প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভের সময় ছাত্রনেতা নেহা বোরাকে আটক করে পুলিশ। ৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভের সময় ছাত্রনেতা নেহা বোরাকে আটক করে পুলিশ। ৩ অক্টোবর ২০২৬

ভারতে শিক্ষার্থী আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা কে এই নেহা বোরা

অনশন করছেন তিনি, বক্তৃতা দিচ্ছেন, রসিকতা করছেন বা গান গাইছেন, কখনো কাঁটাতারে জড়ানো পুলিশের লোহার ব্যারিকেডের ওপর লাফিয়ে উঠে পড়েছেন, জ্বালাময়ী স্লোগান দিচ্ছেন—ভারতীয় এই তরুণীর ছবি–ভিডিওতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সয়লাব।

এই তরুণীর নাম নেহা বোরা। ভারতে সম্প্রতি শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলনের ‘পোস্টার গার্ল’ হয়ে উঠেছেন এই তরুণী।

২৯ বছর বয়সী নেহা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী। সেই সঙ্গে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী–লেনিনবাদী) লিবারেশন বা সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি।

২৯ বছর বয়সী নেহা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী। সেই সঙ্গে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী–লেনিনবাদী) লিবারেশন বা সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি।

গত জুন ও জুলাই মাসে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চলার সময় নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভস্থলের কাছে যে ছয় শিক্ষার্থী অনশন করেছিলেন, তাঁদের একজন নেহা।

নেহা বোরা

২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর উদ্‌যাপনের একটি ভিডিও পোস্ট করে নেহা ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘আমি যদি নাচতে না পারি, তাহলে সেটা আমার বিপ্লব নয়।’

আমি যদি নাচতে না পারি, তাহলে সেটা আমার বিপ্লব নয়!
...নেহা বোরা, শিক্ষার্থী

স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকসে পিএইচডির শিক্ষার্থী নেহার অন্য পরিচয়, তিনি একজন থিয়েটারশিল্পী।

নেহা বোরাকে নিয়ে ভারতের শিক্ষাবিষয়ক সংবাদ ও তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট এডুকেশনটাইমস ডটকমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেহা মূলত উত্তরাখন্ডের খাটিমার বাসিন্দা। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর দিল্লির বি আর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পারফরম্যান্স স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকসে থিয়েটার ও পারফরম্যান্স বিষয়ে পিএইচডির শিক্ষার্থী।

নেহা বোরার পরিবার হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সমর্থক। তাঁর বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়াকে তাঁর বাবা-মা ভালোভাবে নেননি।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লিতে টানা আন্দোলন করেন নেহা বোরা। ২ অক্টোবর ২০২৬।

টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বোরা বলেছিলেন, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পড়ার সময় থেকেই সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর সম্পৃক্ততা শুরু হয়। সে সময় তিনি সামাজিক বিষয় নিয়ে নির্মিত বিভিন্ন নাটকের পরিবেশনায় অংশ নিতেন।

নেহা এটিকে একটি ‘স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, থিয়েটার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো সম্পর্কে তাঁর বোঝাপড়া আরও বিস্তৃত করেছে। ২০১৯ সালে ভারতে নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কথাও তিনি স্মরণ করেন। ফলে তাঁর শিক্ষার বিষয় ও সক্রিয়তার পথ—দুটি তাঁর জীবনে পুরোপুরি আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে নয়, বরং পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে।

দিল্লি পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা সমাবেশের জন্য কোনো অনুমতি নেননি। পুলিশ নয়াদিল্লি জেলায় জমায়েতের ওপর বিধিনিষেধও জারি করেছিল এবং বিক্ষোভস্থলের চারপাশে ব্যারিকেড দিয়েছিল। আটক বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

নেহা বোরা ও এআইএসএ: কীভাবে তিনি ছাত্রনেতা হয়ে উঠলেন

২০২৬ সালের জুন–জুলাই মাসে যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে হওয়া ছাত্র বিক্ষোভের সময় ভারত এবং ভারতের বাইরে ধীরে ধীরে নেহার পরিচিতি বাড়তে থাকে। পরীক্ষা নিয়ে অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে চলা বৃহত্তর ওই আন্দোলনে যুক্ত ছাত্রনেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

যন্তর মন্তরে নেতা টানা ২৩ দিন অনশন করেছিলেন। এ সময়ে তাঁর প্রায় সাড়ে ৭ কেজি ওজন কমে যায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। পরে চিকিৎকেরা তাঁকে দ্রুত অনশন ভাঙার পরামর্শ দেন, নতুবা তাঁর প্রাণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অনশনের পুরো সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দারুণ সক্রিয় ছিলেন নেহা। সে সময় তিনি ইনস্টাগ্রামে একের পর এক পোস্ট করে গেছেন। ডার্ক হিউমার বা ব্যঙ্গাত্মক রসিকতার সেসব পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। একটি পোস্টে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমার মাথায় ক্ষুধার কথাই ঘুরছে, তাই ক্ষুধা নিয়ে কথা বলা যাক।’

খাবারের জন্য নেহা তাঁর ক্ষুধার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের ‘ক্ষমতার ক্ষুধার’ তুলনা করেছিলেন।

