
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানের নেতাদের বহু বিষয়ে বড় মতপার্থক্য রয়েছে। এ মতপার্থক্যগুলো ইরানের পরমাণু প্রযুক্তি থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত বিষয় নিয়ে। তবে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি এক শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা মনে হচ্ছে বিশ্বাসের ঘাটতি।
যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে সর্বদাই সতর্ক থাকে ইরান। তবে ইরানের কর্মকর্তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই মূল বিশ্বাসঘাতক বলে মনে করেন। তাঁদের মনে আছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে হওয়া পরমাণু চুক্তির কথা। প্রায় দুই বছর আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের ওই চুক্তি নিজের প্রথম মেয়াদে বাতিল করে দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
ওই চুক্তি ইরান লঙ্ঘন করেছিল—এমন দাবি কখনো করেননি ট্রাম্প। আসলে চুক্তিটা তাঁর পছন্দ হয়নি। কয়েক বছর পর সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন তেহরানের সঙ্গে একই ধরনের একটি চুক্তি করতে চেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, তখন ইরানের নেতারা এই নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে ট্রাম্পের প্রশাসন আবার এই চুক্তি বাতিল করবে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সরকারের সে নিশ্চয়তা দেওয়ার কোনো উপায় ছিল না। আর গত বছরে দুইবার ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে ওই আলোচনা শুরু করাই হয়েছিল হামলা চালানোর জন্য। আলোচনাগুলো যখন একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, তখন ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর এক দিন বাদেই বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হয়। এরপর ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ চলে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেনেভা বৈঠকের আগেই যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিশ্বাস সব সময়ই কম ছিল। তবে এখন কোনো বিশ্বাসই নেই। ইরান বিশ্বাস করে, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারে—এমনকি আলোচনার মধ্যেও।করিম সাদজাদপুর, জ্যেষ্ঠ গবেষক, কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস
চলতি মাসের শুরুতে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দফা আলোচনা পাল্টাপাল্টি দোষারোপের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এরপর ইরানের কর্মকর্তারা জানান, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার প্রধান একটি কারণ হলো, তাঁদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি ওয়াশিংটন। ইরানি কর্মকর্তারা আবার একই কথা বলার পর মঙ্গলবার পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় যোগদানের বিষয়টি স্থগিত করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
গত সোমবার ইরানের বার্তা সংস্থা ইরান রিপাবলিক নিউজ এজেন্সির (ইরনা) খবরে বলা হয়, আগের দিন রোববার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ফোনালাপ হয়। সেখানে পেজেশকিয়ান সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার আগের ধারায় কাজ করতে চাইছে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাইছে।
আবার প্রতারিত হওয়ার ভয়ে ধাপে ধাপে সামনে এগোতে চাচ্ছে তেহরান। দর–কষাকষির ক্ষমতা ধরে রাখার ওপরও জোর দিচ্ছে। যেমন যত দিন সম্ভব নিজেদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অন্তত কিছুটা হলেও নিজেদের কাছে রাখতে চাইছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বিশ্বাসযোগ্য চুক্তির জন্য শেষ পর্যন্ত হয়তো তেহরানকে নিজেদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করতে হবে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর এক দিন বাদেই বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র।
এই অবিশ্বাস কিন্তু দ্বিমুখী। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য, নিজেদের পরমাণু প্রকল্প শুধু শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য—এমন দাবি করে বছরের পর বছর ধরে মিথ্যা বলে আসছে ইরান। সামরিক খাতে তেহরানের পরমাণু গবেষণার অতীত প্রমাণাদির দিকেও ইঙ্গিত করেছে ওয়াশিংটন। আর মাটির নিচে গোপন পরমাণু স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে ইরানও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনে জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তা ছিলেন মাইকেল ডোরান। তিনি বলেন, ইরান দশকের পর দশক ধরে তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বকে প্রতারিত করে আসছে, পরমাণু স্থাপনাগুলো লুকিয়ে রেখেছে, পরমাণু উপকরণ ও কার্যকলাপ গোপন করছে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে মিথ্যা বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তাই পরমাণু কর্মসূচির উদ্দেশ্য নিয়ে ইরানের দেওয়া আশ্বাসের ওপর আস্থা রাখার কোনো ভিত্তি নেই।
সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র নিয়ে আলোচনার সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান একটি বক্তব্যকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। সেটি হলো, ‘বিশ্বাস করো, তবে যাচাই করে নাও।’ এটা পরিষ্কার নয় যে ইরান ও ট্রাম্প প্রশাসন আদৌ সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারবে কি না।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক করিম সাদজাদপুর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিশ্বাস সব সময়ই কম ছিল। তবে এখন কোনো বিশ্বাসই নেই। ইরান বিশ্বাস করে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারে—এমনকি আলোচনার মধ্যেও। এ কাজ ট্রাম্প আগে দুইবার করেছেন। আর যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বিশ্বাস করবে না যে ইরান তাদের পরমাণু অস্ত্র তৈরির আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করবে, এমনকি তেহরান যদি ছাড় দিতে রাজি হয় তারপরও।
এরপরও ট্রাম্প ও ইরান—দুই পক্ষই কূটনীতিকে আরও একবার সুযোগ দিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। তবে দুই দেশের একটি চুক্তির রূপরেখা এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে কোনো পক্ষই বাড়তি সুবিধা নিয়ে সরে পড়ার সুযোগ না পায়। বারাক ওবামা ও জো বাইডেন প্রশাসনের সময় ইরানের সঙ্গে আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিলেন রবার্ট ম্যালি। তিনি বলেন, ‘এটি বেশ জটিল। কারণ, চুক্তির জন্য ইরানের কাছ থেকে যেসব ছাড় চাওয়া হবে তার বেশির ভাগই বাস্তবধর্মী ও অপরিবর্তনীয়। যেমন ইরানের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করা বা এর মাত্রা কমিয়ে ফেলা।’
রবার্ট ম্যালি আরও বলেন, এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইরানের প্রত্যাশিত ছাড়গুলোর বেশির ভাগই তাত্ত্বিক ও পরিবর্তনযোগ্য। যেমন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া বা আটকে রাখা অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া। এর ফলে ট্রাম্প চুক্তি মেনে চলছেন কি না, তা যাচাই করার জন্য ইরান যেকোনো চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরগতি এবং ধাপে ধাপে এগোনোর পদ্ধতি অনুসরণের ওপর জোর দেবে।
কিন্তু ট্রাম্প ধৈর্যশীল হিসেবে পরিচিত নন। তিনি এই পদ্ধতিতে অসম্মতি জানাতে পারেন। আর সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বারাক ওবামা আমলের পরমাণু চুক্তি থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার স্মৃতি। সেই চুক্তির অধীনে ইরান ১৫ বছরের জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয়েছিল। এর বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ছিল।
ওই চুক্তি করতে প্রায় ২০ মাস সময় লেগেছিল। চুক্তি নিয়ে রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে অসংখ্য আলোচনায় অংশ নিয়েছিল। সবাই একমত ছিল যে ইরান চুক্তি মেনে চলছে। তবে ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসে বসার পর হিসাব বদলে যায়। চুক্তিটিকে ‘বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করে ২০১৮ সালে ট্রাম্প তা থেকে সরে আসেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র নিয়ে আলোচনায় সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান একটি বক্তব্যকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। সেটি হলো, ‘বিশ্বাস করো, তবে যাচাই করে নাও।’
শুধু চুক্তি বাতিল নয়, ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ট্রাম্প। জবাবে তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির সীমা লঙ্ঘন করে এবং সামরিক মাত্রার কাছাকাছি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে। এর মাধ্যমে তারা পরমাণু বোমা তৈরির সক্ষমতার খুব কাছাকাছি নিয়ে যায়। এই অগ্রগতিকে গত জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প।
কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক করিম সাদজাদপুর বলেন, দুই দেশের অবিশ্বাসের গভীরতা এবং আলোচনার বিষয়বস্তুর সংবেদনশীলতার কারণে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বড় মাপের কোনো চুক্তি হওয়া খুবই অসম্ভব। সাধারণত এই ধরনের চুক্তিতে অনেক মাস, এমনকি বছরও লেগে যায়।