দিল্লির হাউজ রানি এলাকায় একটি পাঁচতলা হোটেল ভবন অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়
দিল্লির হাউজ রানি এলাকায় একটি পাঁচতলা হোটেল ভবন অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়

দিল্লির হোটেলে আগুনে বিপদগ্রস্ত মানুষকে উদ্ধার করেন ওয়াসিম–আফজালরা

ভারতের দিল্লির হাউজ রানি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের শিকার হওয়া পাঁচতলা হোটেল ভবনটিতে আগুন লাগার পরপরই সেটি ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল। সেদিন ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে ছুটে গিয়েছিলেন।

গত বুধবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিটের দিকে হোটেল ভবনটিতে আগুন লাগে এবং তা দ্রুত ভবনের তিনটি তলায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে অনেক অতিথি ঘন ধোঁয়ার মধ্যে ভেতরে আটকে পড়েন। ভবনটিতে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ মাত্র একটি ছিল এবং কোনো জরুরি সিঁড়ি ছিল না।

৬১ বছর বয়সী রিয়াজউদ্দিন ভবনের বিপরীত দিকে থাকা ফুটপাতে একটি দোকান চালান। রিয়াজউদ্দিন বলেন, আগুন লাগার পর তিনি দ্রুত তাঁর দোকান থেকে ম্যাট্রেস বের করে ভবনের জানালার নিচে বিছিয়ে দিয়েছিলেন, যেন মানুষেরা লাফিয়ে পড়লেও আঘাত কম পায়।

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আটকে পড়া বাসিন্দারা জীবন বাঁচাতে জানালা দিয়ে লাফ দিতে শুরু করেন। তবে অনেক কক্ষে জানালাও ছিল না। আবার কিছু জানালা বন্ধ বা আটকে ছিল, যা ভাঙাও সম্ভব ছিল না।

রিয়াজউদ্দিন বলেন, ‘আমি প্রায় ১৫টি ম্যাট্রেস বিছিয়ে দিয়েছিলাম। এক ব্যক্তি দ্বিতীয় তলা থেকে পড়ে গেলে তাঁর পা ভেঙে যায়। পুরো পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত আতঙ্কজনক।’

পরে মোহাম্মদ ইসরার খান নামের আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দাও জানালা দিয়ে মানুষদের বের করতে সাহায্য করেন। ৪০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি সকাল প্রায় ৮টা ৪০ মিনিটে তাঁর ভাইয়ের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। এরপর ইসরার এবং তাঁর সঙ্গে থাকা ওয়াসিম, আমির, শাহরুখ, আফজাল, হাজি ও আনিস মিলে আহত ও আটকে পড়া মানুষদের টেনে বের করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেন।

ওই এলাকায় ম্যাক্স হাসপাতালের অবস্থান হওয়ায় সেখানে চিকিৎসার জন্য আসা রোগী ও তাঁদের পরিবারের লোকজন আশপাশের হোটেলগুলোতে থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, অগ্নিকাণ্ডের শিকার হোটেলটির বেশির ভাগ অতিথি ছিলেন চিকিৎসা ভিসায় আসা বিদেশি নাগরিক।

মোহাম্মদ ইসরার খান বলেন, ‘আমরা যখন পুলিশ ও উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে ভবনের ভেতরে ঢুকি, তখন কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। শুধু ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিল, আর প্রতিটি তলা থেকে চিৎকার ও কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল।’

ইসরার আরও বলেন, ‘অনেকেই বেসমেন্টে আটকে ছিল। কিছু মৃতদেহ তখনো পুড়ছিল, কিন্তু আমরা খালি হাতেই উদ্ধারকাজ করি। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি মুহূর্তই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

উদ্ধারকাজ চালানোর সময় ইসরার কয়েকবার বমি করে ফেলেছিলেন। তাঁর মতে, এটা ছিল ভয়াবহ দৃশ্য। তাঁরা যাঁদের বের করে আনতে পেরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় পাঁচজন আগেই মারা গিয়েছিলেন।

ইসরার আরও বলেন, ‘উদ্ধারকাজের সময় এক ভুক্তভোগীর ফোন বেজে ওঠে। ফোনে তাঁর মা তাঁর সন্তানের খবর জানতে চাইছিলেন। আমি কিছুই বলতে পারিনি। ফোনটি পুলিশের হাতে দিয়ে দিই। আমি খারাপ খবরের বাহক হতে চাইনি।’

উদ্ধারকারীরা বলেছেন, ভবনটির প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ একটিই ছিল। ভবনটিতে সহজে ব্যবহারযোগ্য জানালার অভাব থাকায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। ধোঁয়ার কারণে কিছু স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশ সদস্যও অচেতন হয়ে পড়েছিলেন।

উদ্ধারকারীরা বলেছেন, ভবনটির প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ একটিই ছিল

স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াসিম রাজা বলেন, তিনি একটি শৌচাগারের ভেতরে দুই নারীকে অচেতন অবস্থায় পান। আগুন থেকে বাঁচতে তাঁরা শৌচাগারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি একাই তাঁদের ম্যাট্রেসে করে বাইরে নিয়ে আসি। সেখানে থাকা বেশির ভাগ মানুষই আগে থেকেই দুর্বল ছিলেন এবং চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে এসেছিলেন।’

ওই সরু গলিতে ২৭ বছরের বেশি সময় ধরে ওষুধের দোকান পরিচালনাকারী এক ব্যক্তি বলেন, ‘এক মা ও তার সন্তান গতকাল আমার কাছ থেকে ওষুধ কিনেছিল। আজ তাদের আগ্রা যাওয়ার কথা ছিল। তারা বেঁচে আছে কি না, আমি জানি না।’

আগুন নিভে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছিল। সরু গলিগুলোতে পাশাপাশি অনেক বহুতল হোটেল রয়েছে। এসব ভবনের অনেকগুলোরই শুধু একটি সিঁড়ি। অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামেরও অভাব রয়েছে সেখানে।

আশপাশের হোটেল ও লজে থাকা অনেক অতিথিকে তাদের লাগেজ নিয়ে বের হয়ে যেতে দেখা যায়। একই ধরনের ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন ছিলেন।

লক্ষ্ণৌ থেকে আসা এক ব্যক্তি বলেন, আগুন লাগার খবর শুনে তিনি দ্রুত উড়োজাহাজে করে দিল্লিতে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা এখানে চিকিৎসার জন্য আছেন এবং কথা বলতে পারেন না। আমার কাল আসার কথা ছিল, কিন্তু খবর শুনেই আমি প্রথম ফ্লাইটে চলে আসি। কারণ, হোটেলের নাম শুনে মনে হচ্ছিল, এটা সে একই জায়গা, যেখানে আমার বাবা আছেন।’