
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবির মতো শহর এবং কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো, যেগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—এই হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। এর ফলে ‘নিরাপদ ও উন্মুক্ত’ হিসেবে দেশগুলোর দীর্ঘদিনের যে ভাবমূর্তি রয়েছে, তা বড় ধাক্কা খেয়েছে।
শনিবার দুই শ যুদ্ধবিমান নিয়ে ইরানজুড়ে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জবাবে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। ধনী উপসাগরীয় দেশগুলো, যেগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব লক্ষ্য করে এসব হামলা চালায় ইরান।
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার মধ্যেও দুবাইকে দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখা হতো। ইরানি ব্যবসায়ী, মার্কিন তারকা, রুশ ধনকুবের—সবার জন্যই এটি ছিল বিলাসী ও নিশ্চিন্ত জীবনের ঠিকানা। কিন্তু এবারের হামলার পর সেই ধারণা ভেঙে গেছে।
দুবাইয়ে পাঁচতারা হোটেলে আগুন লাগে, বিস্ফোরণে উঁচু টাওয়ারগুলোর জানালা কেঁপে ওঠে এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে চারজন আহত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও আতঙ্কিত অভিবাসী শ্রমিকেরা রাতের আকাশে জ্বলন্ত ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে যাওয়ার ভিডিও শেয়ার করেন, যেগুলো শহরের বিখ্যাত আকাশচুম্বী ভবনগুলোর পাশ দিয়ে উড়ে যায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুধু আমিরাতেই ২০০টির বেশি ড্রোন এবং ১৩৭টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এর বেশির ভাগই লক্ষ্যভ্রষ্ট করা হলেও ১৪টি ড্রোন আমিরাতের ভূখণ্ড ও জলসীমায় আঘাত হানে। প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ শহরের বিভিন্ন স্থানে পড়ে, এতে অতিরিক্ত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা ঘটে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক সিনজিয়া বিয়ানকো বলেন, ‘এটি খুবই কঠিন ও গুরুতর মুহূর্ত। নিরাপত্তার এই ভাবমূর্তির চেয়ে তারা আর বেশি কিছু দিত না। সবার সঙ্গে ভারসাম্য রেখে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল নিয়েই তারা গর্ব করত।’
নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ের মর্যাদা ধরে রাখতে দুবাই ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার। কিন্তু এবার কোনো উপসাগরীয় দেশই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রেহাই পায়নি।
এমনকি ওমানও—যেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ এড়াতে আলোচনা মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছিল, সে দেশেও হামলা হয়েছে। ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, আরব সাগর–তীরবর্তী দুকম বন্দরের একটি আবাসিক এলাকায় ড্রোন আঘাত হানে, এতে একজন বিদেশি শ্রমিক আহত হন।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জনসংখ্যার বড় অংশই বিদেশি শ্রমিক। তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। কুয়েতে একটি ড্রোন বিমানবন্দরে আঘাত হানে, এতে নয়জন শ্রমিক আহত হন। আবুধাবিতে লক্ষ্যভ্রষ্ট করা একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পড়ে একজন এশীয় নাগরিক নিহত হন এবং সাতজন আহত হন।
আরেকটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ আবুধাবির ইতিহাদ টাওয়ারস কমপ্লেক্সের সামনে পড়ে। এই কমপ্লেক্সেই ইসরায়েলি দূতাবাস অবস্থিত। এতে এক নারী ও তাঁর সন্তান সামান্য আহত হন।
কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটিতে অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রোববার জানায়, দেশজুড়ে ছোড়া ১৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা লক্ষ্যভ্রষ্ট করেছে। কাতারে একটি বড় মার্কিন বিমানঘাঁটি রয়েছে।
দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইনে, যেখানে মার্কিন নৌঘাঁটি রয়েছে, সে দেশের সরকার জানিয়েছে, তারা ৪৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৯টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। রাজধানী মানামার কয়েকটি আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়। সরকারি হাসপাতালগুলো জানিয়েছে, অন্তত চারজন আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
কয়েক সপ্তাহ ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ এড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছিল। কারণ তারা আশঙ্কা করছিল, সংঘাতের প্রভাব তাদের দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। এসব দেশের অর্থনৈতিক মডেল মূলত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল—যাতে মধ্যপ্রাচ্যে বিনিয়োগকারী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পর্যটকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।