ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজ। ইসরায়েলের তেল আবিবের কাছে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজ। ইসরায়েলের তেল আবিবের কাছে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজে হামলা

সন্দেহভাজন সহকারী পাইলটের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আল-কায়েদা নেতার ছবি থাকার দাবি

ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজে গত বুধবার ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় সন্দেহভাজন সহকারী পাইলটকে উগ্র মতাদর্শের কারণে গত বছর ওমানের জাতীয় উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা ‘ওমান এয়ার’ থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে।

ওই দুটি সূত্র ও ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা বলেছেন, সন্দেহভাজন ওই সহকারী পাইলটের নাম হামাম আল-হাম্মামি। তিনি ওমানের নাগরিক। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও তাঁর নাম প্রকাশ করেছে। আল-হাম্মামি সংযুক্ত আরব আমিরাতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ওমান ও মা সিরিয়ার নাগরিক। কয়েক বছর তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছিলেন।

আল-হাম্মামির মুছে ফেলা লিংকডইন অ্যাকাউন্টে গত বুধবার দুটি পোস্ট দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার প্রায় ৯ ঘণ্টা পর অল্প সময়ের ব্যবধানে পোস্ট দুটি দেওয়া হয়। তবে কে পোস্ট দুটি করেছিলেন বা আগে থেকে এগুলো প্রকাশের সময় নির্ধারণ করা ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে হামাম আল-হাম্মামি নামের একটি অ্যাকাউন্টে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ওমান এয়ারে সাত বছর কাজ করেছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি তাঁকে চাকরিচ্যুত করে। একই বছরের জুনে তিনি মরক্কোর উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা রয়াল এয়ার মারকে যোগ দেন। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি সেখানেই কর্মরত ছিলেন। ওই অ্যাকাউন্টে ফ্লাইদুবাইয়ে কাজ করার কোনো তথ্য যুক্ত করা হয়নি।

দুটি সূত্রের একটি নিশ্চিত করেছে, অ্যাকাউন্টটি ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজে ক্যাপ্টেনের ওপর হামলাকারী সহকারী পাইলটের। হামলার ঘটনার পর অ্যাকাউন্টটি লিংকডইন থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে লিংকডইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সিএনএন।

দ্বিতীয় সূত্রটি একজন আঞ্চলিক কূটনীতিক। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘উগ্র মতাদর্শের’ কারণে সন্দেহভাজন ওই সহকারী পাইলটকে ফ্লাইট প্রশিক্ষণ থেকে বাদ দিয়েছিল ওমানের জাতীয় উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা। পরে তাঁকে অন্য একটি দায়িত্ব দেওয়া হয়।

গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, সন্দেহভাজন সহকারী পাইলট ‘ইসলামি উগ্র মতাদর্শে দীক্ষা’ নিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট ইসরায়েলি কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, হাম্মামি ফ্লাইদুবাইয়ে মাত্র আট মাস কাজ করেছেন। তিনি এর আগে রয়াল এয়ার মারকে কাজ করেন বলে নিশ্চিত করেছে অন্য একটি সূত্র।

তবে ঘটনার তদন্ত চলায় ফ্লাইদুবাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

আল-হাম্মামির মুছে ফেলা লিংকডইন অ্যাকাউন্টে গত বুধবার দুটি পোস্ট দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার প্রায় ৯ ঘণ্টা পর অল্প সময়ের ব্যবধানে পোস্ট দুটি দেওয়া হয়। তবে কে পোস্ট দুটি করেছিলেন বা আগে থেকে এগুলো প্রকাশের সময় নির্ধারণ করা ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

প্রথম পোস্টে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজের ককপিটে ধারণ করা কয়েকটি ভিডিও ছিল। বুধবার ইসরায়েলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের যে উড়োজাহাজটি হামলার মুখে পড়েছিল, সেটিও ছিল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮।

ভিডিওর শেষ অংশে আল-কায়েদার সাবেক নেতা ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর সংগঠনটির নেতৃত্ব দেওয়া আয়মান আল-জাওয়াহিরির ছবি ছিল। সেখানে ২০০৯ সালে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে নয়জনকে হত্যা করা হুমাম খলিল আবু-মুলাল আল-বালাওয়ির ছবিও ছিল।

ভিডিওর একটি অংশ দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বলে শনাক্ত করেছে সিএনএন। সেখানে ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তি ইসরায়েলি উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা এল আলের একটি উড়োজাহাজের দিকে ক্যামেরা তাক করেন।

