ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির মুখেই কি ভারত ইইউর দিকে ঝুঁকছে

আগামী সোমবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। তবে এই সফর কেবল প্যারেড দেখা বা ভোজসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দুই পক্ষের মূল লক্ষ্য হলো, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ঝুলে থাকা ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ (এফটিএ) চূড়ান্ত করা।

অনেক বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা একে ‘মাদার অব অল ডিলস’ বা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যচুক্তি হিসেবে অভিহিত করছেন।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, নয়াদিল্লি

ট্রাম্পের প্রভাব ও বিশ্বরাজনীতি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চুক্তির পেছনে বড় একটি কারণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি। ট্রাম্প ভারতের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছেন। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও তাঁর বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ই বুঝতে পারছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ।

লন্ডনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত বিশ্বকে বার্তা দিতে চায়, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের (যুক্তরাষ্ট্র) মর্জির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তাদের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন ও বহুমুখী।

মুম্বাইয়ের একটি ব্যস্ত বিপণিবিতানে মানুষের ভিড়। ২২ ডিসেম্বর ২০২২, মুম্বাই

চুক্তিতে কার কী স্বার্থ

ভারত বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ও দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ। এই বছর ভারত জিডিপিতে জাপানকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইউরোপ চায় ভারতের এই বিশাল ক্রমবর্ধমান বাজারে তাদের জায়গা নিশ্চিত করতে। দুই পক্ষ এক হলে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের একটি মুক্তবাজার তৈরি হবে।

আবার ইউরোপ হলো ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অঞ্চল। গত বছর ভারত ইউরোপে ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। কিন্তু ২০২৩ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছু বিশেষ সুবিধা (জিএসপি) প্রত্যাহার করায় ভারতের ওষুধ, পোশাক ও ইস্পাত রপ্তানিতে সমস্যা হচ্ছিল।

ইইউ ও ভারতের মধ্যে নতুন এই চুক্তির ফলে সেই বাধা দূর হবে। এটি হলে ভারতীয় পণ্য কম দামে ইউরোপের বাজারে বিক্রি করা যাবে।

তবে এত বড় চুক্তি হওয়ার পথে বিতর্ক ও অমীমাংসিত বেশ কিছু বিষয়ের চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে।

যেমন কার্বন ট্যাক্স। ইউরোপ নতুন করে ‘কার্বন ট্যাক্স’ (সিবিএএম) চালু করেছে। ভারত মনে করে, এটি ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

আবার ভারত তাদের কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যকে এই চুক্তির বাইরে রাখতে চায়। তবে গাড়ি, ওয়াইন ও স্পিরিটের ওপর শুল্ক ধাপে ধাপে কমানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের কাছে আরও শক্তিশালী পেটেন্ট আইন ও তথ্যের সুরক্ষা দাবি করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২৭ জানুয়ারি শীর্ষ সম্মেলনে এই চুক্তির ঘোষণা আসতে পারে। এটি সফল হলে ভারত ও ইউরোপ উভয়ই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমাতে পারবে।

অবশ্য পরিবেশ বা মানবাধিকার ইস্যুতে ইউরোপের কিছু আপত্তি ছিল। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে হাত মেলানোকেই তারা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ভারতের রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা কমানোর সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদন পেতে সহায়ক হতে পারে। চুক্তিটি কার্যকর করতে ওই পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

জিটিআরআইয়ের অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, সিবিএএম কার্যত ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর নতুন ধরনের শুল্কের মতো কাজ করবে। এমনকি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আওতায় আমদানি শুল্ক তুলে নেওয়া হলেও।

শ্রীবাস্তব বলেন, এটি বিশেষভাবে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলোর (এমএসএমই) জন্য ক্ষতিকর। কারণ, তাদের উচ্চ মাত্রার নিয়ম মেনে চলার খরচ, জটিল প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ও কার্বন নির্গমন মানের ভিত্তিতে শাস্তি পাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে।

শ্রীবাস্তব আরও বলেন, এ চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধিসহায়ক অংশীদারত্ব হবে, নাকি কৌশলগতভাবে একপক্ষীয় কোনো চুক্তি হবে, তা নির্ভর করবে শেষ মুহূর্তে এসব বিষয় কীভাবে মীমাংসা করা হয়, তার ওপর।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে এটি হবে দুই পক্ষেরই লাভের চুক্তি।

সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অ্যালেক্স ক্যাপ্রি বলেন, এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য অবিশ্বস্ত অংশীদারদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত বাণিজ্যিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে পারে। এর অর্থ হবে ট্রাম্পের আমেরিকা বা সেই সঙ্গে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো। কখনো শুল্ক আরোপ, কখনো প্রত্যাহার, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কারণে যে ঝুঁকি থাকছে, তা–ও কমে আসবে।

ক্যাপ্রির মতে, ভারতের উচ্চ কার্বন নিঃসরণ ও মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে উদ্বেগের কারণে ইউরোপে এই চুক্তির বিরুদ্ধে কিছুটা আপত্তি রয়েছে।

তবে ২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা এখন এই বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি ইতিবাচক মনোভাব দেখাবেন।