
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আজ শনিবার সকালে যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়েছে। ইরানও পাল্টা জবাব দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক সংঘাতের মধ্যে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার হুমকি দূর করবে। একই সঙ্গে ইরানিদের জন্য তাঁদের শাসক উৎখাত করার সুযোগ তৈরি করবে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন এ হামলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।
ইরান ও তার দীর্ঘদিনের শত্রুদের মধ্যে এ নতুন সংঘাত তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের আশাকে আরও ক্ষীণ করে তুলেছে।
১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকটের উল্লেখ ট্রাম্পের
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কয়েক দশকের বিরোধের কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন, যেখানে ছাত্ররা ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে ৪৪৪ দিন ধরে জিম্মি করে রেখেছিল। এ ছাড়া ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে বিভিন্ন হামলার জন্য তিনি ইরানকে দায়ী করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সব জায়গায় বোমা পড়বে’। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন। এটি আপনাদেরই হবে। সম্ভবত পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এটিই আপনাদের একমাত্র সুযোগ।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে বেশ কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করেছে। আকাশ ও সমুদ্রপথে এ অভিযানের পরিধি তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি। তবে এক কর্মকর্তা জানান, এ অভিযান কয়েক দিন ধরে চলতে পারে।
তেহরানকে পারমাণবিক আলোচনায় নমনীয় করতে ট্রাম্প এ অঞ্চলে বিশাল মার্কিন সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ‘ব্যাপক ও চলমান’ অভিযান শুরু করেছে।
তেহরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে না পারে, তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার একটি বড় বাধা ছিল। ট্রাম্প বলেন, ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি। তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানি শাসনের “আসন্ন হুমকি” নির্মূল করে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা।’
ইরানিদের প্রতি ‘স্বৈরশাসনের জোয়াল’ সরানোর আহ্বান ইসরায়েলের
ইরানিদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন উগ্রবাদী ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এ যৌথ হামলা ‘সাহসী ইরানি জনগণের জন্য তাঁদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করবে’।
যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইরানের সব স্তরের মানুষের জন্য সময় এসেছে...স্বৈরশাসনের জোয়াল ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলার এবং একটি মুক্ত ও শান্তিকামী ইরান গড়ে তোলার।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তেহরানে নেই। তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এ হামলা হলো। ইরান যদি তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যায়, তবে আবারও হামলা করা হবে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বারবার হুমকি দিয়ে আসছিল।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, ইসরায়েল রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে এবং হুমকি দূর করতে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ‘আগাম প্রতিরোধমূলক’ হামলা শুরু করেছে।
ইসরায়েল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইরানে পবিত্র রমজান মাসে এ হামলা চালিয়েছে। আবার এ হামলা ইহুদি সম্প্রদায়ের উৎসব ‘পুরিম’-এর ঠিক আগে করা হলো। পুরিম উৎসব প্রাচীন পারস্যে (বর্তমান ইরান) ইহুদিদের ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে ফেরার স্মৃতিতে পালন করা হয়, যা আগামী সোমবার শুরু হতে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক মাসের পরিকল্পনা
ইসরায়েলের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করে কয়েক মাস ধরে এ অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। হামলার তারিখ কয়েক সপ্তাহ আগেই ঠিক করা হয়েছিল।
আজ তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে পুরো ইসরায়েলে সাইরেন বেজে ওঠে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলছে, সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য জনগণকে প্রস্তুত রাখতে এ আগাম সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জরুরি খাত বাদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে উপস্থিতি বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া আকাশপথ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। বেসামরিক ফ্লাইটের জন্য ইসরায়েল তাদের আকাশপথ বন্ধ করে দিয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জনগণকে বিমানবন্দরে না যেতে অনুরোধ করেছে।
কয়েক দশকের পারমাণবিক বিরোধ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে পারে, এমন সামরিক সংঘাত এড়াতে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার আলোচনা শুরু করেছিল।
তবে উগ্রবাদী নেতানিয়াহু সরকার বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যেকোনো চুক্তিতে তেহরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করার শর্ত থাকতে হবে। শুধু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করলে হবে না। তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের জন্যও ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।
ইরান বলেছিল, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে তারা ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি এর সঙ্গে যুক্ত করতে রাজি হয়নি।
তেহরান আরও বলেছিল, যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে তারা নিজেদের রক্ষা করবে। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করেছিল, যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেখান থেকে হামলা হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানবে।
গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় যোগ দিয়েছিল, যা ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ।
তেহরান তখন কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি আল–উদাইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পাল্টা জবাব দিয়েছিল।
পশ্চিমা শক্তিগুলো দাবি করে আসছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম হতে পারে। যদিও তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কথা অস্বীকার করে আসছে।