ভিডিওতে ককপিটের পর্দায় ফ্লাইট নম্বর ওএমএ৬২৪ এবং ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর তারিখ দেখা যায়। ওই ফ্লাইট নম্বর সাধারণত দুবাই থেকে ওমানের রাজধানী মাসকাটের পথে চলাচলকারী একটি ফ্লাইটের। আর তারিখটি আল-হাম্মামি ওমান এয়ারে কাজ করার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়।

ভিডিওটির অন্য অংশে এল আলের আরও কয়েকটি উড়োজাহাজ এবং ইসরায়েলের আরেকটি উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা আর্কিয়ার একটি উড়োজাহাজ দেখা যায়।

ভিডিওর শেষ অংশে আল-কায়েদার সাবেক নেতা ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর সংগঠনটির নেতৃত্ব দেওয়া আয়মান আল-জাওয়াহিরির ছবি ছিল। সেখানে ২০০৯ সালে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে নয়জনকে হত্যা করা হুমাম খলিল আবু-মুলাল আল-বালাওয়ির ছবিও ছিল। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সাতজন ছিলেন মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর কর্মকর্তা ও ঠিকাদার। আল-বালাওয়ি আল-কায়েদার অনুগত ছিলেন।

হামলার শিকার ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার

দ্বিতীয় পোস্টটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ছবি। এতে তিন পবিত্র স্থান মক্কা, মদিনা ও জেরুজালেম একটি আলোকিত রেখার মাধ্যমে যুক্ত করে দেখানো হয়। পেছনে একটি কবিতা আবৃত্তি করা হচ্ছিল। এতে অপমান মেনে না নেওয়া, মৃত্যুকে ভয় না পাওয়া ও নিজের মর্যাদা রক্ষার কথা বলা হয়।

আল-হাম্মামির লিংকডইন প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ইংল্যান্ডের বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র সিএনএনকে নিশ্চিত করেছে যে, আল-হাম্মামি নামের ওই ব্যক্তি সেখানে তিন বছরের একটি দূরশিখন কোর্স সম্পন্ন করেছেন। পরে ২০২৩ সালে উড়োজাহাজ পরিবহন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

একই সময় ওই দুটি ভিডিও ইনস্টাগ্রামে একই নামের অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছিল। ওই অ্যাকাউন্টও পরে মুছে ফেলা হয়। সিএনএন এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ইনস্টাগ্রামের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

হামাম আল-হাম্মামির মুছে ফেলা এক্স অ্যাকাউন্টের একটি বিশদ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে সিএনএন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) বিশেষ সার্চ মডেলের মাধ্যমে তাঁর প্রায় ৩ হাজার ডিলিট হওয়া পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আল-হাম্মামি ‘কট্টর ধর্মীয়’ ও ‘চরম নারীবিদ্বেষী’ মানসিকতার ছিলেন।

ওমানের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনীতিক সম্পর্ক নেই। ইসরায়েলের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ওমানের একজন নাগরিক কীভাবে তেল আবিবগামী একটি ফ্লাইটের পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পেলেন, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে।

বুধবার ইসরায়েলের একজন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, ওমানের ওই পাইলট কীভাবে ককপিটে বসার অনুমতি পেলেন, তা খতিয়ে দেখতে ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত, গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ, সামরিক বাহিনী ও পরিবহন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু করেছে।

অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) অ্যাটর্নি জেনারেল এ হামলার পেছনে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ছিল কি না, খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছেন। উড়োজাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিবন্ধিত হওয়ায় আইন অনুযায়ী তাদের ভূখণ্ডের বাইরে ঘটা এ অপরাধের তদন্ত করার পূর্ণ আইনি অধিকার তাদের রয়েছে।

নেতানিয়াহু সিএনএনের সাংবাদিক জিম স্কিউটোর সঙ্গে বুধবার রাতে কথা বলার সময় বলেন, উড়োজাহাজটি সৌদি আরবে জরুরি অবতরণের পর সন্দেহভাজন সহকারী পাইলটকে সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ইসরায়েলও ওই জিজ্ঞাসাবাদে যুক্ত হয়েছে।

নেতানিয়াহু বলেন, এ বিষয়ে আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং ইসরায়েলকে জিজ্ঞাসাবাদে যুক্ত করার বিষয়ে তিনি সম্মতি দিয়েছেন।