
হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারী প্রজন্ম ছিল মূলত হিন্দুত্ববাদের কট্টর সমর্থক। অন্যদিকে ইনস্টাগ্রাম প্রজন্ম একেবারেই বিদ্রোহী। হোয়াটসঅ্যাপ দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার সব কৌশল বিজেপির জানা ছিল। তারা এই প্রজন্মকে নিজেদের ইশারায় চালাতে পারত। কিন্তু ইনস্টাগ্রামের দুনিয়ায় এসে বিজেপি রীতিমতো দিশেহারা। এই তরুণদের দমাতে এখন তাদের হাতে পেশিশক্তি ছাড়া আর কোনো অস্ত্র নেই।
মা-বাবারা যখন হোয়াটসঅ্যাপে ছেলেমেয়েদের বার্তা পাঠিয়ে দেখেন যে তারা সেটা খুলেও দেখছে না, তখনই এই দূরত্বের বিষয়টি চোখে পড়ে। পরে তাঁরা বুঝতে পারেন, আজকাল ছেলেমেয়েরা ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট বা এ ধরনের মাধ্যমেই বেশি যোগাযোগ রাখে।
এরপর বাবা–মায়েরা ইনস্টাগ্রামে ছেলেমেয়েদের খুঁজতে যান। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই তাঁরা সন্তানদের অ্যাকাউন্ট খুঁজেই পান না। হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম প্রজন্মের মধ্যকার দূরত্বটা ঠিক এখানেই। আর বিজেপি নিয়ন্ত্রিত ভারতীয় রাষ্ট্র এবং দেশের সবচেয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যকার সম্পর্কের দূরত্বের মধ্যে এই দূরত্বেরই প্রতিফলন দেখা যায়।
২০০৯ সালে হোয়াটসঅ্যাপের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০১০ সালে আসে ইনস্টাগ্রাম। বর্তমানে বিশ্বে হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহারকারী ৩০০ কোটির বেশি। অন্যদিকে ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকারী ২৩৫ কোটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ধরন নিয়ে খুব নিখুঁত কোনো পরিসংখ্যান হয়তো নেই। তবে একটা কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তরুণ প্রজন্মের পছন্দের তালিকায় সবার ওপরে আছে ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটক। বয়স্করা এসব মাধ্যমে থাকলেও তাঁরা মূলত তরুণদের সঙ্গে তাল মেলাতেই এখানে আসেন।
ইনস্টাগ্রামে প্রবীণরা অনেকটা অনধিকার প্রবেশকারীর মতো আচরণ করেন। তাঁরা নিজেরাও সেটা বুঝতে পারেন। তবে পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রজন্মের আসল আড্ডার জায়গা হলো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। সেখান থেকেই তাঁরা ‘হোয়াটসঅ্যাপ আঙ্কেল’ খেতাব পেয়েছেন। নামের এই লিঙ্গভিত্তিক তকমাটি এখানে একেবারেই মানানসই।
হোয়াটসঅ্যাপ প্রজন্মের বাড়বাড়ন্ত ছিল বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগের যুগে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সেই বছরগুলোতে তারা তুলনামূলক সহজেই চাকরি পেয়েছে। এরপর তারা শহরে পাড়ি জমিয়েছে। তারা সহজাত হিন্দুত্ববাদী। তিরিশের কোঠায় এসে তারা হোয়াটসঅ্যাপকে নিজেদের ক্ষমতায়নের একটি হাতিয়ার হিসেবে খুঁজে পেয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপে ফরোয়ার্ড হয়ে আসা যেকোনো বার্তাই তারা চোখ বুজে বিশ্বাস করে। এরপর তারা সঙ্গে সঙ্গে সেটা অন্যদের ফরোয়ার্ড করে দেয়। এভাবেই তারা নিজেদের কুসংস্কার আর অর্ধসত্য ইতিহাসের পাঠ আরও ছড়িয়ে দেয়। এই প্রজন্মের একটি অংশ আবার অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে ভারত ছেড়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে পাড়ি জমিয়েছে। সেখানে তারা বিদেশি নাগরিকত্ব পাওয়ার অপেক্ষার প্রহর গুনছে।
তারা চায়, কয়েক হাজার বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষেরা যে যুদ্ধে হেরে গিয়েছিল বলে দাবি করা হয়, অন্যের সন্তানেরা যেন সেই যুদ্ধ নতুন করে শুরু করে। কিন্তু নিজেদের সন্তানেরা কী ভাবছে, সেটা তারা দেখতে পায় না। তারা শুধু উপদেশই দিয়ে যায়।
একটা পর্যায়ে গিয়ে রাষ্ট্র ও ‘হোয়াটসঅ্যাপ আঙ্কেল’দের ভাষা যেন একই রকম হতে শুরু করে। তারা বলতে থাকে, আরও একটি ভাষা শেখো, নাহলে বিপদ আছে। এটা খাও, ওটা খেয়ো না। এভাবে বিয়ে করো, নাহলে ফল খারাপ হবে। এমন পোশাক পরো, তা না হলে ভুগতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, ‘চাকরি না পেলে নিজে কিছু একটা করো।’
সম্প্রতি অনলাইনে অনেক আন্দোলনকারী জানিয়েছেন, তাঁরা পরিবারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলো থেকে বেরিয়ে আসছেন। কারণ, এসব গ্রুপ এখন গোঁড়ামি আর চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
প্রজন্মের এই নাটকীয় পরিবর্তনের দুটি উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে, যে পরিবর্তন শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বিশ্বজুড়েই ঘটছে। বলা যেতে পারে, একটি বিস্তৃত পরিসরে আরেকটি সীমিত পরিসরে।
তামিলনাড়ুতে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারণার সময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিক একটি মজার বিষয় খেয়াল করেন। তাঁরা দেখেন, অনেক পরিবারের ছেলেমেয়েরা জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর (থালাপতি বিজয়) আর তাঁর দল ‘তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম’-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে তাদের মা-বাবারা পুরোনো দ্রাবিড় দলগুলোর সঙ্গেই নিজেদের সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান রাজনীতিক নিকি হ্যালি ইসরায়েল ও মার্কিন আগ্রাসী সামরিক মতবাদের কট্টর সমর্থক। অথচ ২০০১ সালে জন্ম নেওয়া তাঁর ছেলে নালিন হ্যালি এই দুটিরই চরম সমালোচক। যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম প্রজন্ম ইসরায়েল ও মার্কিন সামরিক নীতি নিয়ে দুই দলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঐকমত্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
ইনস্টাগ্রাম এখন বিদ্রোহের এক গোপন আস্তানা। এটি যেন মুক্তির একটা পথ। এক অর্থে এটি ‘আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড’-এর (আমেরিকায় দাসদের মুক্ত করার গোপন নেটওয়ার্ক) ডিজিটাল রূপ। এর ব্যবহারকারীদের ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ভারত সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বিভাগের অধীন একটি শীর্ষ অর্থনৈতিক গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা) বা সিবিআই (সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ভারতের প্রধান তদন্তকারী সংস্থা) দিয়ে ভয় দেখানো যায় না। কারণ, বহুদলীয় রাজনীতির অর্থ আত্মসাৎ বা দুর্নীতির কোনো কাঠামোর সঙ্গে তারা জড়িত নয়।
বাবা–মায়েরা যে প্রজন্মকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, তাদের দমাতে রাষ্ট্রের হাতে এখন একটাই হাতিয়ার—পেশিশক্তি। দেশের প্রান্তিক বা পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোতে পেশিশক্তি প্রয়োগ হয়তো কাজে দিতে পারে। কিন্তু দেশের মূল ভূখণ্ডে বা প্রাণকেন্দ্রে বিষয়টা অনেক বেশি জটিল।
তাই প্রশ্ন হলো, কতটা বলপ্রয়োগ করা সম্ভব? আর কত দিন ধরে সেটা করা যাবে? সবচেয়ে বড় কথা, ‘হোয়াটসঅ্যাপ আঙ্কেল’রা কবে বুঝতে পারবেন যে এই ছেলেমেয়েরা অন্য কেউ নয়, তাদেরই নিজেদের সন্তান?
লেখক: ভার্গিস কে জর্জ; রেসিডেন্ট এডিটর, নয়াদিল্লি, দ্য হিন্দু