ইরানের এক হামলার পর সৌদি আরবের রিয়াদ শহরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে। ৫ মার্চ, ২০২৬
ইরানের এক হামলার পর সৌদি আরবের রিয়াদ শহরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে। ৫ মার্চ, ২০২৬

ইরানি ট্যাংকারে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আক্রমণের হুমকি বিপ্লবী গার্ডের

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা আক্রমণ চালানো হবে।

ইরানি গণমাধ্যমের বরাতে গতকাল শনিবার এ তথ্য জানানো হয়েছে। এর এক দিন আগে ওমান উপসাগরে দুটি ইরানি ট্যাংকারে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

আইআরজিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইরানের ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজে যেকোনো হামলার জবাবে এ অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং শত্রুপক্ষের জাহাজে জোরালো হামলা চালানো হবে।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার বলেছেন, ওয়াশিংটনের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি ‘সম্ভবত রাতের মধ্যেই’ ইরানের জবাব পাবেন বলে আশা করছেন।

তবে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরান কোনো জবাব পাঠিয়ে থাকলেও গতকাল পর্যন্ত তার কোনো প্রকাশ্য ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি; বরং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বলে জানিয়েছে ইরানের বার্তা সংস্থা আইএসএনএ।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে আরাগচি বলেন, ‘পারস্য উপসাগরে মার্কিন বাহিনীর সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন কূটনৈতিক সমাধানের পথে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ বাড়িয়েছে।’

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিমান ওমান উপসাগরে ইরানি পতাকাবাহী দুটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেগুলো বিকল করে দেয়। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, জাহাজ দুটি ইরানের ‘বন্দর অবরোধ’ উপেক্ষা করেছিল।

ইরানের এক সামরিক কর্মকর্তা স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, এ ঘটনার জবাবে ইরানি নৌবাহিনীও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

এর আগের রাতেই হরমুজ প্রণালিতে আরেক দফা উত্তেজনা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চায় তেহরান।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুটের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানকে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ১০ সপ্তাহ আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাতের স্থায়ী সমাধান নিয়ে আলোচনার একটি পথ তৈরি করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল এলসিআইয়ের সাংবাদিক মার্গো হাদ্দাদ গতকাল বলেন, সংক্ষিপ্ত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাঁকে বলেছেন, খুব শিগগির তিনি ইরানের জবাব জানতে পারবেন বলে আশা করছেন।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শুক্রবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব এখনো ‘পর্যালোচনা’ করা হচ্ছে।

তেল ছড়িয়ে পড়েছে

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গতকাল কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

এর আগের দিন কাতারের নেতা মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্থায়ী শান্তিপ্রচেষ্টার বিষয়টি আলোচনায় আসে। যুদ্ধ চলাকালে কাতারেও মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান।

এদিকে স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের উপকূলে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। গ্লোবাল মনিটরিং প্রতিষ্ঠান অরবিটাল ইওএস জানিয়েছে, দ্বীপটির পশ্চিম উপকূলে প্রায় ৫২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তেলের আস্তরণ ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে।

তবে কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অবজারভেটরি জানিয়েছে, গতকালের মধ্যে তেলের আস্তরণ অনেক কমে গেছে এবং সম্ভবত তেল অবকাঠামো থেকে লিকেজের কারণে এটি হয়েছে।

খারগ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দু এবং দেশটির সংকটাপন্ন অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং তেলের দাম বেড়ে যায়।

পরে জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করে। আর ট্রাম্প এ সপ্তাহে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে চালানো স্বল্পমেয়াদি মার্কিন নৌ অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বন্ধ করে দেন।

লেবানন সীমান্তেও উত্তেজনা

এদিকে লেবানন সীমান্তেও যুদ্ধবিরতি চাপে রয়েছে। প্রতিদিনই ইসরায়েল ও ইরানসমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে।

গতকাল দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৈরুতের দক্ষিণের একটি মহাসড়কেও বিমান হামলা চালানো হয়েছে, যা হিজবুল্লাহর ঐতিহ্যগত ঘাঁটির বাইরের এলাকা।

তিন সপ্তাহ আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এটিকে সবচেয়ে তীব্র হামলাগুলোর একটি বলা হচ্ছে।

হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, চলমান হামলার জবাবে তারা অন্তত দুই দফায় ড্রোন দিয়ে উত্তর ইসরায়েলে সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, বিস্ফোরকবোঝাই কয়েকটি ড্রোন তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। এতে এক সেনা গুরুতর এবং আরও দুজন মাঝারি মাত্রায় আহত হয়েছেন।

এ উত্তেজনার মধ্যেই আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ১৯৪৮ সাল থেকে এ দুই দেশ একরকম যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। তবে হিজবুল্লাহ এ আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করছে।