
ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে গতকাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের চারটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরাকে একটি মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে উড়োজাহাজে থাকা ছয়জন ক্রুর সবাই নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গতকাল শুক্রবার বিষয়টি জানিয়ে দাবি করেছে, ‘শত্রুপক্ষ বা মিত্রপক্ষের গুলিতে’ উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়নি। তবে ইরাকের ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স নামের একটি গোষ্ঠী দাবি করেছে, তারা উড়োজাহাজটি ভূপাতিত করেছে।
গতকাল যুদ্ধের ১৪তম দিনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন শহরে হামলা চালিয়েছে। পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। সৌদি আরব, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও (ইউএই) হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজে গতকাল প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আগামী সপ্তাহে ইরানে ‘আরও কঠোর’ হামলা চালাতে যাচ্ছে। এই সাক্ষাৎকার প্রচারের কয়েক ঘণ্টা আগে রাশিয়ার তেল বিক্রির ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সিদ্ধান্তে রাশিয়া লাভবান হবে বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ইউরোপের নেতারা।
■আগামী সপ্তাহে ইরানে আরও কঠোর হামলা চালানোর হুমকি ট্রাম্পের। ■ আল কুদস দিবসে তেহরানে সমাবেশে ইরানের প্রেসিডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। ■ রাশিয়ার তেল বিক্রির নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রের।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গতকাল ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আর্লিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তাঁরা শুক্রবার (গতকাল) ইরানে সবচেয়ে বড় হামলা চালাতে যাচ্ছেন। একই সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, মার্কিন বাহিনী ইরানের মাইন বসানোর সক্ষমতা ধ্বংস করা অব্যাহত রেখেছে।
সেন্টকম গতকাল বিবৃতি দিয়ে জানায়, অপারেশন এপিক ফিউরি চলাকালে বন্ধুপ্রতিম একটি দেশের আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের কেসি-১৩৫ মডেলের জ্বালানি সরবরাহকারী (রিফুয়েলিং) একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে। প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, কোনো ‘শত্রুপক্ষ বা মিত্রপক্ষের গুলিতে’ উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়নি। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে। দুর্ঘটনার সময় সেখানে আরেকটি উড়োজাহাজ ছিল। সেটি নিরাপদে অবতরণ করেছে।
ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থী গোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স দাবি করেছে, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে তারা ‘উপযুক্ত অস্ত্র’ ব্যবহার করে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি কেসি-১৩৫ উড়োজাহাজ ভূপাতিত করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন–ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে এ পর্যন্ত চারটি মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হলো। যুদ্ধের শুরুর দিকে কুয়েতে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। কুয়েতের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ভুলে যুদ্ধবিমানগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে ওই বিমানগুলোর সব ক্রু সদস্য নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন।
এদিকে দ্য গার্ডিয়ান–এর তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর গতকাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ১৩ জন মার্কিন বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত দেড় শ জন।
গতকাল ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ জানিয়েছেন, ইরাকের কুর্দিস্তানে গত বৃহস্পতিবার হামলার ঘটনায় এক ফরাসি সেনা নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। তিনি এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেন।
কুর্দিস্তানের একই স্থানে বৃহস্পতিবার ইতালি ও যুক্তরাজ্যের সেনাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় নিজেদের সব সেনাসদস্যকে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইতালি।
গতকাল সকাল থেকে ইরানের রাজধানীসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে তেহরানে আল কুদস দিবসের সমাবেশের কাছে এক নারী নিহত হওয়ার পাশাপাশি রাজধানীর হাফত চেনার এলাকায় আরও ২ জন নিহত ও ১০ জন আহত হন। ইসরায়েল বলেছে, তারা শুক্রবার ইরানের ২০০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে পেন্টাগন বলেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ইরানের ১৫ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
আল-জাজিরা জানিয়েছে, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে ২ হাজার ২০০ মেরিন সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তা ছাড়া ইরানের ড্রোন মোকাবিলায় অঞ্চলটিতে ১০ হাজার ইন্টারসেপ্টর বা ‘শত্রু ড্রোন ধ্বংসকারী’ ড্রোন পাঠানোর কথা জানিয়েছেন মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা।
অন্যদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ও দেশটির জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানির তথ্য চেয়ে এক কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় দেশটিতে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৮ হাজার ৫৫১ জন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, দেশটিতে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ৩২ লাখ মানুষ। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় দেশটির প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।
গতকাল ইসরায়েলের একটি সামরিক ঘাঁটিসহ বিভিন্ন নিশানায় কয়েক দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। গতকাল ভোরে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ৫০ জন আহত হন। ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধে এ পর্যন্ত ইসরায়েলে অন্তত ১৫ জন নিহত ও ২ হাজার ৯৭৫ জন আহত হয়েছেন।
২ মার্চ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে লেবাননে তীব্র হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। গতকাল সকালে বৈরুতে হিজবুল্লাহর এক ‘সদস্যকে’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তারা। চলমান যুদ্ধে দেশটিতে এ পর্যন্ত অন্তত ৭৭৩ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননের জনগণের প্রতি সংহতি জানাতে গতকাল জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বৈরুত সফর করেন।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ন্যাটোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তুরস্কের আকাশসীমায় ইরান থেকে ছোড়া তৃতীয় একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
গতকাল সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। ওমানে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুজন বিদেশি নাগরিক নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। সৌদি আরব জানিয়েছে, গতকাল তারা অন্তত ৫৬টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। এর মধ্যে একটি ড্রোন রাজধানী রিয়াদের কঠোর নিরাপত্তাসম্পন্ন কূটনৈতিক এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। আমিরাত গতকাল অন্তত ৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৭টি ইরানি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে গতকাল ‘আল কুদস দিবস’ উপলক্ষে ইরানের ছোট-বড় সব শহরে সমাবেশ ও মিছিল হয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশটির খোররামাবাদ, ইসফাহান, গোলেস্তান, ইয়াজদ, মাশহাদ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাহেদান শহরে লাখো মানুষ পতাকা হাতে সমাবেশে অংশ নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মধ্যে তেহরানের বৃষ্টিস্নাত রাস্তায় প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেন মহসেনি এজেয়ি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কুদস দিবসে অংশ নিতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, তেহরানের সমাবেশ থেকে সামান্য দূরে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এতে অন্তত একজন নারী নিহত হয়েছেন। লারিজানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ভীতি ও হতাশা থেকে (যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল) এসব হামলা করা হচ্ছে। যে শক্তিশালী, সে কখনো গণবিক্ষোভে বোমা হামলা করত না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারির যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রথম দিন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হওয়ার পর গতকাল দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে সমাবেশে অংশ নেন। ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার রক্ষায় ১৯৭৯ সাল থেকে পবিত্র রমজানের শেষ শুক্রবারে মুসলিম বিশ্বে আল কুদস দিবস পালিত হয়ে আসছে।