
ইরান যুদ্ধ চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাসিন্দাদের ফোনে একটি খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হয়েছিল। তাতে লেখা ছিল, ‘যেকোনো নিরাপত্তাজনিত ঘটনা সম্পর্কে অবিলম্বে তথ্য দিন।’
তবে আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এমন কোনো বার্তা পাঠায়নি। পরে তারা বাসিন্দাদের এই ‘ভুয়া’ বার্তার বিষয়ে সতর্ক করে দেয়।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তেহরানের পাল্টা হামলার ধকল সইতে হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও। তবে দেশটির কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা আসলে আরও একধরনের চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাইবার নিরাপত্তাপ্রধান মোহাম্মদ আল–কুয়েতি গত মাসে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই দেশে সাইবার হামলা অনেক বেড়ে যায়। যুদ্ধের প্রথম দিকে ইরানের মিত্রপক্ষগুলোর সাইবার হামলার সংখ্যা দিনে ৫ লাখে গিয়ে ঠেকে। এসব হামলার মূল লক্ষ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
মোহাম্মদ আল–কুয়েতি বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও দেশটির বাইরে থেকে তাদের প্রক্সিরা হামলা অব্যাহত রেখেছে। অনেককে ফিশিং ই–মেইল পাঠিয়ে বিভিন্ন লিংকে ক্লিক করতে বলা হয়। শুরুতে এসব ই–মেইলের উদ্দেশ্য তথ্য সংগ্রহ থাকলেও পরে তা ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে।’
যুদ্ধের সময় নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান ও তার মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১২টি মিত্রদেশে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ে। তবে পর্দার আড়ালে মনস্তাত্ত্বিক ও তথ্যযুদ্ধে তেহরান অনেক বড় প্রভাব ফেলে।
ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডসের নামে পাঠানো হুমকিমূলক বার্তায় ইসরায়েলিদের ‘মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত’ হতে বলা হয়। অন্যদিকে গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর বিতর্কিত উচ্ছেদ আদেশের আদলে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর বাসিন্দাদের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও ঘরবাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত মার্চের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের ওয়েব সার্ভারে সাইবার হামলা চালানো হয়। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। ব্যাহত হয় স্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় মেটা, ওরাকল, এনভিডিয়া, মাইক্রোসফট ও গুগলের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলোর একটি তালিকা (হিট লিস্ট) প্রকাশ করে রেভোল্যুশনারি গার্ডস। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়।
লন্ডনভিত্তিক ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তাঝুঁকি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘ড্রাগনফ্লাই ফ্রম ডাউ জোনস’-এর সহযোগী পরিচালক পাওলো নাপোলিতানো বলেন, সাইবার হামলা ও প্রভাব বিস্তারের লড়াই এখন আধুনিক যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইরান ও তার মিত্ররা এসব কৌশল ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে।
বেশ আগে থেকেই সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিক সুযোগ–সুবিধা দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে আসছে। লাভজনক বাজার, মূলধন ও স্বল্প করের সুবিধার কারণে ব্যবসায়ীরা এসব দেশে ছোটেন। দশকের পর দশক ধরে বিশ্বের মেধাবী মানুষদের ভিড় জমানো এসব দেশকে ‘স্থিতিশীলতার দ্বীপ’ হিসেবে দেখা হতো।
ইরানের এই অভিযানের লক্ষ্য হলো অত্যন্ত যত্নসহকারে তৈরি করা সেই ইমেজ বা ভাবমূর্তি নষ্ট করা। বাহ্যিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুব সামান্য হলেও তারা মূলত দেশগুলোর সুনামের ক্ষতি করতে চায়।
