
দক্ষিণ লেবাননে এক ইসরায়েলি সেনার বড় হাতুড়ি দিয়ে যিশুখ্রিষ্টের ক্রুশবিদ্ধ একটি মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনা ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলের জন্য উপেক্ষা করা কঠিন ছিল।
কারণ, দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদেরকে খ্রিষ্টানদের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী খ্রিষ্টান–জায়নবাদী আন্দোলনের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণ লেবাননে মোতায়েন ইসরায়েলি সেনাদের একটি ভিডিও এবং ছবি অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, এক ইসরায়েলি সেনা বড় আকারের একটি ভারী হাতুড়ি দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তির মাথায় আঘাত করছে। মূর্তিটি ক্রুশ থেকে খুলে পড়ে গেছে।
ঘটনাটি দক্ষিণ লেবাননের দেবল গ্রামের। ওই ভিডিও ও ছবি নিয়ে অনলাইনে তীব্র সমালোচনা হয়। অনেকে এ ঘটনার নিন্দা জানান। ইসরায়েলের সমর্থকদের একাংশও ওই সেনার কর্মকাণ্ডের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
তবে যিশুখ্রিষ্টের মূর্তি অবমাননার ভিডিও প্রকাশের আগে থেকেই ইসরায়েল তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোয় বসবাস করা খ্রিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের সমর্থন হারাতে শুরু করেছে; বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর ‘জাতিগত নিধনমূলক যুদ্ধ’ এবং লেবানন ও ইরানে হামলার কারণে।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার একদিন পর গত সোমবার নিজের নিয়মিত বক্তব্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। অবশ্য সমালোচকেরা উল্লেখ করেন, নেতানিয়াহু সরকার প্রায়ই এ বক্তব্যের বিপরীত কাজ করে।
গত মঙ্গলবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানায়, তদন্ত শেষে তারা ওই সেনার এ কাণ্ডের প্রমাণ পেয়েছে এবং তাঁকে শাস্তি হিসেবে ৩০ দিনের সামরিক আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে যে সেনা ওই ভিডিও ধারণ করেছেন এবং অন্য যে ছয় সেনা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের সবাইকে আলাদা আলাদা সাজা দেওয়া হয়েছে বলে গতকাল বুধবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি।
চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র কনসালটিং ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, যিশুর মূর্তিতে হামলার ঘটনায় ইসরায়েলি সরকারের জন্য দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া দেখান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে ওই সব খ্রিষ্টান কর্মকর্তাদের জন্য, যাঁরা ইসরায়েলকে সমর্থন করেন। এই দলে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও অন্তর্ভুক্ত।
যিশুরমূর্তি ভাঙচুরের ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাদের সাজা দেওয়ার এই বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে দেশটির সামরিক বাহিনী তা নিয়ে তদন্ত করলেও সাধারণত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয় না।
বাস্তবে গত এক দশকে ফিলিস্তিনিদের হত্যার অভিযোগে কোনো ইসরায়েলি সেনার বিরুদ্ধে এমনকি কোনো অভিযোগ পর্যন্ত দায়ের করা হয়নি। যদিও গাজা যুদ্ধের বাইরেও বহু ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে অধিকৃত পশ্চিম তীরে আল–জাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত। শিরিন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ছিলেন।
চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র কনসালটিং ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, যিশুর মূর্তিতে হামলার ঘটনায় ইসরায়েলি সরকারের জন্য দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া দেখান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওই সব খ্রিষ্টান কর্মকর্তাদের জন্য, যাঁরা ইসরায়েলকে সমর্থন করেন। এই দলে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও রয়েছেন।
এই সমর্থকেরা প্রায়ই ইসরায়েলের প্রতি তাঁদের সমর্থনের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে বাইবেলের ‘খ্রিষ্টান জায়নবাদী’ ব্যাখ্যার কথা বলেন। তাঁরা জোর দিয়ে ‘জুদাই-খ্রিষ্টান’ মূল্যবোধ এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথাও বলেন।
হয়তো তাদের খুশি করতেই ইসরায়েল সরকার যিশুর মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনায় প্রকাশ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তাঁদের এই পদক্ষেপ অন্য অনেক ক্ষেত্রে ইসরায়েলের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করার বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
মেকেলবার্গ বলেন, ‘এই ঘটনা (যিশুর মূর্তিতে হামলা), ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের মসজিদে হামলা এবং ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা—সবই যুদ্ধাপরাধ। সমস্যা হলো, এসব ঘটনা কতটা ব্যাপকভাবে ঘটছে, তা আমরা জানি না। আমরা শুধু এই ঘটনাটাই জানি; কারণ, এটি ভিডিও করা হয়েছিল।’