
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে খোলামেলা সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সংবেদনশীলতার পরিচয় দেয়নি। দেশটি ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করছে। একই সঙ্গে ‘আত্মকেন্দ্রিক’ বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করছে। এতে বৈশ্বিক দক্ষিণ তথা দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির আচরণে এটি একটি নতুন প্রবণতা। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ভারত এ অবস্থান নিয়েছে।
কয়েক দশক ধরে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে মতবিরোধের বিষয়গুলো নীরবে, অনেকটা আড়াল থেকে সামাল দিয়েছে ভারত। প্রকাশ্যে এসব নিয়ে খুব একটা কথা বলেনি। ওয়াশিংটনের ক্ষেত্রেও নয়াদিল্লির অবস্থান এমনই ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দুই দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যেও মোটের ওপর ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে।
তবে কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ওয়াশিংটনের প্রতি সুরে পরিবর্তন এনেছে নয়াদিল্লি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে হোয়াইট হাউসে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই ভারত এখন আরও প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করছে।
নয়াদিল্লির এ পরিবর্তিত অবস্থান এমন এক সময়ে এসেছে, যা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে বারবার নতিস্বীকার করার অভিযোগে দেশে তাঁর ওপর চাপ বাড়ছে। বিরোধী দলগুলোও তাঁর সমালোচনা করছে।
গত বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন মোদি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ওই ফোনালাপকে ‘ফলপ্রসূ’ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তাঁর এ মন্তব্যে উষ্ণতা ছিল না, তা ছিল শীতল ও আনুষ্ঠানিক। আগের কয়েক বছরে ট্রাম্পকে তিনি যে ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করতেন, এবারের বক্তব্য সেটা থেকে একেবারেই আলাদা।
লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিয়েতিগ বাজপেয়ি বলেন, জয়শঙ্করের বক্তব্যে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্কের একটি ‘খোলামেলা মূল্যায়ন’ ফুটে উঠেছে।
চিয়েতিগ বলেন, স্পষ্টতই দুই দেশের সম্পর্কের সেই উজ্জ্বলতা আর নেই। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকে যেসব দেশ সবচেয়ে আশাবাদী ছিল, ভারত তাদের একটি। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে এখনকার অবস্থা বেশ ফারাক বলে মনে হচ্ছে।
স্পষ্টতই দুই দেশের সম্পর্কের সেই উজ্জ্বলতা আর নেই। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর দিকে যে দেশগুলো সবচেয়ে আশাবাদী ছিল, ভারত তাদের একটি। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে এখনকার অবস্থা বেশ ফারাক বলে মনে হচ্ছে।চিয়েতিগ বাজপেয়ি, দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক, চ্যাথাম হাউস
গত সোমবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশন শেষ হয়। এরপর এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধের বিষয়গুলো তুলে ধরেন জয়শঙ্কর।
জয়শঙ্কর বলেন, ‘ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দিকে একটু দূর থেকে তাকালে দেখি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বের অনেক দেশের আরও কঠিন সম্পর্ক রয়েছে। এটি হয়তো সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কথা নয়। তবে এটাই বাস্তবতা।’
বাণিজ্য
বাণিজ্য দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম বিরোধপূর্ণ বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৯১০ কোটি ডলার। তবে বাণিজ্যে ভারতের পক্ষেই ভারসাম্য বেশি। দেশটির পণ্য রপ্তানি ও আমদানির পার্থক্য ছিল ৫ হাজার ৮৪০ কোটি ডলার।
কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা বাড়ার পর ওয়াশিংটনের প্রতি সুরে পরিবর্তন এনেছে নয়াদিল্লি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে হোয়াইট হাউসে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই ভারত এখন আরও প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করছে।
জয়শঙ্কর শুরুতেই বলেন, ‘দেশগুলোর নিজেদের নিয়ে এতটা আত্মকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়, যাতে তারা নিজেদের জগতের মধ্যেই থাকবে, নিজেরাই সব সিদ্ধান্ত নেবে। এরপর বলবে, আপনাদের জীবন কঠিন করে তোলা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না।’
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের কথাও কিছুটা বলেছেন। তবে তিনি বলেন, দেশগুলোর মৌলিক প্রয়োজন যাতে উপেক্ষিত না হয়, তা সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝা উচিত।
এরপর জয়শঙ্কর ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য আলোচনা নিয়ে কথা বলেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব আলোচনায় এ পর্যন্ত একটি চুক্তির রূপরেখা তৈরি হয়েছে। তবে চুক্তি এখনো হয়নি।
জয়শঙ্কর বলেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু আয়ের পার্থক্য তো আছেই। এর পাশাপাশি দুই দেশের উৎপাদনব্যবস্থা ও সমাজের ধরনও অনেক আলাদা।
দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে কৃষি খাত। কৃষকদের সুরক্ষায় ভারত কয়েক দশক ধরে নিজেদের বাজার অনেকটাই বন্ধ রেখেছে।
বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে মোটামুটি একটি বোঝাপড়া হয়েছে জানিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, দ্রুত অগ্রগতির যে প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। আর বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি জটিল।
একসময় ট্রাম্পের আরোপ করা সবচেয়ে বেশি শুল্কের মুখে পড়া দেশগুলোর একটি ছিল ভারত। বিভিন্ন দেশের ওপর ব্যাপক হারে আরোপ করা ট্রাম্পের শুল্ক গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেন। এরপর তাঁর প্রশাসন দ্রুত অন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে ছিল বিশ্বজুড়ে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ।
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প এমন একটি আইনে সই করেছেন, যার আওতায় রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারবে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু আয়ের পার্থক্য তো আছেই। এর পাশাপাশি দুই দেশের উৎপাদনব্যবস্থা ও সমাজের ধরনও অনেক আলাদা।এস জয়শঙ্কর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ভারত
জয়শঙ্কর এসব পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত বছরের বাণিজ্য আলোচনা দুই দেশের সম্পর্কে ‘বেশ কিছু বাধা’ তৈরি করেছিল। তবে চুক্তি হয়ে গেলে তা ‘সম্পর্ক আরও ভালো করতে ভূমিকা রাখবে’।
কানাডা ও পাকিস্তানে ভারতের হাইকমিশনার এবং পোল্যান্ডে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক অজয় বিসারিয়া আল-জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো আরও প্রকাশ্যে বলবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা বেশ বেড়েছে। একই সঙ্গে এমন একটি ধারণাও তৈরি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চাপ দিচ্ছে। তা সত্ত্বেও ভারত এত দিন নীরব ছিল।
ভারতের ওপর নতুন করে আরোপ করা ১০০ শতাংশ শুল্ক এক মাসের কম সময়ের মধ্যে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। বিসারিয়া বলেন, এটি ‘এই মুহূর্তে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একধরনের চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার মতো বিষয়’।
অবসরপ্রাপ্ত এই কূটনীতিক আরও বলেন, যদি এটি বাস্তবে কার্যকর হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের সব প্রচেষ্টাই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়বে।
কৃষি খাত দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিরোধের বিষয়গুলোর একটি। কৃষকদের সুরক্ষায় ভারত কয়েক দশক ধরে নিজেদের বাজার অনেকটাই বন্ধ রেখেছে।
বাণিজ্যই দুই দেশের সম্পর্কের একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। গত বছরের মে মাসে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছিল অন্য ইস্যুতে। তখন ভারতশাসিত কাশ্মীরে সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলায় ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এরপর ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরী প্রতিবেশী পাকিস্তানের চার দিনের যুদ্ধ হয়।
এরপর ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলে নয়াদিল্লির অবস্থান অনেকটা আড়ালে পড়ে যায়। ট্রাম্প দাবি করেন, লড়াই বন্ধ না করলে তিনি দুই দেশকে অর্থনৈতিক ক্ষতির হুমকি দিয়েছিলেন।
কাশ্মীরের বিষয়ে ভারতের অবস্থান কঠোর। নয়াদিল্লির কাছে এটি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিষয়। এতে তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
তা সত্ত্বেও ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, যুদ্ধবিরতিতে তিনিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও তিনি এ দাবি করেছেন। এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশীর যুদ্ধ থেমেছিল। ট্রাম্পের এসব দাবি ভারতকে ক্ষুব্ধ করেছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তানের নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন। তাঁরা ট্রাম্পের ব্যাপক প্রশংসা করেন। এমনকি তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যও মনোনীত করেন। এরপর ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এতে নয়াদিল্লি স্পষ্টতই অসন্তুষ্ট হয়।
সবাই তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক আচরণের প্রচলিত রীতি ও নিয়মকে খুব একটা সম্মান করেন না। এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক সামলাবেন?হর্ষ পান্ত, ভাইস প্রেসিডেন্ট, অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন
জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের জন্য ‘বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ একটি বিষয় হলো ‘সন্ত্রাসবাদ’।
পাকিস্তানের প্রসঙ্গ টেনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কোনো প্রতিবেশী দেশের পরিকল্পিত নীতির কারণে আমাদের মতো দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে, এমন দেশ খুব কমই আছে।...আমাদের কাছে যে বিষয়টি এত গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি যদি যথেষ্টভাবে বোঝা, উপলব্ধি করা বা সহানুভূতির সঙ্গে দেখা না হয়, তাহলে সেটিও একধরনের সমস্যা তৈরি করে।’