নেহা বলেছিলেন, তাঁর বাবা সেনা কর্মকর্তা এবং মা গৃহিণী। তাঁর পরিবার নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থক। তাঁর পরিবার তাঁর বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া ‘ভালোভাবে নেয়নি’।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা ২০ জুলাইয়ের পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল পুলিশি বাধার মুখে পড়ার পর মঞ্চ থেকে নেহা বলেছিলেন, ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর করা প্রতিটি আঘাত শেষ পর্যন্ত এই অহংকারী সরকারের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’

ছাত্র–জনতার আন্দোলনের মুখে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলেও নেহা সেটিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখেননি।

ইউটিউবে রাজ্যসভার সদস্য ও আইনজীবী কপিল সিবালের অনুষ্ঠান ‘দিল সে’তে এসে নেহা বলেন, ‘আরেকজন প্রধান এসে এই জায়গা নেবেন। এটা কোনো একজনের পদত্যাগের বিষয় নয়; এটা সরকারের ঔদ্ধত্যের বিষয়—এই দেশের সাধারণ মানুষকে বারবার ব্যর্থতার মুখে ঠেলে দেওয়া এমন একটি ব্যবস্থা আপনারা চালাতে পারেন না। বিজেপি বা আরএসএসের নেতাদের তোষামোদ করার পুরস্কার হিসেবে মন্ত্রিসভার কোনো পদ দেওয়া উচিত নয়।’

নেহা এর আগে এআইএসএ পরীক্ষা, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) এবং ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে বিভিন্ন প্রচার চালিয়েছেন। আগস্টে সংগঠনটি দেশজুড়ে ‘জেন-জি রাইজিং’ নামে একটি প্রচার শুরু করে।

এ সময় নেহা বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে শিক্ষার্থী ও তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। অনেকে এই উদ্যোগকে ‘রাহুল গান্ধীর কায়দা’ বলে অভিহিত করেন।

নয়াদিল্লিতে টানা বিক্ষোভের মধ্যে পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভাকারীকে আটক করে। ৪ অক্টোবর ২০২৬

রাঁচিতে নেহার ওপর কালি নিক্ষেপ: ঝাড়খন্ডের বিক্ষোভে কী ঘটেছিল

আগস্টে ঝাড়খন্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (জেপিএসসি) ও ঝাড়খন্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন (জেএসএসসি) আয়োজিত পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের বিরুদ্ধে হওয়া বিক্ষোভে অংশ নিতে রাঁচিতে গিয়ে আবারও খবরের শিরোনামে আসেন নেহা।

বিক্ষোভের সময় ৭ আগস্ট তাঁরা ঝাড়খন্ড বিধানসভার দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি নেহার মুখে কালি ছুড়ে মারেন। ঘটনার পর পুলিশ ওই ব্যক্তিকে আটক করে।

ওই ব্যক্তি সাংবাদিকদের বলেন, আগে নেহা জেএনইউর প্রাক্তন শিক্ষার্থী উমর খালিদের সমর্থনে কথা বলেছিলেন বলেই তিনি তাঁকে লক্ষ্য করে কালি ছুড়েছেন।

এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নেহা বলেন, তিনি গর্বের সঙ্গে এই কালি মেখে রাখবেন এবং বিক্ষোভকারীরা যেসব বিষয় তুলে ধরেছেন, সেসব নিয়ে কথা বলা অব্যাহত রাখবেন।

কালিমাখা নেহার ছবি অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

যন্তর মন্তরে নেহা বোরা আটক: কী ঘটেছে

নেহা আবারও খবরের শিরোনাম হন ২৫ সেপ্টেম্বর। সেদিন ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় যন্তর মন্তরের কাছে ৬০ জনের বেশি মানুষকে পুলিশ আটক করে, তাঁদের একজন নেহা।

এআইএসএর ডাকা ওই বিক্ষোভ থেকে সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর মতো প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারেরও পদত্যাগ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। বিক্ষোভকারীরা নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম এবং এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

দিল্লি পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা সমাবেশের জন্য কোনো অনুমতি নেননি। পুলিশ নয়াদিল্লি জেলায় জমায়েতের ওপর বিধিনিষেধও জারি করেছিল এবং বিক্ষোভস্থলের চারপাশে ব্যারিকেড দিয়েছিল। আটক বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

নেহা সংবাদমাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য নিয়েও কথা বলেছেন।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে অনশনের সময় বলিউড অভিনেত্রী শাবানা আজমি অনশনরত নেহা বোরাকে দেখতে আসেন

ভারতীয় সাংবাদিক বারখা দত্তকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেহা বলেছিলেন, তাঁর বাবা সেনা কর্মকর্তা এবং মা গৃহিণী। তাঁর পরিবার নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থক। তাঁর পরিবার তাঁর বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া ‘ভালোভাবে নেয়নি’।

রাজনৈতিক মতাদর্শে পার্থক্য থাকলেও নেহার অনশনের কথা জানতে পেরে তাঁর মা উত্তর প্রদেশের বেরেলিতে তাঁদের বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ছুটে গিয়েছিলেন। ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর তিনি মেয়েকে অভিনন্দনও জানান।