
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা থমকে আছে। ঠিক একই সময়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে সামরিক–বেসামরিক জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলাও হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে প্রায় এক মাস ধরে চলা নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নতুন এ উত্তেজনার শুরু গত সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর। এই অভিযানের লক্ষ্য হলো—কার্যত বন্ধ থাকা প্রণালিটিতে আটকে পড়া বেসামরিক জাহাজগুলোকে মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় বের করে আনা। যদিও হরমুজে প্রবেশ করলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছে ইরান।
হুমকি ও পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেও হরমুজ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি পণ্যবাহী জাহাজ পাড়ি দিয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন বাহিনী। প্রণালিটির দক্ষিণাঞ্চলে একটি নিরাপদ এলাকা গড়ে তোলার কথাও জানিয়েছে তারা। তবে হরমুজ দিয়ে মার্কিন জাহাজ পাড়ি দেওয়ার তথ্য নাকচ করে দিয়েছে ইরান। উল্টো তাদের দাবি, ইরানের হামলার মুখে মার্কিন একটি যুদ্ধজাহাজ হরমুজ থেকে পিছু হটেছে।
পাল্টাপাল্টি এমন দাবির মধ্যে আবার যুদ্ধে নিজেদের সফলতার কথা বলেছেন ট্রাম্প। প্রজেক্ট ফ্রিডম শুরুর আগে ১৩ এপ্রিল থেকে ইরান বন্দরে যুক্তরাষ্ট্র যে অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে, তা ‘অসাধারণ’ অভিহিত করে গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। মার্কিন অবরোধ ইস্পাতের মতো। কেউ একে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রেখেছে ইরান। এই যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের দর–কষাকষির বড় একটি হাতিয়ার এই প্রণালি। সমুদ্রনিরাপত্তা বিশ্লেষক আলেকজান্দ্রু হুদিস্তিয়ানু বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ দিয়ে মার্কিন বাহিনী যতটা জাহাজ বের করতে পারবে, শান্তি আলোচনায় ইরানের দর–কষাকষির ক্ষমতা ততই কমবে।
হরমুজ নিয়ে চলমান উত্তেজনা আবার যুদ্ধে গড়াবে কি না, সে বিষয়ে বিশ্লেষকেরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন না। তবে সূত্রের বরাতে একটি শঙ্কার খবর দিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। তারা বলেছে, ইরানে নতুন করে হামলার জন্য নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইসরায়েলের সেনাপ্রধান এয়াল জামিরও গতকাল বলেছেন, তাঁর দেশের ক্ষতির চেষ্টা করা হলে শক্ত জবাব দেওয়া হবে।
প্রজেক্ট ফ্রিডম শুরুর পরপরই মার্কিন একটি যুদ্ধজাহাজে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছিল ইসরায়েল। এ ছাড়া সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফুজেইরাহ বন্দরে হামলার পর আগুন ধরে যায়। ওই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হচ্ছে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেহরান। আরব আমিরাত জানিয়েছে, গতকালও তারা ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।
সোমবার হরমুজে কয়েকটি বেসামরিক জাহাজেও হামলা হয়েছে। এর মধ্যে ‘এইচএমএম নামু’ নামে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি জাহাজ রয়েছে। এর বিপরীতে প্রজেক্ট ফ্রিডমের আওতায় ইরানি বাহিনীর ছয়টি নৌযান ধ্বংসের দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে তেহরানের ভাষ্য, মার্কিন বাহিনী ইরানের দুটি বাণিজ্যিক নৌযানে হামলা চালিয়েছে। এতে পাঁচজন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
পাল্টাপাল্টি এ হামলার মধ্যে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে দায়ার বন্দরে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে আগুন ধরে যায় বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘মেহর নিউজ’। তবে কীভাবে আগুন লেগেছে, তা উল্লেখ করা হয়নি। ইরানের বন্দরের অগ্নিনির্বাপণ দপ্তরের প্রধান মাজিদ ওমরানি মেহর নিউজকে বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করছেন।
হরমুজ ঘিরে বর্তমানে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির ভাষ্যও একই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, হরমুজের পরিস্থিতি একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, তা হলো রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সামরিকভাবে হতে পারে না।
তবে ট্রাম্প যেন হাঁটছেন উল্টো পথে। গতকাল হোয়াইট হাউসে শুধু ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধের প্রশংসাই করেননি, একই সঙ্গে এ–ও বলেছেন, ইরানকে ‘খুবই বাজেভাবে’ পরাজিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের সব জাহাজ সাগরে তলিয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘তারা (ইরান) একটি চুক্তি করতে চায়। যখন সামরিক বাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, তখন কে না এটা চাইবে।’
এদিকে নতুন করে হুমকি দিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হলে ইরানকে ভয়াবহ আক্রমণের মুখে পড়তে হবে। তিনি এ–ও বলেন, তাঁরা ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষ চান না। চলমান যুদ্ধবিরতিও শেষ হয়ে যায়নি। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান ড্যান কেইন বলেন, ইরানে আবার যুদ্ধ শুরু করাটা ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
তবে ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ ও প্রজেক্ট ফ্রিডমের মাধ্যমে ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে বলে উল্লেখ করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। এক্সে তিনি লিখেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অসহনীয় হয়ে পড়েছে। ‘অথচ আমরা এখনো ব্যবস্থা নেওয়া শুরুই করিনি।’
যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম বৈঠক হয়েছিল ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে। ওই আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। এর পর থেকে চেষ্টা করেও দুই পক্ষকে আর সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসাতে পারেনি পাকিস্তানসহ মধ্যস্থতাকারী বিভিন্ন দেশ। যদিও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পর্দার আড়ালে দুই দেশের আলোচনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
আড়ালের এই আলোচনার অংশ হিসেবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে ১৪ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল ইরান। এই প্রস্তাব নিয়ে ট্রাম্প অসন্তোষ জানালেও সেটি পর্যালোচনার পর তেহরানের কাছে জবাব পাঠায় হোয়াইট হাউস। ওই জবাব পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইরান। এ নিয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। এমনভাবে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যেন দুই পক্ষই মনে করে, তারা জিতেছে।
এই আলোচনা থেকে সফলতা আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরাও। তবে পরমাণু কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখনো বিস্তর ফারাক রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়–সংক্রান্ত সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক কিমিট। আর যুক্তরাষ্ট্র ‘এপিক ফিউরি’ নামে ইরানে অভিযান শুরুর পর কেন তা পরিবর্তন করে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ রাখল, তারও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি।
মার্ক কিমিট বলেন, এই নাম পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশল। আক্রমণাত্মক এপিক ফিউরি অভিযানে ইসরায়েল ছাড়া মিত্র কোনো দেশ যোগ দেয়নি। তাই আক্রমণাত্মক লক্ষ্য থেকে দূরে সরে ওয়াশিংটন নিজেদের অভিযানকে মানবিক হিসেবে তুলে ধরতে চাচ্ছে। হরমুজ খুলতে চাচ্ছে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরান যুদ্ধ নিয়ে তাদের প্রতি মিত্রদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বদল আনা।