নাপোলিতানো বলেন, ‘ইরান খুব ভালো করেই জানত, তারা প্রথাগত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করতে পারবে না। তাই সম্ভবত তারা কয়েক বছর ধরে এ ধরনের সংঘাতের জন্য এই চোরাগোপ্তা পদ্ধতির প্রস্তুতি নিচ্ছিল।’
যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও দেশটির বাইরে থেকে তাদের প্রক্সিরা সাইবার হামলা অব্যাহত রেখেছে। অনেককে ফিশিং ই–মেইল পাঠিয়ে বিভিন্ন লিংকে ক্লিক করতে বলা হয়। শুরুতে এসব ই–মেইলের উদ্দেশ্য তথ্য সংগ্রহ থাকলেও পরে তা ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠেসংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের সাইবার নিরাপত্তাপ্রধান মোহাম্মদ আল কুয়েতি
জর্ডানের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তাকেন্দ্র মার্চের শুরুর দিকে জানিয়েছিল, দেশটিতে ইরান-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো সাইবার হামলা চালিয়েছে। জর্ডানের অর্থনৈতিক সংকট চলাকালে দেশটির কৌশলগত খাদ্য মজুত নষ্ট করতে তারা গমের গুদামের তাপমাত্রা পরিবর্তনের চেষ্টা চালায়।
ইরান সিসিটিভি ক্যামেরা ও গৃহস্থালি নিরাপত্তার ক্যামেরা হ্যাকিং করছে, এমন খবর পান সরকারি কর্মকর্তারা। এরপর তারা বাসিন্দাদের দ্রুত পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের অনুরোধ জানান।
ড্রাগনফ্লাইয়ের প্রধান সাইবার বিশ্লেষক সেয়ং জেওন বলেন, ‘ইরানি হ্যাকাররা যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এর মূল লক্ষ্য হতে পারে বিমান হামলার জন্য নির্ভুল অবস্থান শনাক্ত করা অথবা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা।’
পারস্য উপসাগর থেকে শত শত মাইল দূরে ইসরায়েলিদের ফোনেও একই ধরনের ভীতিকর খুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
হিব্রু ভাষায় পাঠানো একটি বার্তায় লেখা ছিল, ‘তোমাদের কারণে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশু মারা গেছে। তুমি ও তোমার পরিবার এখন আমাদের লক্ষ্যবস্তু। মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করো।’ বার্তাটির নিচে ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডসের নাম উল্লেখ ছিল।
তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ
যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, তাদের মাটিতে কোনো হামলা হলে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর পাল্টা আঘাত হানা হবে। এ অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের পর হামলার গুঞ্জন যখন তুঙ্গে, তখন ‘ইরান মিলিটারি মিডিয়া’ নামে একটি প্রো-ইরান এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো ক্যাপশন ছাড়াই দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার একটি ছবি পোস্ট করা হয়।
ওই অ্যাকাউন্টটিকে অনেকে ভুল করে সামরিক বাহিনীর অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট মনে করেন। এমন প্রচ্ছন্ন হুমকিতে শহরের বাসিন্দারা দারুণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে প্রথম মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান তাদের হুমকি কার্যকর করতে শুরু করে।
বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ জায়গা হিসেবে পরিচিত এসব শহরে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আনোয়ার গারগাশ এই পরিস্থিতিকে ‘সবচেয়ে খারাপ অবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ জায়গা হিসেবে পরিচিত এসব শহরে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আনোয়ার গারগাশ এই পরিস্থিতিকে ‘সবচেয়ে খারাপ অবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মার্কিন বিভিন্ন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার পাশাপাশি ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডস বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানে। এসব স্থাপনার মধ্যে দুবাইয়ের হোটেল, বাহরাইনের আবাসিক বহুতল ভবন, কাতারের গ্যাস স্থাপনা এবং কুয়েতের বিমানবন্দর ছিল।
