ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের সদস্যরা যুদ্ধর মহড়া দিচ্ছেন
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের সদস্যরা যুদ্ধর মহড়া দিচ্ছেন

নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইরান কতটা শক্তি দেখাতে পারবে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর চার মাস পেরিয়ে গেছে। যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কাতারের দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন ইরানি কর্মকর্তারা। ইসরায়েল এ আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করছে।

গত ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর এ আলোচনা শুরু হয়। তবে এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরও দুই পক্ষের মধ্যে সীমিত আকারে গোলাবর্ষণ ও নতুন করে যুদ্ধ শুরুর হুমকি অব্যাহত রয়েছে।

ইসরায়েল ইরানে আবারও বড় ধরনের সামরিক হামলা শুরু ও দেশটির অবকাঠামো ধ্বংস করতে সবচেয়ে বেশি উদগ্রীব বলে মনে হচ্ছে। গত সোমবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সাংবাদিকদের বলেন, ইতিমধ্যে হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী এখন ফাইটার জেট মোতায়েনের আদেশের অপেক্ষায় আছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ইসরায়েল কাৎজ সাংবাদিকদের বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি মনে করেন, ইরানের সঙ্গে এ আলোচনা ফলপ্রসূ হবে না কিংবা ইরান যদি ইসরায়েলে হামলা করে, তাহলে আবার তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ শুরু হতে পারে।

এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন শুরু হয়। সেদিনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয়। যুদ্ধের প্রথম দিন থেকে এ পর্যন্ত মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

ইসরায়েল কাৎজ বলেন, ইসরায়েল মোজতবা খামেনিকে হত্যার জন্য চিহ্নিত করে রেখেছে।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ হুমকির জবাবে বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘আমাদের জনগণ ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকির তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী জবাব দেওয়া হবে।’

এত দিন বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্রধারী দুটি দেশের সঙ্গে অসম যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল ইরান। নতুন করে আবার যুদ্ধ শুরু হলে তেহরান কী করবে? দেশটির সামরিক সক্ষমতার বর্তমান অবস্থা কেমন?

এ বছর ইসলামী বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকীতে তেহরান অস্ত্র প্রদর্শন করে

হাজার হাজার হামলার পর ইরানের কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে

৪০ দিনের কম সময়ের তীব্র হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা প্রায় ১০ হাজার ৮০০টি হামলা চালিয়ে প্রায় ৪ হাজার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে।

জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও কমান্ডারদের নিশানা করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষাশিল্পের ভিত্তি, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং কমান্ড ও যোগাযোগ কেন্দ্রগুলোয় আঘাত হেনেছে। এ ছাড়া দেশটির নৌব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছে।

তবে শীর্ষ নেতাদের বড় অংশ নিহত হওয়ার পরও ইরানের সামরিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। সামরিক হামলা চালানো থেকে ইরানকে বিরত রাখা যায়নি। ইরানি কর্তৃপক্ষ সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে সরকারি কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে স্যাটেলাইট চিত্র, হামলার যাচাই করা ভিডিও ও স্থানীয় প্রতিবেদনগুলো থেকে স্পষ্ট যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতেই এ সুপরিকল্পিত অভিযান চালানো হয়েছিল।

মাটির ওপরে-নিচে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ছোট-বড় বহু কারখানা, গুদাম ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। সেই সঙ্গে স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোর পাহারায় থাকা স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্রের প্রোপেল্যান্ট মোটর ও নিখুঁত নিশানাব্যবস্থার যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাগুলোও ধ্বংস করা হয়েছে।

৪০ দিনের কম সময়ের তীব্র হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা প্রায় ১০ হাজার ৮০০টি হামলা চালিয়ে প্রায় ৪ হাজার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে।

যুদ্ধের শুরুর দিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল, ইরানের ৬০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র ও প্রায় ২৫০টি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। হামলার একটি বড় অংশ চালানো হয়েছিল রাজধানী তেহরানে, যেখানে ইসরায়েল আকাশসীমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছিল।

যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বেশি বোমাবর্ষণ করা জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে তেহরানের নিকটবর্তী পারচিন ও খোজির সামরিক কমপ্লেক্স, দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাসের নৌঘাঁটি ও বন্দর কমপ্লেক্স, কারাজের কাছের ফাত বিমানঘাঁটি এবং ইসফাহান, ইয়াজদ ও শাহরুদের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো।

