ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি সড়কে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির ছবিসংবলিত ব্যানারের পাশ দিয়ে হাঁটছেন এক নারী। ১৩ আগস্ট ২০২৬
ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি সড়কে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির ছবিসংবলিত ব্যানারের পাশ দিয়ে হাঁটছেন এক নারী। ১৩ আগস্ট ২০২৬

হামলায় মুখ ‘বিকৃত’, ছয় মাস লোকচক্ষুর আড়ালে—ইরানের সর্বোচ্চ নেতা কি সত্যিই ক্ষমতায়

যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পরও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি, তাঁর কণ্ঠও শোনা যায়নি। যুদ্ধের শুরুর দিনই মার্কিন–ইসরায়েলি বিমান হামলায় গুরুতর আহত হয়ে পরে দায়িত্ব নেওয়া খামেনি এখনো পুরোপুরি অন্তরালে। ফলে ইরানের নেতৃত্বের কেন্দ্রেই একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নও ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যকে অগ্নিগর্ভ করে তোলা এই যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুখে ইরান। একই সময়ে দেশটির আগে থেকেই নাজুক অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের কর্মকর্তারা ও দেশটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সূত্র বলছেন, খামেনি এখনো ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে তিনি আড়াল থেকেই দেশ পরিচালনা করছেন। গুরুতর আঘাতে তাঁর চেহারায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দৈনন্দিন প্রশাসনের বড় একটি অংশ পরিচালনার ভার তিনি শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তার হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।

যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মোজতবার কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও বার্তা প্রকাশিত হয়নি। এতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে তাঁর অবস্থান নিয়ে ইরানিদের মধ্যে সংশয় বাড়ছে। ইরানের শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার বক্তব্যকে চূড়ান্ত বলে মনে করা হয়।

তবে যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মোজতবার কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও বার্তা প্রকাশিত হয়নি। এতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে তাঁর অবস্থান নিয়ে ইরানিদের মধ্যে সংশয় বাড়ছে। ইরানের শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার বক্তব্যকে চূড়ান্ত বলে মনে করা হয়।

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, ‘প্রশ্নটি এখন আর মোজতবা বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, ইরানের একজন কার্যকর সর্বোচ্চ নেতা এখনো আছেন কি না, সেটিই।’

ইরানের জনগণের উদ্দেশে খামেনির একমাত্র বার্তা এসেছে কয়েকটি লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে। সংবাদ বুলেটিনে সেগুলো পড়ে শোনানো হয়েছে। এমনকি গত মাসে তাঁর বাবার জন্য আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী শোক ও দাফন অনুষ্ঠানেও তাঁকে দেখা যায়নি।

শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ও সরকারের ভেতরের কয়েকজন ব্যক্তি বলছেন, হত্যাচেষ্টার আশঙ্কার কারণেই খামেনি জনসমক্ষে আসছেন না। তাঁদের দাবি, তিনি নিয়মিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিবেদন পাচ্ছেন এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তিনিই নিচ্ছেন।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১০ আগস্ট বলেন, তিনি খামেনির সঙ্গে সাত ঘণ্টা বৈঠক করেছেন।

প্রশ্নটি এখন আর মোজতবা বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, ইরানের একজন কার্যকর সর্বোচ্চ নেতা এখনো আছেন কি না, সেটিই।
অ্যালেক্স ভাতানকা, ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক

তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির অনেকের মধ্যেই এখন সংশয় দেখা দিচ্ছে।

ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ধর্মীয় শিক্ষার শহর কোমের বাসিজ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর এক সদস্য বলেন, ‘আমাদের নেতার কণ্ঠ শুনতে হবে, অথবা এমন কোনো চিহ্ন দেখতে হবে, যাতে বোঝা যায়, তিনি দেশের সর্বোচ্চ নেতার আসনে আছেন এবং দেশ পরিচালনা করছেন। এতে আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে।’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি হাতে মিছিল

সংবেদনশীল এ বিষয়ে কথা বলার জন্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বাসিজ সদস্য বলেন, খামেনিই এখনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তবে তাঁর একটি ছবিও প্রকাশিত না হওয়ায় মানুষের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি ইরানের স্বার্থেরও পরিপন্থী।

যুদ্ধ শুরুর আগেও খামেনি তাঁর বাবার প্রধান সহযোগী হিসেবে আড়ালেই থাকতে পছন্দ করতেন। জনসমক্ষে আসা এড়িয়ে চলতেন। ২৮ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। তেহরানের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় মোজতবা খামেনির মুখে গুরুতর আঘাত লাগে এবং তাঁর চেহারা বিকৃত হয়ে যায়।

ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের বিরোধী কিংবা ব্যাপক সংস্কারের পক্ষে থাকা ইরানিদের বক্তব্য আরও সরাসরি। তেহরানের সংস্কারপন্থী ব্যবসায়ী শাহরোখ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘মোজতবা নিহত হননি—আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব?’ তিনিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।

পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে শাহরোখ বলেন, ‘তিনি যে বেঁচে আছেন, তার একটিও প্রমাণ নেই। এ অবস্থায় তিনি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছেন, সেটি বিশ্বাস করা মোটেও যৌক্তিক নয়।’

ক্ষমতার কাঠামোয় বিপ্লবী বাহিনীই গুরুত্বপূর্ণ

ছয় মাস ধরে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের সঙ্গে যুদ্ধে টিকে আছে ইরান। তবে দেশটি এ যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি করার ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা এখনো ইরানের সামরিক বাহিনীর রয়েছে।

ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের কাঠামোও ভেঙে পড়েনি। একজন সর্বোচ্চ নেতা (আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি) ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের হারিয়েও তা টিকে থাকতে পেরেছে। ধর্মতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতি অনুগত রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাও বজায় রয়েছে।

তবে যুদ্ধের ব্যয় ও কয়েক মাস ধরে তেল রপ্তানিতে অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি বড় চাপের মুখে। দেশটির মুদ্রা রিয়ালের দর ভয়াবহভাবে পড়ে গেছে। এতে জানুয়ারিতে কর্তৃপক্ষের হাতে দমন হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ওই বিক্ষোভে শত শত বিক্ষোভকারী নিহত হন।

এদিকে ক্ষমতাসীনরা এখন একটি স্পষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে নিজেদের পুনর্গঠন করছে—রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা, প্রতিপক্ষকে ঠেকানোর সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি যাতে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করা।

সূত্রগুলো বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে থাকা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রভাব ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেড়েছে। পুনর্গঠিত ক্ষমতার কাঠামোর শীর্ষে থাকা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলকেন্দ্রিক কৌশলগত সিদ্ধান্তেও আইআরজিসি এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

নেতৃত্বের এ শীর্ষ পর্যায়ে আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডারদের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মতো জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছেন।

ইরানে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছেন, খামেনি প্রকৃতপক্ষে এসব শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক করছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি পুরোপুরি যুক্ত রয়েছেন এবং বড় সব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তাঁরই।

তাঁর (মোজতবা) এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। এর ফলে এখন ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী সব উপদলই দাবি করতে পারে যে নেতার আসল ইচ্ছা কী, তা শুধু তারাই জানে।
অ্যালেক্স ভাতানকা, মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অল্প কয়েকজন কর্মকর্তা সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তাঁর কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। কারণ, এমন তথ্য ফাঁস হলে যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

খামেনির ঘনিষ্ঠ মহলের এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তাঁর শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, খামেনি এখনো তীক্ষ্ণভাবে বিষয়গুলো বুঝতে পারছেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত আছেন।

দ্বিতীয় এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সব চাপ সত্ত্বেও জনগণকে দেওয়া সেবা বন্ধ হয়নি। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান একক এবং আমাদের সিদ্ধান্তগুলো সুসংগত। এসবই দেখায়, সর্বোচ্চ নেতা দায়িত্বে আছেন।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন মোজতবা খামেনি

যুদ্ধ শুরুর আগেও খামেনি তাঁর বাবার প্রধান সহযোগী হিসেবে আড়ালেই থাকতে পছন্দ করতেন। জনসমক্ষে আসা এড়িয়ে চলতেন। ২৮ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। ওই হামলায় তাঁর বাবা নিহত হন। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় মোজতবা খামেনির মুখে গুরুতর আঘাত লাগে এবং তাঁর চেহারা বিকৃত হয়ে যায়।

কিন্তু এখন মোজতবা এমন একটি দায়িত্বে অধিষ্ঠিত, যা ‘ঐশ্বরিক নির্দেশনার প্রতীক’ হিসেবে গণ্য করা হয়। আবার ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর দেশের সবচেয়ে বড় সংকটের মুহূর্তও এটি। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর আড়ালে থাকার বিষয়টি আর বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, ‘ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রকৃত কোনো সমঝোতায় যেতে হলে মোজতবার স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।’

এই গবেষক আরও বলেন, ‘তাঁর (মোজতবা) এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। এর ফলে এখন ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী সব উপদলই দাবি করতে পারে যে নেতার আসল ইচ্ছা কী, তা শুধু তারাই জানে।’