কলকাতার সমাজসেবী সংঘের মণ্ডপের দুর্গাপ্রতিমা
কলকাতার সমাজসেবী সংঘের মণ্ডপের দুর্গাপ্রতিমা

কলকাতার দুর্গাপূজায় থিমের চমক, হাওয়া মহল থেকে ভ্যাটিকান সিটি

আজ শুক্রবার মহাষষ্ঠী। দেবী দুর্গার বোধন ও পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। দশমী পর্যন্ত উৎসব চলবে। প্রতিবছরের মতো এবারও কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে দুর্গাপূজাকে ঘিরে চলছে থিমের প্রতিযোগিতা। প্রতিমা থেকে মণ্ডপ—সবকিছুতেই নতুনত্বের চমক দেখাতে প্রস্তুত পূজার আয়োজকেরা।

দুর্গাপূজার জন্য কলকাতার খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ইউনেসকো কলকাতার দুর্গাপূজাকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ বা মানবজাতির অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এর পর থেকে কলকাতার দুর্গাপূজার আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বেড়েছে।

এবারের পূজায় বিশেষ আকর্ষণ যোগ করেছে মহালয়া উপলক্ষে আয়োজন। কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে মহালয়ার দিন জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ড্রোন শো, আতশবাজি, আলোকসজ্জা, নাচ ও গানে মুখর হয়ে ওঠে শহর। অন্যদিকে আগের বছরগুলোয় বিসর্জনের পর রেড রোডে আয়োজিত দুর্গা কার্নিভ্যাল এবার হচ্ছে না। ফলে উৎসবের জৌলুশ বাড়াতে মহালয়ার আয়োজনটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

সন্তোষ মিত্র স্কয়ারের পূজার এবারের থিম বন্দে মাতরম। এটি কলকাতার সবচেয়ে বড় পূজাগুলোর একটি

মণ্ডপে হাওয়া মহল থেকে ভ্যাটিকান সিটি

এবার কলকাতার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে উঠে এসেছে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত স্থাপত্য, ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য ও সমসাময়িক নানা বিষয়। রাজস্থানের হাওয়া মহল, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির স্বামী নারায়ণ মন্দির, মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী প্যাগোডা এবং ভ্যাটিকান সিটির আদলে তৈরি হয়েছে মণ্ডপ। কোথাও রয়েছে গুজরাটের সোমনাথ মন্দির, কোথাও গঙ্গাদূষণ প্রতিরোধের বার্তা।

হিন্দুস্তান পার্ক সর্বজনীনের দুর্গাপ্রতিমা। এবার এ মন্দিরের মণ্ডপ দেশলাই কারখানার আদলে তৈরি হয়েছে মণ্ডপ

এ বছর ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ। তাঁকে থিম করে এবার পূজার মণ্ডপ সাজানো হয়েছে কলকাতার টালা পার্কের পূজায়। অন্যদিকে নলিন সরকার স্ট্রিটের থিম গঙ্গাদূষণ, হাতিবাগান নবীন পল্লির থিম যোগীন্দ্রনাথ সরকারের শিশুতোষ ছড়ার বই ‘হাসিখুশি’ এবং কুমোরটুলি পার্কের থিম ‘ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন?’

বাগবাজার সর্বজনীনের পূজা এবার ১০৮তম বছরে পা দিয়েছে। সেখানে মণ্ডপ তৈরি হয়েছে নিউ জার্সির স্বামী নারায়ণ মন্দিরের আদলে। সন্তোষ মিত্র স্কয়ারের থিম ‘বন্দে মাতরম’, নাকতলা উদয়ন সংঘের থিম ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ এবং একডালিয়া এভারগ্রিনের থিম গুজরাটের সোমনাথ মন্দির। হিন্দুস্থান পার্কে দেশলাই কারখানার আদলে তৈরি হয়েছে মণ্ডপ। আদি বাবুবাগানের থিম ক্ষুধা। ৭১ পল্লিতে প্লাস্টিকের বোতল ও বস্তা ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে মণ্ডপ।

দুর্গোৎসবের শুরুতেই হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠেছে কলকাতার পূজামণ্ডপগুলো। কলকাতার সমাজসেবী সংঘের পূজার প্যান্ডেলে দর্শনার্থীদের ভিড়

দমদম পার্ক ভারত চক্রের থিম বাংলার রথের ঐতিহ্য। দমদম পার্ক সর্বজনীনে থাকছে পুতুলনাচের আয়োজন। বেলেঘাটা ৩৩ পল্লির থিম পোখরান-২। সল্টলেকের বিজে ব্লকে সোমনাথ মন্দিরের আদলে মণ্ডপ তৈরি হয়েছে। এফডি ব্লকের থিম ‘নকশিকাঁথার মাঠ’। বরাহনগরের নেতাজি কলোনিতে উঠে এসেছে হরিদ্বারের আদল, আর উত্তর শহরতলির বিদ্রোহী স্পোর্টিং ক্লাবের থিম ‘ভ্যাটিকান সিটি’।

