ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানি
ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানি

মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্তকে নিউক্যাসলের অধ্যাপক নিয়োগ, যে কারণে সমালোচনা

ভারতের শীর্ষ ধনী আম্বানি পরিবারের উত্তরাধিকারী অনন্ত আম্বানিকে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে অধ্যাপক নিয়োগ করেছে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁকে ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস’ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা এবং বন্য প্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এ পদ দেওয়া হয়েছে।

তবে অনন্ত আম্বানি গুজরাটে যে বিশাল চিড়িয়াখানা পরিচালনা করেন, সেখানে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী কীভাবে আনা হয়েছে, তা নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে বন্য প্রাণী ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি তাঁকে নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক নিয়োগ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

অনন্ত আম্বানি ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির ছেলে। মুকেশ মূলত তেল ও গ্যাস ব্যবসা থেকে তাঁর সম্পদ গড়েছেন। তাঁর মালিকানায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার রয়েছে।

ভারত ও বিশ্বের পরিবেশবাদ নিয়ে গবেষণা করা একজন ব্যক্তি হিসেবে আমি অন্তত ৫০ জন, হয়তো ১০০ জন ব্যক্তির নাম বলতে পারি, যাঁরা এভাবে সম্মানিত হওয়ার জন্য আরও বেশি যোগ্য।
রামচন্দ্র গুহ, বুদ্ধিজীবী, ভারত

মুকেশ আম্বানির সঙ্গে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বিজেপির নীতির প্রশংসা করেছেন। তাঁর রিলায়েন্স শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রতি দলটিকে বড় অঙ্কের অনুদানও দিয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৪ সালে মুম্বাইয়ে অনন্ত আম্বানির জাঁকজমকপূর্ণ বিয়েতে অংশ নিয়েছিলেন।

ভান্তারায় দেড় লাখের বেশি প্রাণী

৩১ বছর বয়সী অনন্ত আম্বানি রিলায়েন্স গ্রুপের নির্বাহী পর্ষদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৯ হাজার কোটি পাউন্ড।

অনন্ত আম্বানি ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির ছেলে। মুকেশ মূলত তেল ও গ্যাস ব্যবসা থেকে তাঁর সম্পদ গড়েছেন। তাঁর মালিকানায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার রয়েছে।

গুজরাটে তাঁদের মালিকানাধীন তেল শোধনাগারের কাছে ১ হাজার ৪০০ হেক্টর (৩ হাজার ৫০০ একর) জায়গাজুড়ে তিনি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা ‘ভান্তারা’ গড়ে তুলেছেন। সেখানে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি প্রাণী রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ২০০টি সিংহ, ২৫০টি চিতাবাঘ ও ৯০০টি কুমির রয়েছে।

সেখানেই বিয়ের আগে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন অনন্ত। এতে তারকা ও রাজনীতিবিদেরা অংশ নিয়েছিলেন।

কিছু প্রাণীকে কীভাবে ভান্তারায় আনা হয়েছে, তা নিয়ে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন প্রশ্ন তুলেছিল। কারণ, এসব প্রাণীর অনেকগুলো বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতির। তবে ভান্তারার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ এ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সরকারি অর্থায়ন কমছে। এ অবস্থায় বড় আশঙ্কা হলো ধনকুবের ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণায় প্রভাব ফেলতে পারে।
লায়লা মেহতা, অধ্যাপক, সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়

নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণায় শিক্ষকদের পাশাপাশি ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বিস্ময় প্রকাশ এবং বিদ্রূপ করেছেন।

‘এটি বেশ রহস্যজনক একটি পছন্দ’

ভারতের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও ‘স্পিকিং উইথ নেচার: দ্য অরিজিনস অব ইন্ডিয়ান এনভায়রনমেন্টালিজম’ বইয়ের লেখক রামচন্দ্র গুহ বলেন, ‘আমাকে বলতে হচ্ছে, এটি বেশ রহস্যজনক একটি পছন্দ। ভারত ও বিশ্বের পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করা একজন ব্যক্তি হিসেবে আমি অন্তত ৫০ জন, হয়তো ১০০ জন ব্যক্তির নাম বলতে পারি, যাঁরা এভাবে সম্মানিত হওয়ার জন্য আরও বেশি যোগ্য। তাঁদের মধ্যে আছেন মৃত্তিকাবিজ্ঞানী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, পানি সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বন রক্ষায় কাজ করা ব্যক্তি, পরিবেশবিজ্ঞানী, দূষণ কমানোর বিশেষজ্ঞসহ আরও অনেকে। তাঁরা ভারত ও ভারতীয়দের জন্য আরও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণায় শিক্ষকদের পাশাপাশি ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বিস্ময় প্রকাশ এবং বিদ্রূপ করেছেন।

