অনেক ইসরায়েলি এখন দেশ ছাড়তে চাইছেন, উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা

বিচার বিভাগের ক্ষমতা হ্রাসে সরকারের নেওয়া আইন সংস্কারের উদ্যোগের প্রতিবাদে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ চলছে ইসরায়েলে
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের বিচার বিভাগের ক্ষমতা কমাতে আইন সংস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। এর প্রতিবাদে প্রতি সপ্তাহে হাজার হাজার ইসরায়েলি বিক্ষোভ করছেন। এই পরিস্থিতিতে নাগরিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন এক প্রবণতা। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে উঠে এসেছে, ইসরায়েলের প্রতি তিনজনের একজন নাগরিক দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন।

দেশ ছাড়তে চান, এমন একজন ইসরায়েলি অধ্যাপক চেন হফম্যান। গত শনিবার রাতে তেল আবিবে যে বিক্ষোভ হয়েছে, তাতে হফম্যানও অংশ নিয়েছিলেন। সেখানেই এই চিকিৎসক বলেন, ‘রাস্তায় গিয়ে বিক্ষোভ করা আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে না। কিন্তু আমরা এটা করতে বাধ্য হচ্ছি; কারণ, আমাদের দেশকে আমরা হারিয়ে ফেলছি। আমাদের কাছে বিষয়টা এখন এমনই মনে হয়।’

চিকিৎসক হিসেবে ইসরায়েলে বিশেষ খ্যাতি আছে হফম্যানের। তিনি এখন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। যুক্তরাজ্যের একটি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে তাঁর যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও বিদেশ যেতে উৎসাহিত করছেন।

বিক্ষোভকারীরা বলছেন, বিচার বিভাগের ক্ষমতা হ্রাস করা মানে তাঁদের নাগরিক অধিকার আরও বিপন্ন হওয়া

কেন বিদেশে স্থায়ী হতে চাইছেন, এর ব্যাখ্যায় হফম্যান বললেন, ‘কয়েক বছরের ছুটি নিয়ে আমি লন্ডন যাচ্ছি। এর মাধ্যমে আমি মূলত দেখতে চাইছি, বিদেশে থাকতে পারব কি না। যদি দেখি যে (ইসরায়েলে) পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে, তাহলে আর ফিরব না। কোথাও জায়গা খুঁজে নেব।’

বিক্ষোভকারীরা বলছেন, ইসরায়েলে বিচার বিভাগে সংস্কার আনতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে করে দেশটির গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়বে। তবে দেশটির কট্টর ডানপন্থী বর্তমান সরকারের দাবি, এতে করে বিচার বিভাগের সঙ্গে আইন বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে। কারণ, বিদ্যমান আইনে পার্লামেন্টের যেকোনো সিদ্ধান্ত চাইলে সুপ্রিম কোর্ট বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

তবে বিক্ষোভকারীদের কারও কারও ধারণা, বিচার বিভাগের ক্ষমতা কমিয়ে যে আইন পাস হয়েছে এবং আরও যেসব সংস্কার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা থেকে পিছু হটবে সরকার। তবে বেশির ভাগই এমনটা ভাবছেন না। এ জন্যই বিক্ষোভকারীদের বড় অংশ দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথাই ভাবছে।

বিচার বিভাগের ক্ষমতা কমাতে সরকারের নেওয়া সংস্কার পরিকল্পনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে আসছেন সারাহ। এই নারী বললেন, ‘এটা (দেশ ছেড়ে যাওয়া) আমার জন্য হবে হৃদয়বিদারক এক ব্যাপার। কিন্তু আমি এমন দেশে সন্তানদের লালন-পালন করতে চাই না, যেখানে গণতন্ত্র নেই।’

ইসরায়েলের অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক মাস ধরে ইসরায়েলিদের মধ্যে দেশান্তরি হওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। তাঁরা বলছেন, বিচার বিভাগের সংস্কারে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া ইসরায়েলিদের মধ্যে দেশ ছাড়ার মানসিকতা বাড়িয়েছে।

ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

অভিবাসন নিয়ে কাজ করা ইসরায়েলের অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান ওশান রিলোকেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাই ওবাজানেকের কথায় তার প্রমাণ মিলল। তিনি বললেন, ‘বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে তথ্য চেয়ে খোঁজ নেওয়ার ঘটনা নাটকীয়ভাবে বাড়তে দেখছি আমরা। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি জানতে চেয়ে খোঁজ বেড়েছে, সেটি হলো আমরা দেশ ছাড়তে চাই, কীভাবে এ প্রক্রিয়া শুরু করব? এ ছাড়া যাঁদের কাছে অন্য দেশের পাসপোর্ট আছে, তাঁরাও এ বিষয়ে পরামর্শ চাইছেন।’

পর্তুগালভিত্তিক অভিবাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ রুথ নেভো। এত দিন ইসরায়েলি কোনো গ্রাহক পাননি তিনি। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো ইসরায়েলি গ্রাহক পাওয়া নিয়ে রুথ নেভো বললেন, ‘বছরের পর বছর যেখানে একজন গ্রাহকও ছিল না, এখন সেখানে প্রতিদিন ২৫ জন গ্রাহক পাচ্ছি। গ্রাহকদের বেশির ভাগই উচ্চশিক্ষিত। যাঁদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়েছে, সবাই বলেন, হচ্ছেটা কী।’

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেশটির সমাজে যে বড় ধরনের বিভাজন রয়েছে, তা প্রকাশ্যে এনেছে। এতে জনমিতি পরিবর্তনের সতর্কসংকেত বেজেছে। বর্তমান সরকার উগ্র ডানপন্থী ইহুদি ও ইহুদি জাতীয়তাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে। যারা সামাজিকভাবে রক্ষণশীল। জন্মহার বেশি হওয়ায় ইসরায়েলে এই রক্ষণশীল নাগরিকদের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে।

অপর দিকে ইসরায়েলে উদারবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত জনসংখ্যা ক্রমে কমছে। কারণ, এসব নাগরিক তাঁদের উদারপন্থী জীবনযাপনের স্বাধীনতায় ক্ষমতাসীনদের হুমকি মনে করছেন। বর্তমানে তাঁদের ভয়, বিচার বিভাগও আর তাঁদের নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে পারবে না।

বিক্ষোভ দমনে বলপ্রয়োগের পথে হেঁটেছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন সরকার। এই সরকারকে ইসরায়েলে এযাবৎকালে সবচেয়ে ডানপন্থী সরকার বলা হচ্ছে

তেল আবিব ইউনিভার্সিটির পাবলিক পলিসি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যালন তাল বলছেন, এভাবে যদি দলে দলে ইসরায়েলি দেশ ছাড়তে থাকেন, তাহলে এর পরিণতি হবে বিধ্বংসী। নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো খাতগুলোয়।

অধ্যাপক অ্যালন বলেন, যাঁদের হাত ধরে ইসরায়েলের উদ্ভাবন খাত ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে, সেই সত্যিকারের মেধাবীদের ওপর দেশটির নির্ভরতা অনেক বেশি। যখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে অনেক হয়েছে আর নয়, দেশ ছাড়তে হবে, তখন বুঝতে হবে অর্থনৈতিক বিপর্যয় আসছে।