বাহরাইনের মানামায় ইরানের হামলার পর ধোঁয়া উড়ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বাহরাইনের মানামায় ইরানের হামলার পর ধোঁয়া উড়ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ইরান যুদ্ধ কি উপসাগরীয় অঞ্চলকে পুরোপুরি পাল্টে দেবে

বার্তা সংস্থার রয়টার্সের গালফ দলের সদস্যরা তাঁদের অন্য প্রতিবেশীদের মতো এখন সিঁড়িতে অথবা জানালাহীন শৌচাগারে গাদাগাদি করে লুকিয়ে থাকছেন। তাঁদের বাড়ির ওপর দিয়ে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে। কেউ কেউ ভীত শিশুদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন, কেউ কেউ বিদেশ থেকে উদ্বিগ্ন স্বজন–বন্ধুদের পাঠানো বার্তা সামাল দিচ্ছেন।

আমরা এখন নতুন কিছু বিষয়ে সতর্ক হয়ে উঠেছি। যেমন কোন জানালাটা ফেটে যেতে পারে, কঠিন সময়ে মুরগি বা কলার মতো দৈনন্দিন খাদ্যপণ্য কোথায় খুঁজে পাওয়া যায় এবং প্রতিটি শব্দ—এমনকি প্রতিবেশীর আলমারি বন্ধ করার আওয়াজও বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিতে পারে।

এই অঞ্চলে নতুন করে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা আকাশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পালানোর একমাত্র উপায়, দীর্ঘ মরুভূমি পাড়ি দেওয়া, ইরান যেসব অঞ্চলে হামলা করছে তার ভেতর দিয়ে যাওয়া। আমরা সবাই একটি অসম্ভব প্রশ্নের মুখোমুখি: থেকে যাওয়া, নাকি চলে যাওয়া, এবং চলে যেতে চাইলে তা কীভাবে?

ইরানের হামলার পর জেবেল আলী বন্দর থেকে উড়ছে ধোঁয়া। দু্বাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ১ মার্চ ২০২৬

দুবাই আমাদের ফাইন্যান্স টিমের সদস্য ফেডেরিকো ম্যাকিওনি বলেছেন, ‘এই শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রথমবারের মতো তাঁর মনে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তবে আমাদের আবুধাবির প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক রচনা উপ্পাল বলেছেন, সেখানে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলতে দেখে তাঁকে তাজ্জব লাগছে—মানুষজন কেনাকাটা করছে, দাঁতের ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছে এবং এমনকি জেটস্কি চালাচ্ছে।’

এদিকে, সাংবাদিক হিসেবে আমরা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে গিয়ে আমরা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি। এই সপ্তাহের ‘গালফ কারেন্টস’এ বলা হয়েছে, ইরানের ড্রোনগুলো অব্যাহত আক্রমণ চালাচ্ছে—উপসাগরের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে বিমানবন্দর, হোটেল এবং ডেটা সেন্টারগুলোয় আঘাত হানাছে।

পর্যটন মুখ থুবড়ে পড়েছে, ব্যবসাকেন্দ্রগুলো পঙ্গু হয়ে আছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা চেষ্টা হঠাৎ করে চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে।

আমাদের ব্রিফিংয়ে অর্থনৈতিক ধাক্কা, কৌশলগত স্বার্থ এবং এই যুদ্ধ কী কী স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাহরাইনের রাজধানী মানামার ক্রাউন প্লাজা হোটেল। ১ মার্চ, ২০২৬

এ যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের মূলভিত্তির পরীক্ষা নিচ্ছে

কয়েক দশক ধরে, উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্থান হয়েছে দুটি মূল ধারণার ওপর নির্ভর করে। প্রথম ধারণাটি হচ্ছে, অস্থির এক অঞ্চলে তাদের শহরগুলো নিরাপদ আশ্রয়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি রপ্তানি থেকে পাওয়া বিপুল সম্পদ আসতেই থাকা।

কিন্তু এই সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ একসঙ্গে দুটো ধারণাকেই  নাড়িয়ে দিয়েছে এবং তা সম্ভবত স্থায়ীভাবে।

উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপদ আশ্রয়—এ ধারণা প্রথমেই ভেঙে পড়েছে। সহিংসতা সংকুল মধ্যপ্রাচ্যে এই নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিল দুবাই। সেই দুবাইয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কয়েক দিন ধরে বিমানবন্দর, বন্দর এবং বিলাসবহুল স্থাপত্যগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালাচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মেদ বিন জায়েদ গত সোমবার সন্ধ্যায় দুবাই মলে হেঁটে বেড়িয়েছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, তাঁর দেশে ব্যবসা আগের মতোই চলছে। কিন্তু উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ, পুঁজিবাজার বন্ধ, আতঙ্কিত বাসিন্দারা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কেনাকাটা করছিলেন। আর পুরোটা সময় আকাশছোঁয় অট্টালিকার এই নগরে আকাশ কেঁপে উঠছিল যুদ্ধের শব্দে।

এর মানসিক আঘাত দুবাই, আবুধাবি এবং রিয়াদের মতো শহরগুলো নিয়ে মানুষের মনে সংশয় দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তার আশ্বাস, স্বচ্ছন্দ যাতায়াত এবং ভালো ধারণার জোরে জনপ্রিয় এই শহরগুলো আঞ্চলিক অস্থিরতার কাছে হঠাৎ দুর্বল প্রমাণিত হচ্ছে। প্রশ্ন জেগেছে, শহরগুলো কি তাদের উচ্চমানের জীবনযাপনের প্রতিশ্রুতির আকর্ষণ ধরে রাখতে পারবে।

দুবাইয়ের আকাশে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের ঝলকানি। ১ মার্চ ২০২৬

অর্থনীতিতে ধস ও অস্থিতিশীলতা

দ্বিতীয় ধস অর্থনৈতিক, এবং এখন পর্যন্ত তা বেশ গভীর।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কাতারএনার্জির এলএনজি কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যাওয়ায় এমন একটি আকস্মিক সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা আগে অকল্পনীয় ছিল।

কাতারএনার্জি বিশ্বের মোট এলএনজির এক–পঞ্চমাংশের সরবরাহকারী এবং তাদের সরবরাহে কখনো দেরি না করার রেকর্ড রয়েছে।

এ ছাড়া, যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে ইরাক তেল উৎপাদন কমিয়েছে; সৌদি আরব অপরিশোধিত তেল অন্য পথে পাঠাচ্ছে; ফুজাইরাহ বন্দরের কাছে শত শত ট্যাংকার অপেক্ষা করছে। হামলার পর ওই বন্দরটিতে এখনো আগুন জ্বলছে এবং সেখান থেকে বের হওয়ার নিরাপদ কোনো পথ নেই। তেল, গ্যাস এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈচিত্র্যপূর্ণ অর্থনীতি, বৃহৎ বিনিয়োগ এবং উদার সামাজিক নীতি জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। সেই ধারণা হঠাৎ করে ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে কিছু ক্ষতি হয়তো আর কখনো পূরণ করা সম্ভব হবে না।

ইরান-উপসাগরীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

তবে এই যুদ্ধ আবারও বড় একটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। সেটা হলো, এই যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সম্পর্ক কেমন হবে?

বছরের পর বছর ধীরে ধীরে শান্তিতে ফেরার চেষ্টা চলার পর, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো ভৌগোলিক এবং পারস্পরিক স্বার্থে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেছিল। সেই ভঙ্গুর আস্থা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক মডেল, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনীতি—যা দীর্ঘ সময় ধরে স্থির ধরে নেওয়া হয়েছিল—সবই অস্থিতিশীল হয়ে গেছে।

যুদ্ধ শিগগিরই থামলেও, ইরানের সঙ্গে কৌশলগত ঝুঁকি নেওয়ার যুগ শেষ হয়ে গেছে। সামনে আরও সতর্ক এবং নিরাপত্তাভিত্তিক উপসাগরীয় যুগ অপেক্ষা করছে।