টিএস সিভাগনানাম
টিএস সিভাগনানাম

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পরে কেন বিতর্কিত এসআইআর ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগ করলেন বিচারপতি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার ঠিক এক দিন আগে দেশটির নির্বাচন কমিশনের এক তথ্যে দেখা গেছে, বিতর্কিত ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ১ হাজার ৬০৭ জন নাগরিকের আপিল সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল মঞ্জুর করেছেন। এর ফলে তাঁদের নাম আবার ভোটার তালিকায় যুক্ত করা হয়।

তবে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানতে পেরেছে, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি টি এস সিভাগনানামের নেতৃত্বাধীন ১৯টি ট্রাইব্যুনালের মধ্যে শুধু একটি ট্রাইব্যুনালই ৫ এপ্রিল থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ১ হাজার ৭১৭টি আপিল মঞ্জুর করেছে।

এই তো গেল একটি ট্রাইব্যুনালের কথা, এমন আরও ১৮টি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। তাই এখন প্রশ্ন উঠেছে—আসলে ঠিক কত আপিল মঞ্জুর হয়েছে। আর এর মধ্যে কতজনকে ভোটার তালিকায় যোগ করা হয়েছে কিংবা কতজন তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন।

গতকাল শুক্রবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিচারপতি সিভাগনানাম বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগ করেছেন। সংবাদমাধ্যমটি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেছেন।

এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে নির্বাচন কমিশন কোনো জবাব দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা মনোজ আগরওয়ালের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের ২০ মার্চের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী বিচারপতি সিভাগনানামকে উত্তর চব্বিশ পরগনা ও কলকাতার কয়েকটি বিধানসভা নির্বাচনী এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি মোট ১ হাজার ৭৭৭টি আপিল নিষ্পত্তি করেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৭১৭ জন নাগরিকের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন।

অন্যদিকে বীরভূম জেলায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের করা ৬০টি আপিল সিভাগনানাম খারিজ করে দেন।

সুপ্রিম কোর্ট সিভাগনানামকে প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুর পরিবারের কয়েকজন সদস্যের আবেদনের শুনানির নির্দেশও দিয়েছিলেন। কারণ, তাঁরাও ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিচারপতি সিভাগনানাম কংগ্রেসের ফারাক্কা আসনের প্রার্থী মোতাব শেখের আপিলও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি করেন। ভোটার তালিকা যাচাইয়ের সময় তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।

ট্রাইব্যুনাল জানতে পারেন, নিজের পরিচয় ও ভোটার হিসেবে যোগ্যতা প্রমাণে মোতাব শেখের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছিল। ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলা হয়, ‘এসব নথি যাচাইপ্রক্রিয়ার সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে মনে হচ্ছে।’

শেষমেশ মোতাব শেখের নাম ভোটার তালিকায় যোগ করা হয়। ফলে তিনি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিতে সক্ষম হন। তিনি ফরাক্কা আসনে নির্বাচিত হন।

সুপ্রিম কোর্ট গত ফেব্রুয়ারিতে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেন। ভোটার তালিকা যাচাইয়ের দায়িত্ব দেন জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারিক কর্মকর্তাদের। নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের মধ্যে ‘আস্থার অভাব’ থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নির্বাচন কমিশনের একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রায় ৬০ লাখ ভোটারের তথ্যে অসংগতি পাওয়া গিয়েছিল। সাত শর বেশি বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এগুলো যাচাই করে ২৭ লাখ ১৬ হাজার নাম তালিকা থেকে বাদ দেন।

পরে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির জন্য আদালতের নির্দেশ এবং কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পলের সুপারিশে নির্বাচন কমিশন ২০ মার্চ ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। এসব ট্রাইব্যুনালে কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের মধ্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সিভাগনানামও ছিলেন।

এরপর সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দেন। এতে বলা হয়, ২১ এপ্রিলের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে অনুমোদন পাওয়া ব্যক্তিরা ২৩ এপ্রিলের প্রথম দফার ভোটে অংশ নিতে পারবেন। আর ২৭ এপ্রিলের মধ্যে অনুমোদন পাওয়া ব্যক্তিরা ২৯ এপ্রিলের দ্বিতীয় দফার ভোটে অংশ নিতে পারবেন।

প্রথম দফার ভোটের আগের দিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা মনোজ আগরওয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছিলেন, সেদিন প্রকাশিত সম্পূরক ভোটার তালিকায় ১৩৯ জনের নাম রয়েছে। দ্বিতীয় দফার ভোটের আগের দিন তাঁর দপ্তরের তথ্য বলেছিল, আরও ১ হাজার ৪৬৮ জনের নাম ভোটার তালিকায় ফের যুক্ত করা হয়েছে। তবে তালিকা থেকে বাদ পড়া বাকি ২৭ লাখ ১৬ হাজার ভোটার ভোট দিতে পারেননি।

সুপ্রিম কোর্ট গত ১৩ এপ্রিলের এক আদেশে বলেছিলেন, সেদিন থেকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ও অন্তর্ভুক্তি—উভয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মোট ৩৪ লাখ আপিল জমা পড়েছে।