
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরতে ও ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প ধ্বংস করতে একসঙ্গে যুদ্ধে নেমেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো সংগঠনের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করা এবং দেশটিতে সরকার পতনের পরিবেশ তৈরি করাও। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর ১০০ দিন পার হওয়ার পর গত রোববার ইরানবিরোধী সেই মার্কিন-ইসরায়েল জোটের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হিজবুল্লাহর লাগাতার হামলায় ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল এখন বিপর্যস্ত। এর জবাবে বৈরুতে হিজবুল্লাহর ঘাঁটি দাহিয়েহ এলাকায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। তবে এই হামলা ছিল মূলত নামমাত্র বা লোকদেখানো। বলা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের আপত্তি থাকলেও তাদের আগে থেকে কিছু না জানিয়েই এই অভিযান চালায় ইসরায়েল।
ইরান আগে থেকেই পাল্টা ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিল। সেই অনুযায়ী তারা ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে প্রায় ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে হামলার মুখে ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা আবারও প্রাণভয়ে ‘বোম্ব শেল্টারে’ আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পাল্টা ‘কঠোর জবাব’ দেওয়ার প্রস্তুতি নেয় ইসরায়েল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই প্রস্তুতির কথা জানান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলকে এই সিদ্ধান্ত আবারও ভেবে দেখার নির্দেশ দেন।
এমনকি নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলার আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নিজের প্রিয় ইসরায়েলি সাংবাদিক বারাক রাভিদকে বলেন, ইসরায়েলের এখন আর পাল্টা হামলা চালানো উচিত হবে না। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এখনই বিবিকে (নেতানিয়াহু) কল করছি। তাঁকে বলব, তিনি যেন প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নেন।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘উভয় পক্ষই যথেষ্ট করেছে। ইসরায়েল যেমন হামলা চালিয়েছে, ইরানও তার জবাব দিয়েছে। আমাদের এখন আর নতুন কোনো সংঘাতের প্রয়োজন নেই।’
নেতানিয়াহুই তাঁকে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছেন—এমন দাবি ট্রাম্প বারবার অস্বীকার করে আসছেন। তবে তিনি এখন এটা স্পষ্ট করেছেন যে, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ছাড়াই শুরু করা এই সামরিক অভিযান তিনি দ্রুত শেষ করতে চান। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর একটিও এখন পর্যন্ত অর্জিত হয়নি।
ট্রাম্প এখনো জোর দিচ্ছেন যে, ইরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তেমন শর্তের জন্যই তিনি অপেক্ষা করছেন। তবে তাঁর প্রক্রিয়াধীন সমঝোতা স্মারকের ফাঁস হওয়া খসড়ায় তেমন কোনো নিশ্চয়তা দেখা যায়নি। এখন ট্রাম্পের প্রধান অগ্রাধিকার হলো হরমুজ প্রণালিটি আবারও নিরাপদভাবে খুলে দেওয়া। এর মাধ্যমে তেহরানের তৈরি করা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট প্রশমিত চান তিনি।
ইরান যখন ইসরায়েলের উত্তরে হামলা চালাচ্ছিল, তখনও ট্রাম্প দাবি করছিলেন যে তিনি একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি আছেন। একগুঁয়ে ও প্রতারক হিসেবে পরিচিত এই শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তি প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি বলব আগামী সপ্তাহের সোম, মঙ্গল বা বুধবারের মধ্যেই একটি চুক্তি সই হতে পারত।’ বিরক্তি প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, ‘এর মধ্যেই আবার এখন এসব (পাল্টাপাল্টি হামলা) ঘটছে।’
ট্রাম্পের ‘পাল্টা হামলা না করার’ এই নির্দেশ নেতানিয়াহুকে এক চরম দোটানায় ফেলে। তিনি চাইলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই নির্দেশ মেনে নিয়ে হামলা থেকে বিরত থাকতে পারতেন। তবে এতে বিজয়োল্লাসে মত্ত তেহরানের সামনে ইসরায়েলের প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষুন্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন সিদ্ধান্ত পুরো মধ্যপ্রাচ্যের কাছে ইসরায়েলকে একটি দুর্বল দেশ হিসেবে পরিচিতি দেবে এবং দেশটির সার্বভৌমত্বকেও ক্ষুণ্ণ করবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এমন পদক্ষেপ নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভিত্তিকেও নড়বড়ে করে দিতে পারে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু চাইলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অমান্য করতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হওয়া প্রায় নিশ্চিত। আর সেই লড়াইয়ে ইসরায়েলকে সম্ভবত একেবারেই একা হয়ে পড়তে হতে পারে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, ইরান কি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী হয়ে উঠেছে যে তারা এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত চাল চালবে, যিনি স্পষ্টভাবে একটি সমঝোতা চাইছেন? অর্থাৎ, ইরান কি ট্রাম্পকে এতটাই হতাশ করতে পারে যা তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে সেই সামরিক অভিযান পুনরুজ্জীবিত করতে বাধ্য করবে, যা না করার জন্য তিনি নেতানিয়াহুকে নির্দেশ দিয়েছিলেন?
অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড বলছে, ইরান এমন ভুল করার মতো বোকা নয়। তারা আসলে অনেক চতুর। ফলে পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, এক প্রতারক ইরানের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অনেকটা অনুনয় করছেন। আর এর মাঝখানে পড়ে গেছে ইসরায়েল।
গত রোববার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া অন্য এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, তেহরানের সঙ্গে যদি কোনো চুক্তি না হয়, তবে তিনি হয়তো বাকি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা করবেন। অথবা বর্তমানে যে অবরোধ চলছে, সেটি বজায় রাখবেন।
তবে একটি বিষয়ে ট্রাম্পকে নিশ্চিত মনে হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে যে ধরনের চুক্তিই তিনি করবেন, নেতানিয়াহুকে তা মেনে নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিবির (নেতানিয়াহু) সামনে আসলে কোনো বিকল্প থাকবে না। সব সিদ্ধান্ত আমিই নিই।’
তবে ইরানে নয়, সেখানে ট্রাম্পের সেই নিয়ন্ত্রণ নেই।