ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবিযুক্ত বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে চলছে যানবাহন। তেহরানে, ২০ এপ্রিল ২০২৬
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবিযুক্ত বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে চলছে যানবাহন।  তেহরানে, ২০ এপ্রিল ২০২৬

ইরানে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে, মোজতবা খামেনি নাকি সামরিক বাহিনী

ইরানে ইসলামি বিপ্লব হয় ১৯৭৯ সালে। প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র। এর পর থেকে দেশটির রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ ছিল শেষ কথা। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের সময়টায় সর্বোচ্চ নেতার সেই চিরচেনা ভূমিকায় বড় পরিবর্তন এসেছে।

এখন ইরানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা বাড়িয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। সামরিক আর নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতামত গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে মনে করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনায় ইরানের অবস্থান আগের চেয়ে বেশি অনমনীয় হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ওই দিনই হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। পরে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন। সর্বোচ্চ নেতা পেলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) ভূমিকা ক্রমে পোক্ত হয়েছে, কমেছে সর্বোচ্চ নেতার।

বিষয়টির সঙ্গে জানাশোনা রয়েছে, এমন অন্তত তিনজন সরকারি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর শীর্ষে মোজতবা খামেনি আনুষ্ঠানিকভাবে রয়েছেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরিবর্তে তাঁর ভূমিকা জেনারেলদের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুমোদন করায় সীমাবদ্ধ হয়ে আছে।

ইরানের কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, যুদ্ধের কারণে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল (এসএনএসসি), সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর এবং আইআরজিসির একটি ছোট ও কট্টরপন্থী বলয়ের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে। বর্তমানে এ বলয় সামরিক কৌশল ও মূল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

ইরানি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরশ আজিজি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সম্ভবত তাঁর (সর্বোচ্চ নেতা) মাধ্যমেই চূড়ান্ত হচ্ছে। কিন্তু তিনি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত নাকচ করতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে না। যাঁরা যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে কীভাবে যাবেন?’

পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তান এ কাজে মধ্যস্থতা করছে। শান্তি আলোচনায় সম্পৃক্ত একজন উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘ইরানিদের মতামত জানানোর গতি বেশ ধীরস্থির। অবস্থা দেখে মনে হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো একক কাঠামো দেশটির নেই। মাঝেমধ্যে কোনো বিষয়ে তাঁদের মতামত জানাতে দুই থেকে তিন দিন সময় লেগে যায়।’

তবে চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তেহরানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাধা নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চাওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। ওয়াশিংটন যা দিতে চায়, তাতে তেহরানের জেনারেলরা রাজি নন। এটাই বড় বাধা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইরানের প্রধান কূটনৈতিক হিসেবে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তাঁর সঙ্গে সম্প্রতি ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্ত হয়েছেন। বাঘের গালিবাফ নিজেও আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার। তেহরানের মেয়র ছিলেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট পদে লড়েছেন। যুদ্ধের সময়ে বাঘের গালিবাফ ইরানের অভিজাত রাজনৈতিক, সামরিক, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় বলয়ের মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

তবে পাকিস্তানের একটি ও ইরানের দুটি সূত্র বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হিসেবে ভূমিকা রাখছেন আইআরজিসি কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদি। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে তিনিই ইরানের মূল ব্যক্তির ভূমিকায় চলে এসেছেন।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের হামলা শুরুর দিনই মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁর পা আর শরীরের নানা অংশে গুরুতর জখম হয়েছে। আহত অবস্থায় সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন তিনি। কিন্তু এর পর থেকে মোজতবা খামেনি এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে আসেননি।

নতুন সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ মহলের দুজন রয়টার্সকে জানান, নিরাপত্তার কারণে মোজতবা খামেনি আইআরজিসির সহকারীদের মাধ্যমে অথবা সীমিত অডিও লিংকের সাহায্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো উত্তর মেলেনি। তবে ইরানের কর্মকর্তারা এর আগে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তেহরানের নেতৃত্বে কোনো মতভেদ নেই।

এ বিষয়ে চিন্তক প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাটানকা রয়টার্সকে বলেন, ‘ইরানের নেতৃত্বে মতপার্থক্য থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি এখন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় মোজতবা খামেনি একক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর বদলে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন।’