কেরলমে সরকার গঠন, তামিলনাড়ুতে সরকারের শরিক হওয়া ও কর্নাটকে মসৃণভাবে মুখ্যমন্ত্রী বদলের পর কংগ্রেস চাইছে দ্রুত ‘ইন্ডিয়া’জোটকে সক্রিয় করে তুলতে। সেই লক্ষ্যে আগামী জুন মাসের প্রথমার্ধে দিল্লিতে জোট শরিকদের বৈঠক ডাকার তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
একই সঙ্গে শুরু হয়েছে জোটে নতুন শরিকদের নিয়ে আসার চেষ্টা। সে জন্য ওডিশার বিজু জনতা দলের নেতা নবীন পট্টনায়ক ও অন্ধ্র প্রদেশের ওয়াইএসআর কংগ্রেস নেতা জগনমোহন রেড্ডির মন বোঝার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ইন্ডিয়া জোট কখনো সেভাবে জমাট বাঁধতে পারেনি অনেক কারণে। তবে প্রধান কারণ ছিল নেতৃত্বের প্রশ্ন। শুরুর সময় জেডিইউ নেতা নীতীশ কুমার নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী ছিলেন। তাঁকে সমর্থন করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীকে কখনো নেতা হিসেবে মানতে চাননি। পরবর্তী সময় জেডিইউ সরে যায়। তারা বিজেপির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে। নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা যদিও বন্ধ করেননি মমতা। ঠারেঠোরে বোঝাতে থাকেন, তিনিই নেতৃত্বদানের উপযুক্ত। কংগ্রেসের নেতৃত্বদানের বিরুদ্ধে তিনি ঘরের মধ্যে ঘরের মতো জোটের মধ্যে জোট তৈরিতে সচেষ্ট হন।
সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব ও আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে কাছে টানার চেষ্টা করেন। ফলে বিজেপি বিরোধিতায় কখনো সেই অর্থে ‘ইন্ডিয়া’জোটবদ্ধ থাকতে পারেনি। সাম্প্রতিক ভোটের ফলাফল সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। মমতা–‘মিথ’ ধূলিসাৎ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। মহারাষ্ট্রে হীনবল হয়েছে শিবসেনা, এনসিপিও। কেরলমে বামপন্থীরাও পরাস্ত। আসামে পর্যুদস্ত হলেও কেরলম ও তামিলনাড়ুতে কংগ্রেসের সাফল্য তাদের ঘিরে নেতৃত্বদানের অধিকার নিয়ে তোলা প্রশ্নগুলো দুর্বল করে তুলেছে। এই সুযোগটাকেই কংগ্রেস কাজে লাগাতে চাইছে।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটে ধরাশায়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মমতা ইন্ডিয়া জোটকে শক্তিশালী করে তোলার কথা বলেছিলেন। বস্তুত জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া ছাড়া মমতার কাছে অন্য কোনো উপায়ও নেই। এই মুহূর্তে তাঁর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা দল ধরে রাখা। তা কতটা সম্ভবপর হবে, সে বিষয়ে ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। জয়ী বিধায়কদের অনেকেই ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে বিজেপির দিকে ঝুঁকছেন। দলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে দোলাচল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিষোদ্গার করছেন বহু নেতা। এই পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক থাকতে মমতা ইন্ডিয়া জোটকে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন।
কংগ্রেসও চাইছে সুযোগটা কাজে লাগাতে। জুন মাসে জোটের বৈঠক ডেকে বিজেপিবিরোধী রাজনীতির ছক তৈরিতে কংগ্রেস তাই সচেষ্ট।
প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে কথাও শুরু হয়েছে। আগামী জুন মাসের কোন সময়ে দিল্লিতে জোটের সম্মেলন করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। কংগ্রেস সূত্রের খবর, মমতা-অভিষেক ছাড়াও ওই বৈঠকে থাকবেন উত্তর প্রদেশের অখিলেশ যাদব, বিহারের আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব, মহারাষ্ট্রের শিবসেনার উদ্ধব ঠাকরে ও এনসিপির শরদ পাওয়ার, জম্মু-কাশ্মীরের ওমর আবদুল্লাহরা। বামনেতারাও থাকবেন। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মাত্র ৩৭ শতাংশ ভোট পাওয়া বিজেপির মোকাবিলায় ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটে রাজ্যে রাজ্যে কী কৌশল নেওয়া দরকার, ওই সম্মেলনে তা আলোচনা করা হবে।
কংগ্রেস চাইছে ইন্ডিয়া জোটের পরিধি বাড়াতে। নতুন শরিকদের নিয়ে আসতে। যেমন তামিলনাড়ুর টিভিকে, ওডিশার বিজেডি, অন্ধ্র প্রদেশের ওয়াইএসআর কংগ্রেস ও তেলেঙ্গানার বিআরএস। এসব দলকে কংগ্রেস বোঝাতে চাইছে, বিজেপির ঘর করার অর্থ ধীরে ধীরে নিজেদের বিলুপ্ত করে ফেলা।
তামিলনাড়ুতে সরকার গড়ার প্রশ্নে ডিএমকের সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। কিন্তু তবু চেষ্টা চলছে ডিএমকে ও টিভিকে দুই দলকেই জোটে টানার।
বিজেপির সার্বিক আগ্রাসন সত্ত্বেও পাঞ্জাবে সদ্য সমাপ্ত পৌরসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে আম আদমি পার্টি (আপ) বিপুল সাফল্য পেয়েছে। রাজ্যের মোট ১০২ পৌরসভার ১ হাজার ৯৭৭ ওয়ার্ডের মধ্যে আপ জিতেছে ৯৫৮টি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কংগ্রেস, ৩৯৭ ওয়ার্ড জিতে। তৃতীয় হয়েছে শিরোমনি অকালি দল। তারা জিতেছে ১৯১ ওয়ার্ড। বিজেপি ১৭২ ওয়ার্ড জিতে চতুর্থ স্থানে। আপের এই সাফল্য আরও উল্লেখযোগ্য এই কারণে যে গত মাসেই রাঘব চাড্ডাসহ তাঁদের রাজ্যসভার ৭ সদস্য বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। ওই সদস্যদের মধ্যে ৬ জনই পাঞ্জাবের। সেই ধাক্কা সামলে পৌরসভা ও পঞ্চায়েত ভোটে আপ সাফল্য পেয়েছে। আগামী বছর পাঞ্জাবে বিধানসভার ভোট। সেখানে ইন্ডিয়া জোটের দুই শরিক আপ ও কংগ্রেস প্রতিদ্বন্দ্বী। এ বিষয়েও ইন্ডিয়া জোটকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিজেপির বিরুদ্ধে সার্বিক লড়াইয়ে সেই দায়িত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিতে আগ্রহী বলে ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন।