যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

খামেনিকে হত্যার পরও ইরানে কি সরকার বদল হবে, মার্কিন কর্মকর্তাদের হতাশা কী ইঙ্গিত দিচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় গত শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে হত্যার পরও অনেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা সন্দিহান, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে দুই দেশের যৌথ সামরিক অভিযানে আদৌ শাসনগোষ্ঠীর পরিবর্তন হবে কি না।

ইরানে আগ্রাসন শুরুর আগে ও পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নস্যাৎ করে দেওয়ার পাশাপাশি দেশটির শাসনগোষ্ঠীকে সরিয়ে দেওয়াও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য।

ট্রাম্প গতকাল রোববার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় ইরানি জনগণকে উসকানি দিয়ে বলেন, ‘আমি সেসব ইরানি দেশপ্রেমিকদের আহ্বান জানাই, যাঁরা স্বাধীনতার জন্য আকুল হয়ে আছেন...এই মুহূর্তটিকে কাজে লাগান এবং আপনাদের দেশকে ফিরিয়ে নিন।’

তবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে পরিচিত তিনজন কর্মকর্তা বলেন, ১৯৭৯ সাল থেকে চলে আসা এই ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে ইরানের বিপর্যস্ত বিরোধী দলগুলো হটিয়ে দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স যেসব মার্কিন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে, তাঁদের কেউ অবশ্য ইরানের বর্তমান সরকারের পতনের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেননি। বর্তমান সরকার চলমান মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হারিয়ে বেশ চাপে আছে। গত জানুয়ারিতে কঠোর হাতে আন্দোলন দমন করতে গিয়ে জনগণের কাছেও তারা গভীরভাবে অপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, অদূর ভবিষ্যতে এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম।

এর আগে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরানে হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে হোয়াইট হাউসে জমা দেওয়া সিআইএর মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনি নিহত হলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কোনো নেতা অথবা সমমনা কোনো ধর্মীয় নেতা।

হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে জানেন, এমন একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, আইআরজিসি কর্মকর্তারা সম্ভবত স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করবেন না। এর অন্যতম কারণ, তাঁরা বিশাল এক সুবিধাভোগী নেটওয়ার্কের অংশ, যা অভ্যন্তরীণ আনুগত্য বজায় রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

অন্য একটি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সিআইএ এই মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল, গত জানুয়ারিতে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী যখন সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ করেছিল, তখন আইআরজিসির কোনো সদস্য দল ছেড়ে যাননি।

অন্য আরও তিনটি সূত্রের মতে, যেকোনো সফল বিপ্লবের পূর্বশর্ত হচ্ছে এ ধরনের দলত্যাগ। তবে সূত্রগুলো ওই নির্দিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাটির নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছে। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলার সময় সব সূত্রই গোয়েন্দা মূল্যায়নের বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে নিজেদের নাম গোপন রাখতে চেয়েছেন।

ট্রাম্প নিজেই গতকাল বলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে আবার যোগাযোগ শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। তাঁর এই কথা-ই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওয়াশিংটন অন্তত শিগগিরই বর্তমান সরকারের পতন দেখছে না। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি। সিআইএও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

ইরানের হামলার পর জেবেল আলী বন্দর থেকে উড়ছে ধোঁয়া। দু্বাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ১ মার্চ ২০২৬

প্রচুর বিতর্ক, ঐকমত্য কম

গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, বিচার বিভাগের প্রধান, গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন সদস্য এবং তিনি—এই তিনজনকে নিয়ে গঠিত ‘পরিচালনা পর্ষদ’ সাময়িকভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে লুণ্ঠন ও বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টার অভিযোগ এনেছেন। দুই দেশ ইরানে আগ্রাসন চালানোর পর তিনি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে’ কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের এই প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

ইসরায়েল ইরানের মেয়েদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও বোমা মেরেছে, যাতে দেড় শ-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি হত্যার প্রভাব নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার আলোচনা কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খামেনিকে হত্যার প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে গত জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক চলছে, তবে কোনো ঐকমত্য হয়নি। বিতর্কটি ছিল এমন, খামেনিকে হত্যা করা হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ধরনে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসবে কি না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, খামেনির মৃত্যু বা অপসারণ ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক স্থাপনা ও সক্ষমতা পুনর্গঠন থেকে কতটা বিরত রাখবে, তা নিয়েও বিতর্ক চলছে।

গত জানুয়ারিতে ইরানে বিক্ষোভের পর ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিভ উইটকফ দেশটির শেষ শাহের নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভির সঙ্গে বেশ কয়েকবার কথা বলেছেন। মার্কিন দূতের এই উদ্যোগ প্রশ্ন তুলেছে, ইরানে সরকারের পতন হলে ট্রাম্প প্রশাসন তাঁকে ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে কতটা সমর্থন দেবে।

তবে জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা গত কয়েক সপ্তাহে ক্রমেই হতাশ হয়ে উঠছেন। তাঁরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন–সমর্থিত কোনো বিরোধী নেতার পক্ষে বাস্তবে ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের সদস্য এবং সাবেক পদস্থ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা বন্ধের পর যদি শেষ পর্যন্ত ইরানি জনগণ রাস্তায় নেমে আসেন, তবে তাদের সাফল্য নির্ভর করবে নিরাপত্তা বাহিনীর সাধারণ সদস্যদের ওপর। তারা কি জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, নাকি জনগণের সঙ্গে যোগ দেবে, সেটা দেখার বিষয়।’

প্যানিকফ আরও বন, ‘অন্যথায় যাদের হাতে অস্ত্র আছে, শাসকগোষ্ঠীর সেই বাকি অংশ ক্ষমতা ধরে রাখতে সেই অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।’