
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা যেন কমছেই না। নতুন কোনো সংঘাত এড়ানোর জন্য যদিও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে, তারপরও হুমকি দিতে ছাড়ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আলোচনার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, ইরান যদি একটি চুক্তিতে না পৌঁছায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে খুব কঠিন কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে।
ওমানের মধ্যস্থতায় গত সপ্তাহে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক হয়েছে। সেখানে ইরানের পরমাণু ইস্যু, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ আলাপ হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তখন কূটনৈতিক এই আলাপ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন।
এই আলোচনা শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সেনা মোতায়েনের পর। পরের ধাপে কবে আলোচনা হবে, তা জানা যায়নি। প্রধান ধাপের আলোচনা সংঘাত এড়াতে কিছুটা আশার আলো দেখালেও সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ১২–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের হয় একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে, না হলে আমাদের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
আরও রণতরি মোতায়েনের ঘোষণা
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি রণতরির বহর মোতায়েন করা রয়েছে। সেখানে আরেকটি রণতরি মোতায়েনের কথা ভাবছেন বলে ট্যানেল ১২–কে জানিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ায় মোতায়েন থাকা ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন ও যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে মোতায়েন থাকা ইউএসএস এইচ ডব্লিউ বুশকে মধ্যপ্রাচ্যে আনা হতে পারে। তবে সেগুলো ইরানের কাছাকাছি পৌঁছাতে অন্তত এক সপ্তাহ লাগতে পারে। এ ছাড়া ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড মোতায়েন রয়েছে। সেটিও মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হতে পারে।
চলমান উত্তেজনার মধ্যে কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের আল–উদেইদ ঘাঁটিতেও তৎপরতা শুরু হয়েছে। স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা ছবিতে দেখা গেছে, ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে সক্ষম ট্রাকগুলোয় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ভরা হচ্ছে। এর অর্থ হলো—ইরানের হামলার সময় সেগুলো যেন দ্রুত প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানে নেওয়া যায়। অর্থাৎ ওয়াশিংটনও ইরানের হামলার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছে না।
এর আগে গত বছরে ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের সময় ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তখন ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনায় বোমারু বিমান দিয়ে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। ওই হামলায় স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর পরপরই কাতারে আল–উদেইদ ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান।
চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা
ওমানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি ও ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকের লক্ষ্য তেহরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য’ চুক্তিতে পৌঁছানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করা। তাঁরা দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দূর করতে সংলাপের ওপর জোর দিয়েছেন।
ইরানের সঙ্গে আলোচনার পরিধি কেবল পরমাণু ইস্যুতে সীমিত না রেখে আরও বিস্তৃত করতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যেমন তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। তবে ইরান বলেছে, গত বছর তাদের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নতুন করে গড়ে তুলেছে তারা। এই মজুত নিয়ে কোনো আলোচনা করা যাবে না।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর গতকাল বুধবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে একটি বৈঠকের কথা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই বৈঠকে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো চুক্তিতে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করার জন্য চাপ দেবেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই বিদেশি চাপ, বিশেষ করে ইসরায়েলি চাপ থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে।’
ট্রাম্পই ‘শেষ সীমা’ নির্ধারণ করবেন
ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ওয়াশিংটনের দাবি—তেহরানকে ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করতে হবে। পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম লাগে। ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি গত সোমবার বলেছিলেন, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে লঘু করা হবে কি না, তা সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ওপর নির্ভর করছে।
ইরানকে সীমিত মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোমবার বলেন, ‘আমি মনে করি, আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা কোথায় শেষ সীমা টানব, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই নেবেন।’