ইরানের হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তথ্য ও অপতথ্যের ছড়াছড়ি শুরু হলে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎপর হয়ে ওঠে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দৃশ্য ধারণ করা বা ‘অনুপযুক্ত’ ভিডিও শেয়ার করার দায়ে কয়েক ডজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কুয়েতে খ্যাতনামা কুয়েতি-আমেরিকান সাংবাদিক আহমেদ শিহাব-এলদিনকে যুদ্ধসংক্রান্ত ভিডিও শেয়ার করার অভিযোগে আটক করা হয়। অন্যদিকে কাতারে ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য ধারণ, শেয়ার ও প্রচার’ করার অভিযোগে ৩০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তী সময়ে সরকারের এই কঠোর নীতি কাজে আসা শুরু করে। আইনি পদক্ষেপের ভয়ে সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত চ্যাটেও নিজেদের সংবরণ (সেলফ সেন্সরশিপ) করতে শুরু করেন এবং পুরোনো পোস্টগুলো মুছে ফেলেন। এমনকি এ অঞ্চলে কর্মরত পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকেরাও সতর্কতা হিসেবে সংবাদ ও ছবিতে নিজেদের নাম (বাইলিন) ব্যবহার করা বন্ধ করে দেন।
সাইবার হামলার বিস্তার
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার বাইরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে দেশটির পক্ষে কাজ করা হ্যাকাররা। মার্কিন গোয়েন্দা সতর্কতা ও তদন্তের সঙ্গে যুক্ত তিনটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক তেল, গ্যাস ও পানি সরবরাহ কেন্দ্রে বিঘ্ন ঘটিয়েছে তারা।
সূত্রগুলো জানায়, হ্যাকিংয়ের ফলে এসব স্থাপনার কিছু শিল্পপ্রক্রিয়া অচল হয়ে পড়ায় সেগুলো এখন হাতে চালাতে হচ্ছে।
গত মাসে এফবিআই পরিচালক ক্যাশ প্যাটেলের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি হওয়া ই–মেইল ফাঁস করে দেয় তেহরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা। এর আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় চিকিৎসা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ব্যাহত করেছিল।
একই হ্যাকার গোষ্ঠী ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান হারজি হালেভির ব্যক্তিগত ডিভাইস ও অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার দাবি করেছে। নিজেদের দাবির সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে তারা বেশ কিছু ছবি ও পরিচয়পত্র প্রকাশ করেছে।
এই সাইবার কার্যক্রমের নেপথ্যে প্রায়ই মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য থাকে। ইরানি হ্যাকাররা ক্যাশ প্যাটেল এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ওপর চালানো হামলার বিষয়টি ইন্টারনেটে বেশ ফলাও করে প্রচার করেছে এবং এর প্রভাবকে অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান নিজের দেশে বিদেশি ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে রাখায় এ অঞ্চলে তাদের সাইবার হামলার তীব্রতা কিছুটা কমেছে।
পালো আল্টো নেটওয়ার্কসের ‘ইউনিট ৪২’-এর থ্রেট ইন্টেলিজেন্স বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক অ্যান্ডি পিয়াজা সিএনএনকে বলেন, ‘আমরা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে সাইবারজগতে ছড়িয়ে পড়তে দেখছি। এসব হামলা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংগঠিত, দীর্ঘস্থায়ী, কৌশলগত এবং প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।’
পিয়াজা আরও বলেন, অত্যন্ত উন্নত ও বহুমুখী সাইবার হামলা চালানোর প্রমাণিত সক্ষমতা ইরানের রয়েছে। তবে যুদ্ধ শুরুর পর দেশটির অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট সংযোগ ১ থেকে ৪ শতাংশে নেমে আসায় তাদের সাইবার কার্যক্রম শুরুতে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
নাপোলিতানো বলেন, ইরানের এই অপ্রথাগত (অপ্রতিসম) হামলার কার্যকারিতা নিরূপণ করা কঠিন হলেও তারা তাদের একটি প্রধান লক্ষ্য নিশ্চিতভাবেই অর্জন করেছে। এসব হামলার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো উপসাগরীয় দেশগুলোতে আতঙ্ক ছড়ানো এবং অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেওয়া। এর মাধ্যমে তারা এটিই প্রমাণ করতে চায়, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ইরান থেকে আসা হুমকি মোকাবিলায় অক্ষম।’