ইরানজুড়ে অসংখ্য বিমানবন্দর, নৌবন্দর, সেতু ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যেই মার্কিন সরকার ইরানে একটি স্থল অভিযানের সম্ভাবনার কথাও বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে, যার জন্য বিপুল সেনাও মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে মার্কিন প্রশাসনের ধারণা, বিমান ও নৌ অভিযানের চেয়ে স্থল অভিযান অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান ব্র্যাড কুপার গত মে মাসে দেশটির হাউস কমিটি অন আর্মড সার্ভিসেসের কাছে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌ-প্রতিরক্ষাশিল্প খাতের ৮৫ শতাংশের বেশি ধ্বংস হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ নীতি ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে নতুন যুদ্ধবিমান কেনা বা নিজেদের প্রযুক্তিতে তা তৈরি করতে না পারায় ইরান এত দিন পুরোনো আমলের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে। হামলায় দেশটির এসব যুদ্ধবিমানের বেশির ভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি বেশ কিছু হেলিকপ্টার ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে তিনি ইরানের নৌবাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছেন। সেন্টকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ১৫৫টির বেশি নৌযান ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ‘আইআরআইএস দেনা’ নামের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া। ভারতের ‘মিলান ২০২৬’ নৌমহড়া থেকে ফেরার পথে দক্ষিণ শ্রীলঙ্কার আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন সাবমেরিন থেকে দুবার আঘাত হেনে নিরস্ত্র যুদ্ধজাহাজটিকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

জাহাজে থাকা ১৩৬ জন ক্রুর মধ্যে ১০৪ জন নিহত হন। ২০ জন নাবিকের মরদেহ উদ্ধার করা যায়নি। গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকিতে এক জনসমাবেশে ট্রাম্প উল্লাস প্রকাশ করে বলেন, ইরানি জাহাজগুলো ধ্বংস না করে মার্কিন সামরিক বাহিনী কেন নিজেদের ব্যবহারের জন্য সেগুলো দখলে নেয়নি, তা নিয়ে তিনি জেনারেলদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

যুদ্ধের সময় মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী দীর্ঘ তালিকা ধরে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় নিরবচ্ছিন্নভাবে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তেল ও গ্যাসক্ষেত্র, পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকেন্দ্র, শিল্প কমপ্লেক্স, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি শোধনাগার, জ্বালানি ডিপো, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র ও আবাসিক ভবন।

অভ্যন্তরীণ নীতি ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে নতুন যুদ্ধবিমান কেনা বা নিজেদের প্রযুক্তিতে তা তৈরি করতে না পারায় ইরান এত দিন পুরোনো আমলের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে। হামলায় দেশটির এসব যুদ্ধবিমানের বেশির ভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি তাদের বেশ কিছু হেলিকপ্টার ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

এপ্রিলের শুরুতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ইস্পাত উৎপাদনক্ষমতার ৭০ শতাংশ ধ্বংস করে দিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে এ ইস্পাত ব্যবহার করা হতো বলে তিনি যুক্তি দেন। হামলায় দেশটির সবচেয়ে বড় দুটি ইস্পাত কারখানা খুজেস্তান ও মোবারেকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

সে সময় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসালুয়েহ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সসহ অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে ভয়াবহ হামলার ফলে ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানিসক্ষমতার ৮৫ শতাংশের বেশি অকেজো হয়ে পড়েছে।

ইরানের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা কয়েক মাসের মধ্যে এ খাতের উৎপাদনসক্ষমতা আংশিক ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে বেশ কয়েক বছর সময় লাগবে এবং এতে শত শত কোটি ডলারের প্রয়োজন হবে।

১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ-অবরোধের মূল উদ্দেশ্যই ছিল, দেশটির ওপর চাপ বাড়িয়ে দেওয়া এবং তাদের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। এ কঠোর অবরোধের ফলে ইরানের প্রায় ৯ কোটি মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতি ও চরম অর্থনৈতিক সংকটের বোঝা চেপে বসেছে।

তবে ট্যাংকারট্র্যাকার্সের তথ্য অনুযায়ী, দুই সপ্তাহ আগে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের পর থেকে এ পর্যন্ত ইরান পাঁচ কোটি ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে।

ইরানের এক অজ্ঞাত স্থান থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ ও পরীক্ষা। ৯ মার্চ, ২০১৬

যা কিছু অক্ষত এবং নতুন করে সচল হয়েছে

দেশজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরান উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে। একই সঙ্গে যেসব জায়গায় দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, সেখানে পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।

সরকারি কর্মকর্তা, মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মাটির নিচের ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে। এর মধ্যে কিছু নেটওয়ার্ক গ্রানাইট পাথরের পাহাড় কেটে মাটির অনেক গভীরে তৈরি করা হয়েছিল।

