পতাকা হাতে দুই হুতি যোদ্ধা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
পতাকা হাতে দুই হুতি যোদ্ধা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

হুতি–সৌদির সংঘাতে ট্রাম্প কি নতুন বিপদে পড়ছেন

ইরান-সমর্থিত হুতিরা কয়েক দিন ধরে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। গত শুক্রবার হুতিরা লোহিত সাগরে পুরো ইয়েমেন উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে। তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখার দখলও নেয়।

ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী বাব আল-মানদেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবিও করেছে এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু করার পর তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ববাজারে সরবরাহকৃত তেলের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর এর বিকল্প বাণিজ্যিক পথ হিসেবে সামনে চলে আসে বাব আল-মানদেব। বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য ইরান যুদ্ধের মধ্যে নিজেদের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হলে তেহরানের পক্ষে আবারও হুতিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে হুতিদের হামলা বেড়েছে। সংকীর্ণ এই প্রণালি সমুদ্রপথে, বিশেষ করে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে মহাগুরুত্বপূর্ণ। আরব সাগর থেকে এডেন উপসাগর দিয়ে লোহিত সাগরে প্রবেশ করতে হলে সরু এই প্রণালিই একমাত্র পথ।

লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। ইরানের সমর্থনে হুতিরা সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজ ও ট্যাংকারে হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে কাবু করতে ইরানও হরমুজ প্রণালির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশ্চিম দিকে হুতিদের অব্যাহত হামলার বিষয়টি ওয়াশিংটন হয়তো আর উপেক্ষা করতে পারবে না। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের দ্বিতীয় অস্থিতিশীল ফ্রন্টটি বন্ধ করতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আরও বিস্তৃত একটি জোটের প্রয়োজন হতে পারে।

হুতিরা সৌদি আরবে হামলা করছে কেন

হুতি বিদ্রোহীরা সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন চালিয়ে আসছে। ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে। লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে তারা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানির বাজার বারবার উল্টেপাল্টে দিয়েছে।

‘হুতিরা মনে করছে, এটাই সেই সময়, যখন তারা নিজেদের দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে এবং সৌদি আরবের কাছ থেকে তাদের (হুতি) আগের দাবিদাওয়ার চেয়ে আরও বেশি সুবিধাজনক শর্ত আদায় এবং প্রতিপক্ষকে সেটা মেনে নিতে বাধ্য করতে পারবে।’

ইয়েমেনে হুতিদের বড় ধরনের উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। সে বছর তারা রাজধানী সানা দখল করে। এর জেরে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয়, যার জেরে ইয়েমেনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়। ইয়েমেনে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গাজায় হামাসের সমর্থনে বাব আল-মানদেবে চলাচল করা জাহাজে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গোষ্ঠীটি আবার আলোচনায় আসে।

জাহাজ–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পেতে রেখে বাব আল-মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলকেও তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।

প্রথম আলো গ্রাফিকস

২০২৫ সালে লোহিত সাগর যুক্তরাষ্ট্র ও হুতিদের মধ্যে একটা উত্তেজনাকর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষশক্তি’র অংশ হিসেবে সেবার হুতিরা আন্তর্জাতিক জাহাজে তাদের হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছিল।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় হুতিদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ নামে বড় সামরিক অভিযান শুরু করেন। এতে খরচ হয় প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিতে হুতিদের বিষয়টির কোনো সমাধান হয়নি। ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই ওয়াশিংটন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনের বিষয়টি আলোচনায় তুলতে চাপ দিয়ে আসছিল।

এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, ড্রোন ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয় ও আধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহারের পরও এ অভিযান কৌশলগত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। হুতিদের সামরিক সক্ষমতার ওপর এ অভিযানের তেমন কোনো প্রভাবই পড়েনি। অভিযানে ইয়েমেনে আট শতাধিক স্থানে হামলা চালানো হয়েছিল।

ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ও ইরানের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে হুতিরা যে সে সময়ে শুধু টিকে ছিল, তা নয়; বরং বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজের ওপর হামলা আরও বাড়িয়ে দেয়। হুতিদের এ আক্রমণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্যের ওপর বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। হুতিরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। এমনকি মার্কিন যুদ্ধজাহাজও বারবার হুতিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

এই হামলাগুলো নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান বৃহত্তর সংঘাতেরই অংশ।
লিন্ডসে নিউম্যান, চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো

যুক্তরাষ্ট্র ওই অভিযান শুরুর দুই মাসের মাথায় ওই বছরের ৬ মে ট্রাম্প অপ্রত্যাশিতভাবে ইসরায়েলকে এড়িয়ে হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেন। ওই এলাকা শান্ত হয়ে আসে।

কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হলে তেহরানের পক্ষে আবারও হুতিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে হুতিদের হামলা বেড়েছে। সংকীর্ণ এ প্রণালি সমুদ্রপথে, বিশেষ করে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে মহাগুরুত্বপূর্ণ। আরব সাগর থেকে এডেন উপসাগর দিয়ে লোহিত সাগরে প্রবেশ করতে হলে সরু এ প্রণালিই একমাত্র পথ।

হুতিরা বলেছে, ইরানের সমর্থনে তারা এসব হামলা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোকে যুদ্ধে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইয়েমেনে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত এডমুন্ড ফিটন-ব্রাউন দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেছেন, হুতিরা যে তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করবে, এতে কোনো সন্দেহ কখনোই ছিল না।

ফিটন-ব্রাউন আরও বলেন, কয়েক মাস ধরে সমুদ্রে হামলা চালানোর পর হুতিরা হয়তো মনে করছে, সৌদি আরব তাদের যেসব হুমকি দিয়ে রেখেছে, বাস্তবে সেগুলো যাচাই করার সময় এসেছে। হয়তো তারা মনে করছে, সৌদি আরব লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তারা মনে করছে, ইরানিদের সামনে সৌদিরা নিজেদের দুর্বল ও ভীত হিসেবে তুলে ধরেছে।

হুতিরা এ সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিক ফিটন–ব্রাউন। তিনি বলেন, ‘হুতিরা মনে করছে, এটাই সেই সময়, যখন তারা নিজেদের দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে এবং সৌদি আরবের কাছ থেকে তাদের (হুতি) আগের দাবিদাওয়ার চেয়ে আরও বেশি সুবিধাজনক শর্ত আদায় এবং প্রতিপক্ষকে সেটা মেনে নিতে বাধ্য করতে পারবে।’

সৌদি আরব বহু বছর ধরে হুতিদের দমন করার চেষ্টা করে আসছে। ২০১৫ সাল থেকে গোষ্ঠীটিকে রাজধানী থেকে হটিয়ে ২০১৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।

তবে এখন পর্যন্ত তারা লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ভয় দেখিয়ে ওই পথে চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা থেকে হুতিদের বিরত রাখতে পারেনি।

হামলাগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কী প্রভাব ফেলছে

গত মঙ্গলবার হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো। কিন্তু এতে বহু মানুষ হতাহত হন। বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এটাই ছিল সৌদি আরবে সবচেয়ে বড় হামলা।

চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, এই হামলাগুলো নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান বৃহত্তর সংঘাতেরই অংশ।

দ্য ইনডিপেনডেন্টকে লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, বড় একটি প্রশ্ন হলো, পুরো অঞ্চলে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কতটা প্রতিরোধক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা গেছে। কিন্তু নানা চেষ্টা সত্ত্বেও হুতিদের সামরিক শাখাকে ঠেকানো ‘আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠছে’।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিতে হুতিদের বিষয়টির কোনো সমাধান হয়নি। ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই ওয়াশিংটন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনের বিষয়টি আলোচনায় তুলতে চাপ দিয়ে আসছিল।

‘যুক্তরাষ্ট্র যদি লোহিত সাগরকে উপেক্ষা করে, হুতিদের কাছ থেকে সৌদি আরবের ওপর তৈরি হওয়া এই হুমকিকে উপেক্ষা করে, তাহলে সেটি আসলে পুরো বিষয়কে নিজেদের জন্যই আরও কঠিন করে তোলা হবে।’

লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইরানের আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে একটি সমাধান বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত অবসানের যেকোনো উদ্যোগের অংশ হতে হবে। তা না হলে এসব গোষ্ঠী আবার অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারবে এবং পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীল করে তুলতে সক্ষম হবে।

এরপর কী হতে পারে

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ হুতিদের হামলার নিন্দা করেছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘কূটনীতির পথ এখনো বন্ধ হয়নি।’

যদিও হুতিরা দাবি করেছে, সৌদি আরব তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আল-জওফ, আল-বায়দা, মারিব ও তাইজ প্রদেশে হামলা চালিয়েছে।

এ নিয়ে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরব সব সময় কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে থাকবে। তবে নিজেদের ও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এ রাষ্ট্র কখনোই পিছপা হবে না। নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আমরা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করব।’

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ড হুতিদের ‘শত্রুতাপূর্ণ কর্মকাণ্ড দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা’ করার অঙ্গীকার করেছে।

হেলিকপ্টার নিয়ে লোহিত সাগরে একটি জাহাজের পিছু নিয়েছে হুতিরা

সৌদি আরবের বিশ্লেষক আলী শিহাবি হুতিদের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি আরব বুঝতে পেরেছে, হুতিরা যুক্তিসংগত আচরণ করছে না। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই কম।’