‘নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় কার পরামর্শে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা আমি ভাবছি। এসব ক্ষেত্রে কী করা হয়েছে আর কী করা হয়নি, বিশ্ববিদ্যালয়টি যথাযথভাবে যাচাই করেছে কি না, সেটিও একটি প্রশ্ন। (অনন্ত) আম্বানিকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ধাঁধায় ফেলার মতো একটি বিষয়। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, আম্বানির বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশের যত্নে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই অধ্যাপকের পদ দেওয়া হয়েছে।

ভারতে বেআইনি বন্য প্রাণী বাণিজ্য নিয়ে অনুসন্ধান করছেন ভুবন ম্যাঙ্গালোর। তিনি যুক্তরাজ্যের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভান্তারা নিয়ে একটি অভিসন্দর্ভ লিখছেন। অনন্ত আম্বানিকে নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালে অধ্যাপক নিয়োগ করা নিয়ে তাঁর প্রশ্ন, ‘এটা কি কোনো রসিকতা?’

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদেরও আপত্তি

নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়ন শাখার সভাপতি অধ্যাপক ম্যাট পেরি বলেন, পরিবেশগত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরা এ নিয়োগের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।

সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের জলবায়ু, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক লায়লা মেহতা জানান, বিষয়টি নিয়ে তাঁরও উদ্বেগ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সরকারি অর্থায়ন কমছে। এ অবস্থায় বড় আশঙ্কা হলো, ধনকুবের ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণায় প্রভাব ফেলতে পারে।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (বাঁয়ে) ও অনন্ত আম্বানি। ভারতের গুজরাটের জামনগরে ভান্তারা বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্র উদ্বোধনের পর, ৪ মার্চ ২০২৫

লায়লা মেহতা আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হওয়া উচিত ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তাদের একাডেমিক স্বীকৃতি দেওয়া নয়।’

গত এপ্রিল মাসে অনন্ত আম্বানি ‘ভান্তারা ইউনিভার্সিটি’ চালু করেছেন। এটিকে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পশুচিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্বের প্রথম বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা বিভাগের সহপরিচালক লর্ন স্টকম্যান বলেন, ‘জলবায়ু সংকটের এই সময়ে তেল ও গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করা জরুরি। তাই সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আমাদের আরও ভালো কিছু দাবি করতে হবে।’

প্রাণী আমদানি নিয়ে প্রশ্ন

জার্মান সংবাদপত্র সুড্ডয়চে সাইটুংয়ের ২০২৫ সালের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছিল, ভান্তারায় আনা অনেক প্রাণী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআর কঙ্গো) ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো দেশ হয়ে এসেছে। এসব দেশে বন্য প্রাণী কেনাবেচার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে স্বচ্ছতা কম। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, বিপন্ন প্রজাতির কিছু প্রাণী ভান্তারায় হয়তো অবৈধভাবে আনা হয়েছে।

গত বছরের আগস্টে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট চিড়িয়াখানাটি নিয়ে তদন্ত করে। এতে চিড়িয়াখানাটির পরিচালকদের কোনো অনিয়মের জন্য দায়ী করা হয়নি। তদন্তটি তিন সপ্তাহেরও কম সময় চলেছিল।

এরপর বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণকারী জাতিসংঘের সংস্থা সাইটিস চিড়িয়াখানাটি নিয়ে একটি তথ্য অনুসন্ধান করে। এতে বলা হয়, ভান্তারায় প্রাণী আনার জন্য ব্যবহার করা কিছু অনুমতিপত্র সম্ভবত জাল ছিল।

সাইটিসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিপুল সংখ্যায় প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, এর ফলে অসাবধানতাবশত অবৈধভাবে সংগ্রহ করা প্রাণীর চাহিদা তৈরি হতে পারে।’

সাইটিস ভারতকে বিপন্ন বন্য প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের সুপারিশ করেছিল। তবে পরে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান সাইটিসের সুপারিশের বিরোধিতা করে। সংস্থাটির এক বৈঠকে দেশ তিনটি বলেছিল, অবৈধভাবে প্রাণী আমদানির যথেষ্ট প্রমাণ নেই। এরপর সাইটিস তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়।

আগস্টে চিড়িয়াখানাটি তাদের কার্যক্রমে ‘নতুন করে শুরু’ করার ঘোষণা দেয়। এর অংশ হিসেবে সাইটিসের সাবেক প্রধানকে কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত সব ধরনের বন্য প্রাণী আমদানি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।

ভান্তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। আম্বানি পরিবার ও ভান্তারা এর আগে বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, ‘প্রাণীদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও যত্ন নেওয়াই আমাদের লক্ষ্য ও কাজ।’