শ্রীভূমি স্পোর্টিংয়ের পূজার প্যান্ডেল। এটি কলকাতার নামী পূজাগুলোর একটি

এ ছাড়া কোথাও কয়লাখনির শ্রমিকদের জীবন, কোথাও প্লাস্টিক দূষণ, কোথাও আবার বাংলার ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি উঠে এসেছে পূজার আয়োজনে। মণ্ডপসজ্জার পাশাপাশি সামাজিক বার্তা দেওয়ারও চেষ্টা করছেন আয়োজকেরা।

বোসপুকুর শীতলা মন্দিরের দুর্গাপ্রতিমা

কলকাতার বাইরেও থিমের বৈচিত্র্য

কলকাতার বাইরে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেও পূজার আয়োজন কম আকর্ষণীয় নয়। পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ার চৈতন্যপুর সর্বজনীনের থিম ‘উড়ান’। মালদহের বালুচর কল্যাণ সমিতির মণ্ডপে থাকছে নীল নদের পাড় ও পিরামিডের আদল। কোচবিহারের দিনহাটার বলরামপুর সর্বজনীনে হরিদ্বার থেকে আনা তিন কোটি রুদ্রাক্ষ দিয়ে মণ্ডপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। জলপাইগুড়ির মোহিতনগরের পূজায় উঠে এসেছে বৃদ্ধাশ্রমের বিষয়টি।

চেতলা অগ্রগামী কলকাতার একটি বিখ্যাত পূজামণ্ডপ। সেখানকার মণ্ডপসজ্জা

পাশকুড়ার মৌচাক সেবা সংঘের মণ্ডপে থাকছে প্রাচীন মিসরের দেবদেবী ও স্থাপত্যের অনুকরণ। দিঘার অলংকারপুর সর্বজনীনের থিম ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের দেশবন্ধু স্পোর্টিং ক্লাবের থিম ইন্ডিয়া গেট। নদীয়ার কল্যাণীর আইটিআই মোড়ের পূজায় মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী প্যাগোডার আদলে তৈরি হয়েছে মণ্ডপ।

বোসের পুকুর তালবাগানের মণ্ডপ নির্মাণের কাজ চলছে

এ ছাড়া বিভিন্ন পূজামণ্ডপে উঠে এসেছে কুরুক্ষেত্র, রামায়ণ, পুরীর জগন্নাথদেবের রন্ধনশালা, বারানসির ঘাট এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানা দিক তুলে ধরছেন আয়োজকেরা।

ঝাড়গ্রামে মণ্ডপে মোদির ঝালমুড়ি খাওয়া

এবারের পূজায় সবচেয়ে আলোচিত থিমগুলোর একটি ঝাড়গ্রামের গিধনি স্পোর্টিং ক্লাবের মণ্ডপ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঝালমুড়ি খাওয়ার দৃশ্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই মণ্ডপ।

অপরূপ সাজে সাজানো হয়েছে বাঘা যতীন বিবেকানন্দ মিলন সংঘের মণ্ডপ

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে ঝাড়গ্রামে গিয়ে গত ১৯ এপ্রিল একটি দোকান থেকে ১০ টাকা দিয়ে ঠোঙায় ঝালমুড়ি কিনে খেয়েছিলেন মোদি। সেই দৃশ্য তখন আলোচনায় এসেছিল। ঝালমুড়ি বিক্রি করেছিলেন দোকানমালিক বিক্রম কুমার সাউ। এবার সেই ঘটনাকে থিম হিসেবে বেছে নিয়েছে গিধনি স্পোর্টিং ক্লাব।

৮২ বছরে পা দেওয়া এই পূজামণ্ডপে একটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাকে লোকজ খাবার ও স্থানীয় স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে কলকাতার বিখ্যাত মণ্ডপগুলোর বাইরে ঝাড়গ্রামের এই আয়োজনও দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

চোরবাগান সর্বজনীনের পূজা এবার ৯১ বছরে পা দিয়েছে

। ছবি: ভাস্কর মুখার্জিসব মিলিয়ে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের এবারের দুর্গাপূজায় ঐতিহ্য, স্থাপত্য, শিল্প, পরিবেশসচেতনতা ও সমসাময়িক ঘটনাকে ঘিরে নানা ধরনের আয়োজন দেখা যাচ্ছে। থিমের বৈচিত্র্য আর মণ্ডপের সৃজনশীলতা—দুইয়ের মধ্য দিয়েই পূজার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে জেলায়।