(বাঁ থেকে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভেন্দু অধিকারী, ব্রাত্য বসু, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ চক্রবর্তী ও শশী পাঁজা
(বাঁ থেকে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভেন্দু অধিকারী, ব্রাত্য বসু, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ চক্রবর্তী ও শশী পাঁজা

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের আলোচিত প্রার্থীরা কে কার কাছে হারলেন

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিদায়ী শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের মন্ত্রিসভার অনেক তারকা প্রার্থী হেরেছেন। তৃণমূল প্রধান ও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও হেরেছেন। তিনি হেরেছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর আসনে মুখোমুখি হয়েছিলেন। শুভেন্দু ১৫ হাজারের বেশি ভোটে জিতছেন। ভবানীপুর ছাড়া নন্দীগ্রাম আসনেও জিতেছেন বিজেপির এ নেতা।

মমতার পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও তারকা প্রার্থী ও মন্ত্রী পরাজিত হয়েছেন। আনন্দবাজার অনলাইনের তথ্যমতে তৃণমূলের কয়েকজন তারকা প্রার্থী বিজেপির কোন প্রার্থীর কাছে কত ভোটে হেরেছেন, তা তুলে ধরা হলো।

সুজিত বসু: বিধাননগর আসন থেকে নির্বাচন করা তৃণমূলের সুজিত বসুর দিকে নজর ছিল সবার। তৃণমূলের এ ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী ৩৭ হাজারের বেশি ভোটে হেরেছেন। মমতার বিদায়ী মন্ত্রিসভার সদস্য সুজিতের হার হয়েছে বিজেপির শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের কাছে।

চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য: রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে এ বারও দমদম উত্তর কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। তিনি বিজেপির সৌরভ সিকদারের কাছে ২৬ হাজারের বেশি ভোটে হেরেছেন। ২০১১ সালেই দমদম উত্তরের বিধায়ক হয়েছিলেন চন্দ্রিমা। ২০১৬ সালে ওই কেন্দ্রে সিপিএম প্রার্থী তন্ময় ভট্টাচার্যের কাছে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। তবে ২০১৭ সালের উপনির্বাচনে কাঁথি দক্ষিণ থেকে জিতেছিলেন তিনি। পরে ২০২১ সালের ভোটে আবার দমদম উত্তরে লড়েন এবং জেতেন।

সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়: তৃণমূলের তারকা প্রার্থী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির সজল ঘোষের কাছে হেরেছেন ১৬ হাজার ৯৫৬ ভোটে। ২০২৪ সালে উপনির্বাচনে জিতে বরাহনগরের বিধায়ক হয়েছিলেন অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাজ চক্রবর্তী: ব্যারাকপুর থেকে হেরে গেছেন তৃণমূলের আরেক তারকা প্রার্থী রাজ চক্রবর্তী। এ চলচ্চিত্র পরিচালক দ্বিতীয়বারের মতো ব্যারাকপুরের ভোটের মাঠে নেমেছিলেন। কিন্তু ১৫ হাজারের বেশি ভোটে তিনি বিজেপির কৌস্তুভ বাগচীর কাছে হেরে যান।

দেবাশিস কুমার: রাসবিহারী আসন থেকে তৃণমূলের প্রার্থী দেবাশিস কুমার বিজেপির ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী স্বপন দাশগুপ্তের কাছে প্রায় ২১ হাজার ভোটে হেরে গেছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ওই আসন থেকে তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে জিতেছিলেন তিনি। রাসবিহারী কেন্দ্র মানেই অভিজাত, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির বসতি।

অরূপ বিশ্বাস: তৃণমূলের ‘হেভিওয়েট’ নেতা অরূপ বিশ্বাস দাঁড়িয়েছিলেন টালিগঞ্জ আসন থেকে। বিজেপির পাপিয়া দে অধিকারীর কাছে তিনি ৬ হাজারের বেশি ভোটে হেরে গেছেন।

শশী পাঁজা: তৃণমূলের হয়ে এ বারও শ্যামপুকুর আসন থেকে দাঁড়িয়েছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা। তাঁর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ছিলেন বিজেপির পূর্ণিমা চক্রবর্তী। ১৪ হাজার ৬৩৩ ভোটে শশীকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন পূর্ণিমা। শশী পাঁজা সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রয়াত অজিত পাঁজার পুত্রবধূ।

রত্না চট্টোপাধ্যায়: বেহালা পশ্চিম আসন থেকে এবার তৃণমূলের হয়ে নির্বাচন করেছিলেন রত্না চট্টোপাধ্যায়। ২৪ হাজার ৬৯৯ ভোটে তিনি বিজেপির ইন্দ্রনীল খাঁ’র কাছে হেরেছেন। এর আগে ২০২১ সালে ওই আসন থেকে তৃণমূলের টিকিটে বিধায়ক হয়েছিলেন রত্না।

