহলে কি হাওয়া ঘুরতে শুরু করেছে? মোদি কি বিপন্ন বোধ করছেন?

কেজরিওয়ালের জামিন বিরোধী উদ্দীপনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি জামিন পেয়েছেন শর্ত সাপেক্ষে। মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব তিনি পালন করতে পারবেন না। দপ্তর বা সচিবালয়ে যেতে পারবেন না।

সরকারি ফাইলে সই করতে পারবেন না। আবগারি মামলায় নিজের ভূমিকা নিয়ে কিছু বলতে পারবেন না। কোনো সাক্ষীর সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারবেন না। বিরোধীরা এসব নিয়ে ভাবিত নয়। ‘ইন্ডিয়া’ খুশি, কেজরিওয়াল প্রচার করতে পারবেন।

আজ শনিবার থেকেই জোর কদমে সেই প্রচার কেজরিওয়াল শুরু করে দিয়েছেন। দিল্লিতে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে আপ চার আসনে লড়ছে। বাকি তিন আসনে কংগ্রেস। হরিয়ানায় তারা লড়ছে দুই আসনে। চণ্ডীগড়ের কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে। ২৫ মে ষষ্ঠ দফায় দিল্লির ভোট মিটে গেলে ১ জুন ভোট হবে পাঞ্জাবে। সেখানে অবশ্য কংগ্রেস-আপ জোট হয়নি।

সব মিলিয়ে ৩১ আসনে কেজরিওয়ালের প্রচার বিজেপির বাড়া ভাতে কতটা ছাই ফেলে, শাসক দলের নেতারা তা বোঝার চেষ্টা করছে। বিজেপির এক নেতার কথায়, সুপ্রিম কোর্ট জামিন দেওয়ায় এমন ধারণা জন্মাতে পারে, সরকার যা করেছে, তা জবরদস্তি। অকাট্য প্রমাণ থাকলে জামিন হতো না। তিনি বলেন, সবকিছু খুব একটা ঠিক নেই। হরিয়ানা রাজ্য সরকারের সংকটও তা বুঝিয়ে দিচ্ছে।

হরিয়ানার বিজেপি সরকার হঠাৎই টলমল করছে। শরিক দল জেজেপি সরকার ছেড়ে বেরিয়ে কংগ্রেসকে সমর্থন দিয়েছে। তিন স্বতন্ত্র বিধায়কও বিজেপিকে ছেড়ে কংগ্রেসকে সমর্থনের কথা জানিয়েছে। কংগ্রেস দাবি জানিয়েছে, সংখ্যালঘু বিজেপি সরকার এখনই ফেলে দেওয়া হোক। রাজ্যপাল নিরুত্তর।

এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মদন বি লোকুর, দিল্লি হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি এ পি শাহ এবং ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক এন রাম প্রধানমন্ত্রী মোদি ও রাহুল গান্ধীকে প্রকাশ্য বিতর্ক সভায় অংশ নিতে অনুরোধ করেছেন। দুই নেতাকেই তাঁরা চিঠি লিখেছেন।

রাহুল চিঠির উত্তরে বলেছেন, তিনি প্রস্তুত। যেকোনো দিন যেকোনো স্থানে তিনি উপস্থিত থাকবেন।

গতকাল শুক্রবার লক্ষ্ণৌতে রাষ্ট্রীয় সংবিধান সম্মেলনে যোগ দিয়ে এ কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি প্রস্তুত। কিন্তু জানি, মোদিজি প্রস্তুত নন। উনি কোনো দিনই আমার সঙ্গে বিতর্কে অংশ নেবেন না।’
নরেন্দ্র মোদি সাবেক বিচারপতিদের সেই চিঠির জবাবই দেননি।