এ বিষয়ে ফিটন-ব্রাউন বলেন, সৌদি আরব পাল্টা লড়াই করতে প্রস্তুত বলেই তাঁর মনে হচ্ছে। হুতিদের আগ্রাসন ঠেকাতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় (মক্কা চুক্তি) তারা একটি নৌ জোট গঠন করেছে।

যদিও এখনো আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ রিয়াদের সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। এদিকে ইয়েমেনে কারা শাসন করবে, তা নিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

সর্বশেষ এ উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ সালমান ওয়াশিংটনে ফোন করে হুতিদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছেন বলে কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পেয়েছে।

ফিটন-ব্রাউন বলেন, এ অঞ্চলের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব চাইছে। তারা চায়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান সংঘাত যে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, যুক্তরাষ্ট্র তা স্বীকার করুক এবং সেখানে হস্তক্ষেপ করুক। কারণ, সৌদি আরব সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি লোহিত সাগরকে উপেক্ষা করে, হুতিদের কাছ থেকে সৌদি আরবের ওপর তৈরি হওয়া এই হুমকিকে উপেক্ষা করে, তাহলে সেটি আসলে পুরো বিষয়কে নিজেদের জন্যই আরও কঠিন করে তোলা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন না পাওয়ায় মার্কিন নাগরিকেরা ক্ষুব্ধ। তবে আমার মনে হয়েছে, সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করতে একটি জোট গড়ে তোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র খুব সামান্যই চেষ্টা করেছে।’

ট্রাম্প যদি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে কড়া পদক্ষেপ নেন বা পারস্য উপসাগরে আকাশ, নৌ ও স্থলপথে বড় ধরনের কোনো অভিযান চালান, তবে সেটি শুরুতেই নস্যাৎ করা হুতিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হুতিরা তাদের নৌ সক্ষমতা ব্যবহার করে ইরান যুদ্ধে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের পথকে রীতিমতো কণ্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ করে তুলতে পারবে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো চাইলে অবশ্য সৌদি আরবের উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে নিজেদের অভিযান চালাতে পারে। তবে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওই এলাকা পর্যন্ত গিয়েও অনায়াস আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি সৌদি উপকূল থেকে হরমুজ প্রণালির দূরত্ব এক হাজার কিলোমিটারের বেশি হওয়া মার্কিন বাহিনীর জন্য আরেক বড় বাধা।

সম্প্রতি হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা ও এর অন্তর্নিহিত সতর্কবার্তার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য, লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমাবেশ প্রতিহত করা। ইরানের ওপর কোনো বড় হামলার আগে অথবা কড়া পাহারায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মার্কিন চেষ্টাকে আটকে দিতেই মূলত এ কৌশল নিয়েছে তারা।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কথা বলছেন। ৭ আগস্ট ২০২৬, মক্কা

যুক্তরাষ্ট্র অতীতে বহুবার হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে এবং আগামী দিনেও সেই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এরপরও ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলে হুতিদের এ অব্যাহত হামলা মার্কিন বাহিনীর সমরপ্রস্তুতি ও সেনাসমাবেশের গতি বেশ খানিকটা মন্থর করে দিতে পারবে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের কাছে হুতিবিরোধী ইয়েমেনি একটি সূত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছে। সেই সূত্রের ভাষ্যমতে, সংঘাতের পেছনের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে সৌদি আরবের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে বয়ে যাওয়া তেলের বিশাল পাইপলাইন (ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন)।

ইরাক থেকে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী পাইপলাইনের একটি অংশে হামলা চালানোর পর লোহিত সাগর দিয়ে নিজেদের তেল পরিবহনের এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন শুক্রবার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। পাইপলাইনটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। ইউরোপে জ্বালানি তেলের জোগান স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রেও এ পাইপলাইনের ভূমিকা অনেক।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় হুতিদের কড়া জবাব দিতে এবং নিজেদের রণতরি ঝুঁকিমুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে হুতিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করতে পারে ইসরায়েল। এর মধ্য দিয়ে পুরো যুদ্ধের মানচিত্রে খুলে যেতে পারে নতুন আরেকটি বিপজ্জনক রণাঙ্গন। কারণ, হুতি বিদ্রোহীদের শক্তিশালী করতে সম্প্রতি নিজেদের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার, সামরিক উপদেষ্টা, মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনসংক্রান্ত সরঞ্জাম ইয়েমেনে পাঠিয়েছে ইরান।

(দ্য ইনডিপেনডেন্ট, রয়টার্স, আল–জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন শামিমা নাসরিন)