পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর আজ মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশে ভাইপো তৃণমূলের সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ৫ মে ২০২৬, কলকাতা
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর আজ মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশে ভাইপো তৃণমূলের সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ৫ মে ২০২৬, কলকাতা

তৃণমূলের বৈঠকে হাতে গোনা কয়েক নেতা, কমিটিতে বড় রদবদল

দলের ভেতর একের পর এক সংকট—নির্বাচনে পরাজয়, তারপর নবনির্বাচিত বিধায়কদের বিদ্রোহ এবং তারপর সংসদ সদস্যদের মধ্যেও দল ভাঙার গুঞ্জন বাড়তে থাকায় তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে গতকাল শুক্রবার তিনি দলে বড় ধরনের সাংগঠনিক রদবদল করেছেন। এতে তাঁর বিশ্বস্ত এবং পুরোনো নেতাদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও মমতা তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল রেখেছেন। তবে তাঁকে সাহায্য করতে রাজ্যসভার দুই সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেনকে দলের দুই যুগ্ম জাতীয় সম্পাদক করেছেন।

এর মাধ্যমে মমতা বিদ্রোহীদের এই বার্তাই দিলেন, সিদ্ধান্ত এখন থেকে যৌথভাবে নেওয়া হবে। অভিষেক একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।

শুক্রবার তৃণমূলের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকের পর এই ঘোষণা দেওয়া হয়। জানা গেছে, কলকাতার কালীঘাটে তৃণমূল নেত্রীর বাসভবনে আয়োজিত এই বৈঠকে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।

তৃণমূলের নবনির্বাচিত ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের দ্বিতীয় প্রধান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্ত অমান্য করেছেন। তাঁরা বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করার ঠিক দুদিন পরেই এই রদবদলের সিদ্ধান্ত এল।

যে বাদ পড়াটি সবচেয়ে নজর কেড়েছে

তৃণমূলের অন্যতম পরিচিত সংখ্যালঘু মুখ ও দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সেনাপতিদের একজন ফিরহাদ হাকিমের নাম এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

কলকাতা পুরসভার মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করার কয়েক ঘণ্টা পরেই হাকিমের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার বিষয়টি সামনে আসে। পদত্যাগ করার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এই চেয়ারে বসে থাকতে পারি না এবং এর মর্যাদাকে অসম্মান করতে পারি না।’

তৃণমূল যখন সবচেয়ে কঠিন ও অশান্ত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এ ঘটনাটি নেতৃত্বের সঙ্গে ফিরহাদ হাকিমের সমীকরণ নিয়ে নতুন করে জল্পনা বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তৃণমূল নেতৃত্ব দলের সব কমিটি এবং শাখা সংগঠনগুলো ভেঙে দেয়। এক বিবৃতিতে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দলের ‘প্রতিটি স্তরে আত্মদর্শন, কাজের পর্যালোচনা এবং সাংগঠনিক মূল্যায়নের ব্যাপক প্রক্রিয়া চালানো হবে।’

তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটিও নতুন করে সাজিয়েছে। বর্তমান রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে সরিয়ে সেই পদে সাবেক মন্ত্রী ও মমতার অনুসারী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে বসানো হয়েছে। অন্যদিকে, বক্সীকে দলের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সহসভাপতি করা হয়েছে।

এ ছাড়া সাজদা আহমেদ, মমতা ঠাকুর, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় এবং স্বাতী খন্দকারকে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যের সহসভাপতি করা হয়েছে। অরূপ বিশ্বাস, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, বাবর আলী, পুলক রায় এবং অণিমা পাত্রকে রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।

রাজ্য কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্যদের মধ্যে থাকবেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, রানা চট্টোপাধ্যায়, বিদেশ বসু, তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য, জয়া দত্ত, তাপস চট্টোপাধ্যায়, বসুন্ধরা গোস্বামী ও গৌতম দেব।

শাখা সংগঠনগুলোর মধ্যে অভিনেত্রী থেকে সংসদ সদস্য হওয়া সায়নী ঘোষকে তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতি পদে বহাল রাখা হয়েছে। মালা রায়কে দলের মহিলা শাখার সভাপতি করা হয়েছে। তৃণমূলের সূত্র অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে এই তালিকায় আরও নাম যুক্ত করা হবে।

রাজ্যসভার সংসদ সদস্য সুখেন্দু শেখর রায়ের একটি মন্তব্যের পরদিনই দলের এই পুনর্গঠন ঘোষণা করা হলো। সুখেন্দু শেখর রায় বলেছিলেন, উচ্চকক্ষে (রাজ্যসভা) দল ‘নিরাপদ’ থাকলেও লোকসভার ক্ষেত্রে একই কথা বলা যায় না।

সুখেন্দু বলেন, ‘এত অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৬০ জন বিধায়ককে দল ছাড়তে আমি কখনো দেখিনি। আমি যা বলতে চাইছি তা হলো, লোকসভায়ও একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখা যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’

তৃণমূলের এক বর্ষীয়ান সংসদ সদস্য বলেন, ‘সংসদীয় দলে ভাঙন ধরা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। আমরা ইতিমধ্যেই শুনেছি, প্রায় ২০ জন সংসদ সদস্য বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এই সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে।’