হামলায় এ ধরনের বহু ঘাঁটির মাটির ওপরে থাকা স্থাপনা এবং টানেলের প্রবেশপথগুলো বোমায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তবে এর মধ্যে বেশির ভাগ প্রবেশপথই আবার উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং সেখান থেকে কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস মে মাসে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থিত প্রায় সব কটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি আবারও সচল করা হয়েছে। সেখানকার মাটির নিচের প্রায় ৯০ শতাংশ স্থাপনা পূর্ণাঙ্গ বা আংশিকভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে।

ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য পরবর্তী বিমান হামলা থেকে রক্ষা করতে পারচিনের ভেতরে অবস্থিত তালেগান ২-এর মতো কিছু সামরিক স্থাপনাকে নতুন কংক্রিট ও মাটির দেয়াল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

অবশ্য মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, অস্ত্র তৈরির কারখানায় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি হামলার কারণে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন তৈরি ও মজুত করার সক্ষমতা কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে।

তবে মে মাসের শেষের দিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, ইরানের সামরিক বাহিনী অনুমানের চেয়ে অনেক দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠিত করছে এবং কিছু কিছু কারখানায় ড্রোনের উৎপাদন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ইরানের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চারের মজুত এখনো অক্ষত রয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমগুলোর এমন দাবি অস্বীকার করেছে সেন্টকম।

যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে আইআরজিসি এবং দেশটির নিয়মিত সেনাবাহিনী যৌথভাবে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটি থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোয় শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল। তবে পরবর্তীকালে হামলার সংখ্যা দিনে কয়েক ডজনে নামিয়ে আনা হয়।

ইরানের সেনাবাহিনীর নির্বাহী বিভাগের ডেপুটি কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলিরেজা শেখ এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে জানান, ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে তাঁদের ড্রোন উৎপাদন ১০ গুণ বেড়েছে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি।

ইরানি কমান্ডারদের দাবি, বিশ্বের অন্যতম বড় সামরিক পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর তাঁরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত। এ অভিজ্ঞতা তাঁদের অবশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে সাহায্য করছে।

ইরানের আর কতটি যুদ্ধবিমান বর্তমানে সচল রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে দেশটির বিমানবাহিনীর কমান্ডাররা নতুন সামরিক বিমান কেনার জন্য ইতিমধ্যে রুশ ও চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।

যুদ্ধে শত্রুর দুই শতাধিক ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। এর মধ্যে আরাশ-ই কামানগির নামের একটি নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত উন্নত এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। পারস্য পুরাণের এক বীরের নামানুসারে এ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার নামকরণ করা হয়েছে, যিনি বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।

এ ছাড়া ইরানের অন্যান্য কম উচ্চতার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আকাশপথে বেশ কিছু বড় ধরনের প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এফ-৩৫ ফাইটার জেট, একটি এফ-১৫ই এবং একটি এ-১০ ওয়ার্থহগ যুদ্ধবিমানকে পূর্ণাঙ্গ বা আংশিকভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট বা প্রতিহত করার দাবি করা হয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে যে যুদ্ধের সময় ইরানি বিমানবাহিনীর পাইলটরা সীমিত পরিসরে কিছু বিমান হামলাও চালিয়েছেন। এর মধ্যে প্রচলিত সাধারণ বোমা ব্যবহার করে কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্যাম্প বুহরিংয়ে একটি সফল বোমাবর্ষণের খবরও পাওয়া গেছে।

ইরানের আর কয়টি যুদ্ধবিমান বর্তমানে সচল, তা স্পষ্ট নয়। তবে দেশটির বিমানবাহিনীর কমান্ডাররা নতুন সামরিক বিমান কেনার জন্য ইতিমধ্যে রুশ ও চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।

বড় যুদ্ধজাহাজ ও মাইন স্থাপনকারী বেশ কিছু নৌযান ডুবে যাওয়ার পরও আইআরজিসি তাদের ছোট ছোট নৌযান ও দ্রুতগামী স্পিডবোট ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালিতে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ওমানের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি বিকল্প রুট ব্যবহার করে যেসব বাণিজ্যিক জাহাজ বের হওয়ার চেষ্টা করছিল, সেগুলোকে থামাতে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপগুলোয় মার্কিন বাহিনী রাডার ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালানোর পর ইরানও পাল্টা বাহরাইন ও কুয়েতের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে যে হরমুজ প্রণালির কিছু অংশে এখনো প্রচুর মাইন ছড়ানো রয়েছে। অন্যদিকে, বোমায় বিধ্বস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা উচ্চ মানসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ উদ্ধারযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা বেশ সময়সাপেক্ষ।

এদিকে চলমান সংঘাতের কোনো নির্ভরযোগ্য সমাধান না এলে সব পক্ষই আবারও যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর আরও বড় ধরনের হামলা চালানো হবে।