
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানকে একসময় নিজের ‘গুরু’ বলে পরিচয় দিতেন। অঞ্চলটির ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ মিলেমিশে তাঁরাই নির্ধারণ করছিলেন। তাই কিছুদিন আগপর্যন্ত দেশ দুটিকে বন্ধু বলে মনে করা হতো। কিন্তু সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের বাসনা, কৌশলগত অবস্থান ও আদর্শিক কারণে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিধর দেশ দুটির মধ্যে ফাটল বেড়েছে। এসব দ্বন্দ্বের পটভূমি জলপথের নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ওয়াশিংটনের করিডর পর্যন্ত বিস্তৃত। ইয়েমেনকে ঘিরে সম্প্রতি তা স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেন ছাড়া তেল উৎপাদন, সুদান ও হর্ন অব আফ্রিকা নিয়ে রিয়াদ ও আবুধাবি পরস্পরবিরোধী শিবিরে রয়েছে। ইয়েমেন ইরানের সহায়তাপুষ্ট হুতিবিরোধী সামরিক জোটের অংশ। তবে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জোট সরকারের ভেতরে তারা পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছে।
রিয়াদ ও আবুধাবির বিরোধী অবস্থান নিয়ে ইয়েমেন ও উপসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বারা শিবান বলেন, দেশ দুটির মধ্যে গভীর কৌশলগত ও আদর্শিক পার্থক্য রয়েছে। তাঁর মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন ও সুদানকে ‘বিভক্ত’ করতে চায় আমিরাত। দেশটির ধারণা, এতে সেখানে তার প্রভাব বাড়বে। আমিরাতের এ মনোভাব নিয়ে সৌদি আরব উদ্বিগ্ন। সৌদি আরব দেশ দুটিতে বিভক্তির বদলে বিদ্যমান কর্তৃপক্ষ টিকিয়ে রাখার পক্ষে।
বারা শিবান বলেন, আমিরাত মুসলিম ব্রাদারহুড ও রাজনৈতিক ইসলামকে কঠোরভাবে দমনের পক্ষপাতী। দেশটি পুরো অঞ্চলে নিজেদের এ দৃষ্টিভঙ্গি ছড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু সৌদি আরব এসব বিষয়ে আমিরাতের সঙ্গে একমত নয়।
সৌদি আরব নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি মনে করে। দেশটি এই আধিপত্য ধরে রাখতে চায়। এ বিষয়ে বারা শিবান বলেন, আমিরাতের মতো ব্যাপক প্রভাবশালী দেশ যখন (আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক) কোনো দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে এবং নানা দেশের রাষ্ট্রবহির্ভূত বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে আমিরাতকে সম্পর্ক তৈরি করতে দেখা যায়, তা সৌদির জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে।
ইয়েমেন নিয়ে সৌদি ও আমিরাতের বিরোধ সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত জোট সরকারের আমিরাত সমর্থনপুষ্ট অংশ সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) সম্প্রতি প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ হাজরামউত ও মাহরা প্রদেশের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। এসব অংশ এত দিন দেশটির সৌদির প্রতি অনুগত সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
ইয়েমেনে বিদ্রোহী হুতিদের দমনের জন্য সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক সামরিক জোট আমিরাতও রয়েছে। কিন্তু গত মঙ্গলবার জোটটি ইয়েমেনের অস্ত্রবাহী একটি জাহাজে বোমা হামলা চালিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এসব অস্ত্র ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে পাঠানো হচ্ছিল।
তবে হুতিবিরোধী সামরিক জোটের ফাটল কয়েক বছর আগেই দেখা দিয়েছিল। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে জোট থেকে নিজেদের বাহিনীর অধিকাংশ সেনাকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ওয়াশিংটনে বৈঠকের পর গত নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় তিন বছর ধরে চলা সুদান সংঘাত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেন। ট্রাম্পের এ প্রতিশ্রুতি আমিরাতের কিছুটা বিরুদ্ধে যায়।
আফ্রিকার সোনা ও জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ দেশ সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দেশটির সরকারি বাহিনী সুদানিজ আর্মড ফোর্সেস (এসএএফ) ও বিদ্রোহী আধা সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) ভয়াবহ এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। বলা হয়, এ সংঘাতে রিয়াদ সেনাবাহিনী এসএএফের পক্ষে রয়েছে। অন্যদিকে আবুধাবি অস্ত্রসহ সর্বাত্মকভাবে আরএসএফকে সহায়তা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। আরএসএফের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এমন বাহিনীকে সহায়তা দেওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে চাপে আছে আমিরাত।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা গবেষক এমাদেদ্দিন বাদির মতে, ইয়েমেনে এসটিসির সাম্প্রতিক অগ্রগতি আমিরাতের একান্ত চাওয়ার কারণে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটা ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিশোধ ছাড়া আর কিছু নয়।’ ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি যুবরাজের বৈঠকের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এটা ঘটেছে। আমিরাত মনে করছে, তাদের ওপর চাপ তৈরি করতে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করছেন সৌদি যুবরাজ।
লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে হর্ন অব আফ্রিকার অবস্থান। কৌশলগত অবস্থানের কারণে অঞ্চলটি নতুন করে প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের দেশ ইথিওপিয়া ও সোমালিয়া থেকে আলাদা হতে চাওয়া সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আবুধাবি ২০১৭ সাল থেকে সোমালিল্যান্ডের বেবেরা বন্দরে একটি সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করছে।
অন্যদিকে সোমালিয়ায় নানাভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে সৌদি আরব।
আব্রাহাম চুক্তির অধীনে ২০২০ সালে আমিরাতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপনকারী ইসরায়েল গত সপ্তাহে সোমালিল্যান্ডকে সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্ব–স্বীকৃত দেশটিকে জাতিসংঘের সদস্য কোনো দেশের এটাই প্রথম স্বীকৃতি। সৌদি আরব ও ২০টি মুসলিম দেশ ইসরায়েলের স্বীকৃতির নিন্দা জানালেও আমিরাত তা করেনি।
সৌদি আরব ও আমিরাত উভয়ে জ্বালানি তেল উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশের সংগঠন ওপেক প্লাসের সদস্য। তেল উৎপাদন বিতর্কে ২০২১ সালে আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়। এমন এক সময়ে তাদের মধ্যে এ বিতর্ক হলো, যখন দেশ দুটি নিজেদের অর্থনীতিকে তেলবহির্ভূত খাতের বাইরে ঢেলে সাজাতে চেষ্টা জোরদার করে।
এই বিতর্কের পর থেকে বহুজাতিক কোম্পানিকে আকর্ষণের তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে রিয়াদ। এক নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, যেসব বিদেশি কোম্পানি সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করবে, তাদের আঞ্চলিক সদর দপ্তর সেখানে স্থাপন করতে হবে। এতে কোনো কোনো কোম্পানি নিজেদের আঞ্চলিক সদর দপ্তর আমিরাত থেকে সৌদিতে স্থানান্তরিত করেছে।
সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’–এ উড়োজাহাজ, পর্যটন ও সংবাদমাধ্যম খাত নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব নতুন উড়োজাহাজ সংস্থা, বিমানবন্দর ও বিনোদন প্রকল্প চালু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান আমিরাতের একই খাতের প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।