অতীন ঘোষ: কাশীপুর-বেলগাছিয়া আসন থেকে তৃণমূল বিধায়ক অতীন ঘোষকে এবারও প্রার্থী করেছিলেন। বিজেপির প্রার্থী রিতেশ তিওয়ারির কাছে তিনি ১ হাজার ৬৫১ ভোটে হেরেছেন।

শ্রেয়া পাণ্ডে: মানিকতলায় তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন প্রয়াত সাধন পাণ্ডের কন্যা শ্রেয়া পাণ্ডে। বিজেপির প্রবীণ নেতা তাপস রায়ের কাছে তিনি ১৫ হাজার ৬৪৪ ভোটে হেরেছেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মানিকতলার বিধায়ক সাধন পাণ্ডে মারা যান। পরে ওই আসনের উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী হিসাবে জয়ী হন তাঁর স্ত্রী সুপ্তি। এ বারের নির্বাচনে কন্যা শ্রেয়াকে প্রার্থী করে তৃণমূল।

ব্রাত্য বসু: দমদমেও তৃণমূলের নক্ষত্রপতন হয়েছে। এই আসনে তৃণমূলের তারকা প্রার্থী ব্রাত্য বসু বিজেপির অরিজিৎ বক্সীর কাছে ২৫ হাজার ২৭৩ ভোটে হেরে গেছেন। তবে ব্রাত্য বসু তুলনামূলক ভাবে সহজ জিতবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল।

পরেশচন্দ্র অধিকারী: কোচবিহারের মেখলিগঞ্জে তৃণমূলের শক্তিশালী প্রার্থী পরেশচন্দ্র অধিকারী বিজেপির দধিরাম রায়ের কাছে ২৯ হাজার ৫৮৪ ভোটে হেরেছেন। পরেশচন্দ্রের জন্য এবারের লড়াই সহজ ছিল না। রাজ্যের স্কুলে শিক্ষক বা এসএসসি নিয়োগ মামলায় দুর্নীতিতে নাম জড়িয়েছিল তাঁর কন্যা অঙ্কিতা অধিকারীর। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তাঁর চাকরিও গিয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, পরেশচন্দ্রের ভোটের ফলাফলে এ ঘটনা প্রভাব রেখেছে।

উদয়ন গুহ: দিনহাটা থেকে তৃণমূলের তিন বারের বিধায়ক উদয়ন গুহও হেরে গেছেন। কোচবিহারের দিনহাটায় বিজেপি প্রার্থী অজয় রায়ের কাছে তিনি ১৭ হাজার ৪৪৭ ভোটে হেরে যান।

স্বপ্না বর্মণ: রাজগঞ্জে তৃণমূল টিকিট দিয়েছিল সোনাজয়ী সাবেক অ্যাথলেট স্বপ্না বর্মণকে। বিজেপির দীনেশ সরকারের কাছে তিনি ২১ হাজার ৪৭৭ ভোটে হেরেছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে জলপাইগুড়ির এই আসনে জিতেছিল তৃণমূল। তখন তৃণমূলের টিকিটে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন খগেশ্বর রায়। এ বার তাঁর জায়গায় এই আসনে স্বপ্নাকে দাঁড় করিয়েছিল তৃণমূল।

গৌতম দেব: শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব তৃণমূলের টিকিটে শিলিগুড়ি আসন থেকে বিধানসভা নির্বাচনে নেমেছিলেন। কিন্তু বিজেপির ‘ভরসার মুখ’ শঙ্কর ঘোষের কাছে তিনি ৭৩ হাজার ১৯২ ভোটে হেরে গেছেন। তবে গত বিধানসভা নির্বাচনেও ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি আসনে বিজেপির প্রার্থী শিখা চট্টোপাধ্যায়ের কাছে হেরে গিয়েছিলেন গৌতম।

অর্পিতা ঘোষ:  দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট আসন থেকে এবার তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন নাট্যকর্মী ও সাবেক সাংসদ অর্পিতা ঘোষ। বিজেপির বিদ্যুৎকুমার রায়ের কাছে তিনি ৪৭ হাজার ৫৭৬ ভোটে হেরেছেন।

পশ্চিমবঙ্গে এবার ২ দফায় বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিল ভোট হয় ১৫২ আসনে। ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ভোট হয় ১৪২টি আসনে।

গতকাল সোমবার সকাল থেকে ভোট গণনা শুরু হয়। ভোট গণনার ফলাফলের যে ধারা, সন্ধ্যা পর্যন্ত যা বিচ্যুতিহীন, তাতে স্পষ্ট, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসছে বিজেপি।

আজ রাত একটায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় পশ্চিমবঙ্গের মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩ (একটি আসনে ভোট গ্রহণ নতুন করে হবে) আসনের ফলাফলে বিজেপি ২০৬টিতে হয় জয়ী ঘোষিত, নয়তো এগিয়ে রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের এমন আসনসংখ্যা ৮০-এর আশপাশে ঘোরাফেরা করছে।

পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় তৃণমূল। ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বাম ফ্রন্টকে হারিয়ে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসে মমতার দল তৃণমূল। এবার সেখানে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিজেপি।