ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (মধ্যে) সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশি ও সুখবীর সিং সান্ধু। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নয়াদিল্লি
ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (মধ্যে) সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশি ও সুখবীর সিং সান্ধু। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নয়াদিল্লি

বাদ পড়া ভোটারদের ফেরাচ্ছে ইসি, তাহলে বিজেপিকে জেতাতেই এত কিছু করলেন জ্ঞানেশ

একেই বলে কেঁচে গণ্ডূষ করা। ভোটার তালিকায় দেদার নাম বাদ দেওয়া নিয়ে দেশজোড়া প্রতিবাদের মুখে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসি) নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো। কমিশন জানিয়েছে, ২০ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে যেখানে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) হয়ে গেছে, সেখানে বাদ পড়া ভোটারদের মধ্য থেকে বৈধদের ফেরাতে বিশেষ অভিযান চালানো হবে।

নতুন ভোটার ও যাঁরা নতুন করে নাম তুলতে চাইছেন, তাঁদের সঙ্গে ওই বৈধ ভোটারদের নাম ভোটার তালিকায় তোলা হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতের নির্বাচন কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ শুক্রবার তা প্রকাশ্যে এসেছে। কমিশন জানিয়েছে, এই কাজ করবেন প্রতি রাজ্যের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ডিইও) ও ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ইআরও)।

এসআইআরের নামে নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই ২০ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম কেটে দিয়েছে। এই তালিকার মধ্যে রয়েছে মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক জায়গায় নাম থাকা ব্যক্তি ও অবৈধ ভোটাররা। মৃত, স্থানান্তরিত ও একাধিক নাম থাকা ভোটারদের নিয়ে বিরোধীদের কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি ‘অবৈধ’ ভোটার বলে দাগিয়ে যাঁদের নাম খারিজ করা হয়েছে, তাঁদের নিয়ে।

বিরোধীদের অভিযোগ, এই কাজ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার করেছেন নিপুণভাবে, যাতে শাসক বিজেপির জয় নিশ্চিত হয়। জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্মে অসস্তুষ্ট হয়ে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে ১৪ বার আপত্তি নথিভুক্ত করিয়েছেন।

সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই বিরোধীরা হাতে নতুন অস্ত্র পেয়েছেন। শুরু হয় দেশজোড়া প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বিক্ষোভ। জ্ঞানেশের অপসারণের দাবিতে বিরোধীরা সরব। নাগরিক সমাজও আন্দোলনে নেমেছে। এই সার্বিক প্রতিরোধের মুখেই নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে।

কমিশনের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শুধু বাদ পড়া ভোটাররাই যে আবেদন করবেন তা নয়, কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিআরও, ইআরও ও মুখ্য নির্বাচনী আধিকারীকদেরও খুঁজে দেখতে হবে, এসআইআরের পরও কোনো বৈধ নাগরিকের নাম বাদ গেছে কি না। প্রয়োজনে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে ফর্ম ৬ ভরিয়ে আবার নাম তুলতে হবে।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, প্রতিটি রাজ্যে এসআইআরের আগের ও পরের তালিকা মিলিয়ে দেখতে হবে। কাদের নাম বাদ গেছে, সেই তালিকা তৈরি করতে হবে। সেই তালিকায় মৃত, স্থানান্তরিত ও একাধিক আসনে নাম থাকা ব্যক্তিদের বাদ দিতে হবে। যাঁরা ওই তালিকায় পড়েন না, তাঁদের নাম কী কারণে বাদ গেছে, তা বিচার করে দেখতে হবে। সেই অনুযায়ী দেখতে হবে বৈধ কেউ বাদ পড়লেন কি না।

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে বিএলও বা ব্লক লেভেল অফিসারদের। বৈধ মনে করলে তাঁরাই বাড়ি গিয়ে ফর্ম ৬ পূরণ করাবেন। এই ফর্ম ৬–ই হবে নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার একমাত্র উপায়।

জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা খড়্গহস্ত হওয়ার কারণ অনেক। এমনকি ইসির কাজ নিয়ে দেশের সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিরাও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করেছেন। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক লক্ষ্য প্রকৃত ভোটারদের নাম বেশি করে তোলা। ভোটদানে সবাইকে উৎসাহিত করা। ভোট ও গণতন্ত্র নিয়ে সবাইকে সচেতন করা।

কমিশন নিজেই এ জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে, যাতে দেশের গণতন্ত্র মজবুত করা যায়। এ কারণেই প্রতিবছর কমিশনের লক্ষ্য থাকে, আরও অনেক ভোটারের নাম তালিকায় তোলা। সেই উদ্দেশ্যই এবার ঘুরে গেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারের লক্ষ্য একটাই, যত বেশি সম্ভব বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া।

