
সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব যে রাজনৈতিক বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এ যুগে যুদ্ধ হয়ে উঠেছে আরও জটিল। এর ফলাফলও আর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকছে না। সাম্প্রতিক এই যুদ্ধ নিয়ে এমন বিশ্লেষণ করেছেন রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এডিটর ইন চিফ ফিওদর লুকিয়ানভ।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ বাধাল, তাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাঠ্যবইয়ে এখন স্থান করে দেওয়া যেতে পারে। এটি যে শুধু ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের সব ধারণাকে উল্টে দিয়েছে তা নয়, বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্ব ময়দানে শক্তি ব্যবহারের ধরন কীভাবে বদলে যাচ্ছে।
বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত তত্ত্বগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়টিও একেবারে নেই হয়ে যায়নি। সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকাটা এখনো একটি বড় সুবিধার জায়গা বলে বিবেচিত হয়। তবে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাব্য ফল আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কারণ, জোর করে চাপ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে আগের মতো আর সহজে ও সরাসরি ফল পাওয়া যায় না। তা শুধু ইরানের মতো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের মতো পরিস্থিতিতেই নয়, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য চাপের ক্ষেত্রেও।
সব পক্ষই নিজেদের দেশের প্রয়োজনে নানা ধরনের রাজনৈতিক বয়ান দেয়। সেগুলো বাদ দিলে বাস্তব চিত্রটা খুবই পরিষ্কার।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো নিয়ে গঠিত শক্তিশালী জোটটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রতিপক্ষ ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। কিন্তু তারা অভিযানে নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের পাশে রাশিয়া ও চীনের সমর্থন সীমিত ছিল বলে ধারণা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দ্রুত ও বিধ্বংসী হামলা চালিয়ে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে পরাজিত করতে চেয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, তেহরান চাপের মুখে দ্রুতই নতি স্বীকার করবে।
তবে বাস্তবে উল্টোটা হলো। আক্রমণকারী পক্ষের শক্তিশালী বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে ইরান অপ্রত্যাশিতভাবে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুরুতে বড় ধরনের আঘাত লাগলেও ইরান ভেঙে পড়েনি, বরং তারা আবার সংগঠিত হয়েছে, শক্তি সঞ্চয় করেছে এবং আগের সীমাবদ্ধতাগুলোকে অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে।
এটাই সেই জায়গা, যেখানে নতুন যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সামনে এসেছে। সেটা হলো অসম শক্তি নিয়ে পাল্টা আক্রমণ।
এটা ঠিক যে প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমকক্ষ হতে পারেনি ইরান। তবে তাদের তা প্রয়োজনও হয়নি। কারণ, তারা তাদের হাতে থাকা বিকল্প উপায়গুলো এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যা প্রতিপক্ষের অনেক সক্ষমতাকে কার্যত ভারসাম্যহীন করে দিয়েছে।
প্রথমত, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেয় ইরান। অথচ এ ধরনের হুমকি তারা দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে এলেও আগে কখনো বাস্তবায়ন করেনি।
দ্বিতীয়ত, তারা শুধু ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদকেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সম্পদকেও নিশানা করে।
তৃতীয়ত, তারা বড় অস্ত্রভান্ডারের ওপর নির্ভর করেছে। এই অস্ত্রভান্ডার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তুলনায় কম সমৃদ্ধ হলেও তা এ ধরনের দেশগুলোর গুরুতর ক্ষতি করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছিল। কারণ, দেশগুলো এ ধরনের আঘাত মোকাবিলায় অভ্যস্ত নয়।
চতুর্থত, ইরান তার প্রতিপক্ষের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতি সয়ে নেওয়ার সক্ষমতা দেখায়।
এটা ঠিক যে প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমকক্ষ হতে পারেনি ইরান। তবে তাদের তা প্রয়োজনও হয়নি। কারণ, তারা তাদের হাতে থাকা বিকল্প উপায়গুলো এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যা প্রতিপক্ষের অনেক সক্ষমতাকে কার্যত ভারসাম্যহীন করে দিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিজেই একটি বার্তা দিয়েছে। সেটি হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার কোনোটিরই সমাধান হয়নি। সবকিছু আবার ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য স্থগিত করা হয়েছে। আর এটা সবারই জানা যে পারস্য কূটনৈতিক ঐতিহ্যে আলোচনার অর্থ হলো অধ্যবসায় ও ধৈর্য।
যুদ্ধ শুরুর আগে যে স্থিতাবস্থা ভেঙে গিয়েছিল, তা কার্যত আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসছে। হরমুজ প্রণালি আবার জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে, যদিও এর শর্তাবলি এখনো স্পষ্ট নয়। দুই পক্ষই ভিন্নভাবে এর ব্যাখ্যা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সামরিক শক্তিতে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। দুর্বল পক্ষের প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ছে। আর শক্তিশালী পক্ষগুলোর মধ্যে নিজ দেশের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলার প্রবণতা কমছে। অনেক সংঘাতের ক্ষেত্রেই এমনটা হচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে এটা বিশেষভাবে দৃশ্যমান।
বড় পরিসরে এর রাজনৈতিক প্রভাব হলো বিশ্বের আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়া। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেখিয়েছেন, তিনি আরেকটি পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাতে জড়াতে খুবই অনাগ্রহী। তিনি নিজে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তাতে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি।
এক দিক থেকে এটি বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা। কারণ, ট্রাম্প বোঝেন যে আরেক দফা সংঘাত শুরু হলে তার ফলও সম্ভবত আগের মতোই অচলাবস্থা বা স্থবিরতায় গিয়ে ঠেকবে।
তবে আরেক দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। সেটি হলো শুধু নিজের মর্যাদা ও প্রভাব বজায় রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আর অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়।
মিত্রদেশগুলোকে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির কথা বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে তারা আর নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারবে না যে কোনো সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় তাদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি নেবে।
এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের প্রবণতা নয়, বরং বিশ্বজুড়েই দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিষয়টি বেশি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হলেও একই বাস্তবতা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
একটি বিষয় স্পষ্ট যে মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছিল, তা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এই কাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। এর মূল ভিত্তি ছিল ইসরায়েল ও তার আরব প্রতিবেশী দেশগুলো। বিশেষ করে ধনী উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। এটি আর্থিক পারস্পরিক নির্ভরতা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে কোণঠাসা করার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সামরিক শক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। দুর্বল পক্ষের প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ছে। আর শক্তিশালী পক্ষগুলোর মধ্যে নিজ দেশের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলার প্রবণতা কমছে। অনেক সংঘাতের ক্ষেত্রেই এমনটা হচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে এটা বিশেষভাবে দৃশ্যমান।
এই কৌশল ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধে বড় ধাক্কা খেয়েছিল। তখন ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস এবং এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। তবে গাজা যুদ্ধও পুরো পরিকল্পনাটিকে ভেস্তে দিতে পারেনি। বরং এর অগ্রযাত্রা কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছিল।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল বিষয়টি আরও চূড়ান্তভাবে সমাধান করা এবং ইসরায়েলের সামরিক আধিপত্যের অধীন স্থায়ীভাবে অঞ্চলটিকে পুনর্গঠন করা। ভাবা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হবে। তবে ইরানকে আঞ্চলিক সমীকরণ থেকে সরিয়ে দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে সে পরিকল্পনায় বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান সংঘাতের এ পর্যায়ে কোনো সমস্যারই সমাধান হয়নি। তাই ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলো আবারও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হতে পারে। তবে সে ধরনের চেষ্টা করলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আগের তুলনায় কম সুবিধা পাবে। ওয়াশিংটনের তুলনামূলক ব্যর্থতা এবং তেহরানের তুলনামূলক সাফল্য—সব মিলিয়ে শক্তির ভারসাম্য ইরানের দিকে কিছুটা ঝুঁকছে।
ইরানের নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের ওপর এখন অনেক কিছুই নির্ভর করছে। তারা এ সুযোগ কীভাবে কাজে লাগায়, নির্ভর করছে তার ওপর। যেহেতু কোনো সমঝোতা হয়নি এবং কোনো স্থিতিশীল আঞ্চলিক শৃঙ্খলাও গড়ে ওঠেনি, তাই নতুন অস্থিরতার ঝুঁকি এখনো থেকে গেছে।
তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যে পরিষ্কার। যে যুগে সামরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে নিশ্চিতভাবে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা যেত, সেই যুগ ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ এখন আরও জটিল হয়ে উঠছে। আর এর ফলাফল আগের তুলনায় কম নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে যদিও এখনো বিপুল সামরিক শক্তি; তবে ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, এই শক্তি দিয়ে বিজয় নিশ্চিত করা যাবে না।
মন্তব্য প্রতিবেদনটির লেখক ফিওদর লুকিয়ানভ রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এডিটর ইন চিফ এবং রাশিয়ার ফরেন অ্যান্ড ডিফেন্স কাউন্সিলের প্রেসিডিয়ামের চেয়ারম্যান। তিনি লুকিয়ানভ ভালদাই ইন্টারন্যাশনাল ডিসকাশন ক্লাবের গবেষণা পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত আছেন।