ভারতের প্রধান উদ্বেগগুলো তার অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র ‘পুরোপুরি উপলব্ধি করে না’ বলেও মন্তব্য করেন জয়শঙ্কর।
অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক বিসারিয়া বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির সুরের এ পরিবর্তন গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে পাওয়া একটি শিক্ষা। তাঁর ভাষ্যমতে, ভারত-পাকিস্তানের ‘যুদ্ধবিরতির ঘটনার পর সুর বদলে যায়। এরপর সবকিছু আরও খারাপ হয়েছে।’
নয়াদিল্লিভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পান্ত বলেন, ‘ভারতের সংবেদনশীল বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পাকিস্তান নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে এ অনুভূতি তৈরি হয়েছে—আমাদের বিষয়টি এখন প্রকাশ্যে তুলে ধরা দরকার।’
জয়শঙ্করের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে হর্ষ পান্ত আল-জাজিরাকে বলেন, ‘শীর্ষ পর্যায়ে যখন আপনি পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি দেখতে পান না, তখন হিসাব-নিকাশ বদলে যায়। তখন মতপার্থক্যগুলো প্রকাশ্যে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির আওতায় বিদেশি কর্মীরা বিশেষায়িত ক্ষেত্রে নিয়োগের সুযোগ পান। এ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশগুলোর একটি ভারত। তবে ট্রাম্পের সময়ে কর্মসূচিটি নিয়ে সমালোচনা বেড়েছে। তাঁর প্রশাসন আবেদনকারীদের জন্য নানা ধরনের বাধা ও ফি বাড়িয়েছে। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (ম্যাগা) আন্দোলনের সমর্থকেরা কর্মসূচিটির সমালোচনা করে থাকেন।
ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতির প্রসঙ্গ টেনে জয়শঙ্কর বলেন, অনেক বছর ধরে মানুষের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াতকে অর্থনৈতিক লাভ হিসেবে দেখা হয়েছে। এখন মানুষের চলাচলের অর্থনীতি ও এর রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্তত কিছু মহলে এমনটাই হচ্ছে।...জনমতের দিক থেকে এটি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জয়শঙ্করের এসব কথা থেকে মনে হয়, নয়াদিল্লির ওপর দেশের অভ্যন্তরীণ চাপ শেষ পর্যন্ত প্রভাব ফেলছে।
বিসারিয়া বলেন, মোদি দেশের ভেতর চাপ অনুভব করছেন। আগামী বছর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন রয়েছে। এর মধ্যে কিছুটা সরকারবিরোধী মনোভাবও আছে। এ কারণে সরকার যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মেনে নিচ্ছে, নয়াদিল্লির অবস্থান এমন হওয়া উচিত নয়।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার সময় নয়াদিল্লির কৌশলগত মহলের অনেকে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। এর কারণ ছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মোদির সঙ্গে তাঁর উষ্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক। কিন্তু পরবর্তী কয়েক মাসে সেই সম্পর্ক দ্রুত বদলে যায়।
হর্ষ পান্ত বলেন, অভিবাসনের মতো বিষয়গুলো ভারতের সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে থাকে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটির মানুষের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে আকর্ষণীয় অংশীদার করে তোলার ক্ষেত্রে অনেক বছর ধরে এ ধরনের বিষয় ভূমিকা রেখেছে।
তবে এখন একই বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন হর্ষ পান্ত।
হর্ষ পান্ত বলেন, ‘ভারতের জনমতেও যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসছে। আমার মনে হয়, সরকার এখন প্রকাশ্যেই সেই নেতিবাচক মনোভাবের কথা বলছে।’
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার সময় নয়াদিল্লির কৌশলগত মহলের অনেকে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। এর কারণ ছিল, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মোদির সঙ্গে তাঁর উষ্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক।
কিন্তু পরবর্তী কয়েক মাসে সেই সম্পর্ক দ্রুত বদলে যায়।
তবু চ্যাথাম হাউসের বাজপেয়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়লেও ‘দুই দেশই সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা ছেড়ে দেয়নি’।
এই বিশ্লেষক জয়শঙ্করের বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কঠিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে না।
বাজপেয়ি মনে করেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার প্রধান কারণ ভারতের কোনো নীতি নয়, বরং ট্রাম্প প্রশাসনের লেনদেনের হিসাব-নিকাশ এবং খামখেয়ালি পররাষ্ট্রনীতি। এসব কারণ বদলালে ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক আবার ভালো হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে হর্ষ পান্ত বলেন, ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে কি না, সেটাই এখন নয়াদিল্লির সামনে প্রশ্ন। তবে এই অপেক্ষা ভারতের একার নয়।
হর্ষ পান্তের ভাষায়, সবাই তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক আচরণের প্রচলিত রীতি ও নিয়মকে খুব একটা সম্মান করেন না। এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক সামলাবেন?