এর ফলে দেখা যায়, যেসব রাজ্যে এসআইআর হয়ে গেছে এবং ভোটার তালিকা প্রস্তুত হয়েছে, তা ২০২৬ সালের ভোটার তালিকাকে ২০১৫ সালের তালিকায় নামিয়ে এনেছে। অন্যভাবে বলা যায়, ২০২৬ সালে দেশের জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যা ২০১৫ সালের সমতুল্য হয়ে গেছে।

এসআইআর হওয়া রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে ২০১৪ সালে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭৬ কোটি ৬০ লাখ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ৯২ কোটি ৮০ লাখ। এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর আগে তা আরও বেড়ে হয় ৯৫ কোটি ২০ লাখ।

ভারতে তেলেঙ্গানা রাজ্যে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে কংগ্রেসের বিক্ষোভ। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, হায়দরাবাদ

এসআইআরের পর তৈরি খসড়া তালিকা দেখাচ্ছে, ওই ২০ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট বৈধ ভোটার কমে হয়েছে ৮১ কোটি ৭৯ লাখ, যা কিনা ২০১৫ সালের মোট ভোটার ৮১ কোটি ৬৯ লাখের চেয়ে মাত্র ১০ লাখ বেশি।

কয়েকটি রাজ্যে ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে নাম কাটার অনুপাতও বিস্ময়কর। যেমন মহারাষ্ট্র। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোট ও এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর মধ্যবর্তী সময়ে মহারাষ্ট্রে ভোটার বৃদ্ধি হয় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, অথচ খসড়া তালিকায় বাদ যায় ২১ শতাংশ ভোটারের নাম।

গুজরাটে ভোটার বেড়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ অথচ বাদ যায় ১৪ শতাংশের নাম। তামিলনাড়ুতে ভোটার বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ, বাদ গেছে ১৫ শতাংশের নাম।

আবার অন্য এক বিস্ময়ও উঠে এসেছে। কিছু কিছু রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রয়েছে, যেখানে ভোটার সংখ্যার হার কমে যাচ্ছিল। যেমন চণ্ডীগড়। সেখানে ভোটার সংখ্যা হ্রাস পেয়েছিল ২৭ শতাংশ। অথচ খসড়া তালিকায় বাদ যায় ৪০ শতাংশ ভোটার। নাগাল্যান্ডে ভোটার ৯ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গিয়েছিল, খসড়া তালিকায় তা আরও কমে, যা ১১ দশমিক ৭ শতাংশ নাম।

গত শুক্রবার দিল্লিতে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ভাতিজা লোকসভার সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে এসআইআরের সমালোচনা করেন। তাঁরা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখান, ওই প্রক্রিয়ায় কীভাবে বেছে বেছে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট কাটা হয়েছে।

যেমন মমতা দেখিয়েছেন, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে কলকাতা জেলায় তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিপক্ষের চেয়ে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৬৭৮ ভোট বেশি পেয়েছিল। ২০২৬ সালের এসআইআরে বাদ দেওয়া হয়েছে মোট ৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৬০ ভোটারের নাম। একইভাবে উত্তর চব্বিশ পরগনায় তৃণমূলের জয়ের মার্জিন ছিল ৯ লাখ ১৩ হাজার ৯৪৩ ভোট। সেখানে এই জেলায় বাদ দেওয়া হয়েছে মোট ১২ লাখ ৬০ হাজার ৯৬ জনের নাম।

নদিয়া জেলা তৃণমূলের শক্তি তুলনামূলকভাবে কম। সেখানে জয়ের মার্জিন ছিল ২০ হাজার ৯০৩, বাদ গেছে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৫৬৫ জন ভোটার। এভাবে হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, পশ্চিম মেদিনীপুরের হিসাব দাখিল করে মমতা বলতে চেয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমারই বিজেপিকে জয়ী করেছেন। পরিকল্পনা করে। ছক কষে।

জ্ঞানেশ কুমারের ছবিসংবলিত মুখোশ পরে শিকলে হাত বাঁধার প্রতীকী পোজ দিয়েছেন কংগ্রেসের এক কর্মী। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, জম্মু

বিরোধীরা তাই এই প্রক্রিয়াকে অবাস্তব, অযৌক্তিক ও অসাংবিধানিক বলে মনে করছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বিজেপি বারবার যে দাবি করে এসেছে, অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে, যে দাবিকে তারা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে রাজ্যে রাজ্যে ভোটে জিতছে, তার কোনো হিসাব নির্বাচন কমিশন এখনো দাখিল করতে পারেনি।

কত বিদেশি, কত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী, কতজন রোহিঙ্গার নাম এসআইআরের পর খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছে, আজও সেই খতিয়ান জ্ঞানেশ কুমারের নির্বাচন কমিশন জানায়নি।