
জনসমক্ষে বিবৃতি দিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যা বলেছিল, সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা পেশ করে সেই কথাই তারা জানাল। হলফনামায় কমিশন বলেছে, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে যে তিনটি নির্দেশ জারি করা হয়েছে, প্রতিটিই সর্বসম্মতভাবে গৃহীত। কোনো সিদ্ধান্তই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার একা নেননি।
হলফনামায় বলা হয়েছে, কমিশনের অভ্যন্তরে মতবিরোধের যে অভিযোগ উঠেছে, তা অসত্য। কোনো কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এমন হয়েই থাকে। কিন্তু মতপার্থক্যের অর্থ মতবিরোধ নয়। আলোচনা শেষে সব সিদ্ধান্তই ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত।
কমিশন এ কথাও জানাতে ভোলেনি, এই হলফনামাটিও তিন সদস্যের সম্মতিতে জমা দেওয়ার জন্য অনুমোদিত হয়েছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনের পর নির্বাচন কমিশনে জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্ম ও এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালে তাঁর একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা হয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে তিন সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচন কমিশনকে সুপ্রিম কোর্ট নোটিশ পাঠিয়েছিলেন। সেই নোটিশের জবাবেই গত সোমবার কমিশন এই হলফনামা জমা দেন। আজ মঙ্গলবার মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
হলফনামায় ইসি বলেছে, ২০২৫ সালের ২৪ জুন, ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর এবং ২০২৬ সালের ১৪ মে এসআইআর বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন নিয়ে কমিশন যে তিনটি নির্দেশ জারি করেছিল, প্রতিটি সিদ্ধান্তই ছিল সর্বসম্মত। হলফনামায় বলা হয়, অভিযোগগুলো মূলত এক সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
কমিশনের দাবি, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া হয়। পরামর্শ বা পর্যবেক্ষণ জানতে চাওয়া হয়। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও নানা প্রশ্ন বিবেচনায় আনা হয়। ভিন্নমত থাকার অর্থ যে মতবিরোধ, তা নয়। নথি প্রথমে যায় নির্বাচন কমিশনারদের কাছে। তারপর তা যায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে। জরুরি ক্ষেত্রে অনলাইনেও অনুমোদন নেওয়া হয়। পরে তা নথিভুক্ত করা হয়। এভাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত কখনো কারও একার হয় না। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় সর্বসম্মতিতে। সেটাই হয় কমিশনের সিদ্ধান্ত।
হলফনামায় বলা হয়েছে, কোনো ফাইলে ব্যক্তিগতভাবে লেখা সদস্যের নোট বা তাঁর তোলা প্রশ্নকে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে ধরা যায় না। অভ্যন্তরীণ কোনো নথি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের কোনো অনুমতিও কমিশন কাউকে দেয়নি।
এসআইআর বিতর্কে বড়ভাবে উঠে এসেছে ফর্ম ৬–এ পরিবর্তন ঘটানোর প্রশ্নটি। এ নিয়ে বিতর্কও হয়েছে প্রবলভাবে। কমিশন বলেছিল, বিহারের এসআইআরের সময় ওই বদলের অনুমোদন সুপ্রিম কোর্টই তাদের দিয়েছিলেন।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিলেন, তাঁরা কোনো অনুমতিই দেননি। তা ছাড়া বিহারের এসআইআরের সময় ওই প্রশ্নও ওঠেনি। হলফনামায় কমিশন সেই বিতর্কের জবাব দিয়েছে। তারা বলেছে, ফর্ম ৬–এর কোনো বদলই ঘটানো হয়নি। সেই বদল ঘটানোর একমাত্র এখতিয়ার আছে কেন্দ্রীয় সরকারের।
ফর্ম ৬ মারফত নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করা হয়। বিতর্ক দেখা দেয়, সেই ফর্মে নতুন তথ্যের সংযোজন ঘটানোর জন্য। কমিশন হলফনামায় বলেছে, নতুন ভোটারের নাম তোলার জন্য অনলাইন আবেদনের সঙ্গে একটি পৃথক ঘোষণাপত্র জোড়া হয়। সেটি আলাদা নথি। তাতে সংশ্লিষ্ট ভোটারের মা–বাবা, দাদা–দাদি কিংবা নানা–নানির নাম ২০০৩ সালে ভোটার তালিকায় ছিল কি না, তা জানাতে বলা হয়।
অনলাইন আবেদনের সঙ্গে সেই সংযোজন যেভাবে দেখানো হয়েছে, তাতে কারও কারও মনে হয়েছে, ফর্ম ৬–এ বদল ঘটানো হয়েছে। কমিশন সেই ভ্রমের কথা স্বীকার করেছে।
যেসব ভোটারের নাম পুরোনো ভোটার তালিকায় পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ যাঁদের ম্যাপিং হয়নি, তাঁদের শুনানির জন্য ব্যক্তিগতভাবে কমিশনের কার্যালয়ে হাজির হতে হবে না বলেও কমিশন জানিয়েছে। বুথ স্তরের কর্মকর্তারা তাঁদের বাড়ি গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করবেন। বিশেষ পরিস্থিতিতে শুনানির প্রয়োজন হলে, তা অনলাইনে করা হবে।
কমিশনের বিরুদ্ধে আরেক অভিযোগ ছিল ‘ইসিআইনেট’ মারফত সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার। সেই বিষয়ে হলফনামায় কমিশন বলেছে, ওই ব্যবস্থায় কোনো ভোটারের নাম তোলা বা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন নিবন্ধন কর্মকর্তার (ইআরও) নির্দেশ বাধ্যতামূলক। গোয়ার ভোটার তালিকা নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল সেই বিষয়ে কমিশন বলেছে, ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে ৮৮ জনের নাম ইতিমধ্যেই তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
সিইসি জ্ঞানেশকে তাঁর দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার আবেদন খারিজ করে বলা হয়েছে, তা করতে হলে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের মতো তাঁকেও অভিশংসিত করতে হবে। সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ছাড়া তেমন কিছু করা যায় না।
ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের কাজকর্ম নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ক্যাবিনেট সচিব টি ভি সোমনাথনকে চিঠি লিখেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি। হলফনামায় তারও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দুই কমিশনারের যৌথ নির্দেশের দরুন ডেপুটি কমিশনারের নির্দেশিকা কার্যকর করা হয়নি।