দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়া
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়া

আবগারি দুর্নীতি মামলায় খালাস পেলেন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল

আবগারি দুর্নীতি মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছেন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। একই মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন দিল্লির সাবেক উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়া।

যে ২৩ জনের বিরুদ্ধে সিবিআই ও ইডি দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করেছিল, দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউয়ের নিম্ন আদালত আজ শুক্রবার তাঁদের প্রত্যেককেই মুক্তি দিয়েছেন।

বিশেষ বিচারক জিতেন্দ্র সিং রায়ে বলেন, সিবিআই দুর্নীতি ও চক্রান্তের কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণই পেশ করতে পারেনি।

সিবিআইয়ের অভিযোগ, এই দুর্নীতির মূল হোতা ছিলেন কেজরিওয়াল। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় বিচারক বলেন, তদন্তকারী সংস্থার ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব স্ববিরোধিতায় ভরা। মামলায় অভিযোগের পক্ষে তথ্য–প্রমাণ দাখিল করতে না পারলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে মানুষের আস্থা টলে যায়।

যে ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে তেলেঙ্গানার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বিআরএস নেতা কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের কন্যা কবিতাও ছিলেন। সিবিআই অবশ্য জানিয়েছে, নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে যাবে।

রায় শোনার পর আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে গণমাধ্যমের সামনে কথা বলতে গিয়ে কেজরিওয়াল কেঁদে ফেলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নাম করে তিনি বলেন, স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের রচয়িতা তাঁরা। আম আদমি পার্টিকে শেষ করে দিতে তাঁরা দলের শীর্ষ পাঁচ নেতাকে জেলে পুরেছেন। ভুয়া মামলায় একজন মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে জেলে ঢোকানো হয়েছে।

কেজরিওয়াল বলেন, ‘স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এমন কখনো হয়নি। সারাক্ষণ আমাদের ওপর নোংরা ছিটানো হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা টিভিতে বলা হয়েছে, আমরা ভ্রষ্ট। আজ আদালত জানিয়ে দিলেন, আমরা কেউ ভ্রষ্ট নই।’

গণমাধ্যমের সামনে কাঁদতে কাঁদতে কেজরিওয়াল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে আমি বলতে চাই, ক্ষমতায় থাকার জন্য দেশের সঙ্গে, সংবিধানের সঙ্গে এমন ছেলেখেলা করবেন না। বিরোধীদের বিরুদ্ধে একটার পর একটা ভুয়া মামলা দিয়ে কারাগারে ঢোকানোর রাজনীতি করবেন না। দেশের প্রধানমন্ত্রীকে এটা শোভা দেয় না।’

আম আদমি পার্টির আরেক নেতা সিসোদিয়া বলেন, সত্যের জয় হলো।

কংগ্রেসকে হটিয়ে ২০১৩ সালে প্রথমবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তারপর ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি টানা দিল্লি শাসন করেছেন। ২০২৩ সালে কেজরিওয়াল, সিসোদিয়াসহ আম আদমি পার্টির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আন্দোলন শুরু করে বিজেপি।

বিজেপির অভিযোগ, ২০২১ সালে রাজ্য সরকার নতুন যে আবগারি নীতি চালু করে, এর ফলে সরকার পরিচালিত মদের দোকান তুলে দিয়ে বেসরকারিভাবে মদ বিক্রি শুরু হয়, তাতে ব্যাপক দুর্নীতি করা হয়েছিল।

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি ছিল, নতুন নীতিতে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি ও কালোবাজারি বন্ধ হবে। কিন্তু নীতি চালু করার আট মাস পর ‘পদ্ধতিগত ত্রুটি’ থাকার কারণে সরকার তা প্রত্যাহার করে নেয়। বিজেপির অভিযোগ, নতুন মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে বিপুল আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।

মনীশ সিসোদিয়া সেই সময় ছিলেন আবগারিমন্ত্রী। দুর্নীতির অভিযোগে ইডি ও সিবিআই তদন্ত শুরু করে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেপ্তার করা হয় সিসোদিয়াকে। দেড় বছর কারাবাসের পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের ঠিক আগে মার্চে ওই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় কেজরিওয়ালকে।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেই কেজরিওয়াল কারাগারে যান এবং কারাগার থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে থাকেন তিনি। লোকসভার ভোটে প্রচারের জন্য তাঁকে ২০ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়া হয়েছিল। তারপর আবার তাঁকে ফিরে যেতে হয় তিহার জেলে। পাঁচ মাস কারাবাসের পর অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে জামিন দেন।

আবগারি নীতি রূপায়ণের ক্ষেত্রে আর্থিক দুর্নীতির পাশাপাশি কেজরিওয়ালের বিরুদ্ধে বিজেপির দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল—মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি আবাসস্থল ঢেলে সাজাতে ৩৩ কোটি রুপি খরচ করার। বিজেপি সরকারি সেই বাসস্থানের নাম দিয়েছিল ‘শিশমহল’।

বিজেপির এই প্রচারের মোকাবিলা আম আদমি পার্টি করতে পারেনি। ২০২৫ সালের নির্বাচনে আম আদমি পার্টি হেরে যায়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বিজেপি ‘শিশমহল’ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। নতুন মুখ্যমন্ত্রীও সেই বাসস্থান ব্যবহার করছেন না।