
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্র ও ভিডিও থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, ইরানের হামলার পরিধি যতটা ব্যাপক বলে যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে, প্রকৃত চিত্র তার চেয়ে অনেক বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে একযোগে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।
মার্কিন–ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিশানা করে ইরান। এতে এসব দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ ও রাডার ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এসব ব্যাটারি একটি ‘অত্যন্ত জটিল’ আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু, যা দ্রুত বা সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।মার্ক মেলেট, সাবেক প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল, আয়ারল্যান্ডের প্রতিরক্ষা বাহিনী
আর মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের হিসাবে, অপারেশন এপিক ফিউরি শুরুর পর থেকে তারা ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মার্কিন স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে তাঁর সামরিক বাহিনীর সাফল্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন ঘাঁটির জন্য এখন আর ‘নিরাপদ কোনো স্থান’ নয়।
অথচ হোয়াইট হাউস বারবার দাবি করেছে, ইরানের সামরিক বাহিনীকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন স্থাপনাগুলোতে যে ধরনের ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে, তা থেকে বোঝা যায়, তেহরানের পাল্টা হামলা মার্কিন কর্মকর্তাদের আগের স্বীকারোক্তির চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত ও ব্যাপক ছিল।
এ বিষয়ে বিবিসি ভেরিফাইয়ের অনুসন্ধানের পক্ষ থেকে একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু ‘নিরাপত্তার কারণে’ তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত-সংক্রান্ত স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ সীমিত করার চেষ্টা করেছে। এ লক্ষ্যে প্রধান স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেটকে তারা ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ এলাকার নতুন স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ জানায়।
এ পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে প্ল্যানেট বলেছে, তারা চায় না তাদের স্যাটেলাইট ছবি ‘বৈরী পক্ষের’ হাতে পড়ে মিত্রদেশ ও ন্যাটো-অংশীদার বাহিনী কিংবা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে ব্যবহৃত হোক।
বিবিসি ভেরিফাই ইরানি হামলায় মার্কিন সামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খোঁজখবর রাখতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের স্যাটেলাইট চিত্রের পাশাপাশি প্ল্যানেটের পুরোনো ছবি ব্যবহার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসব সামরিক স্থাপনা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, বাহরাইন ও ওমানে অবস্থিত।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের হিসাবে, অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু হওয়ার পর তারা ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
বিবিসি ভেরিফাই যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, কোনো কোনো বিশ্লেষক এ সংখ্যা ২৮ পর্যন্ত হতে পারে বলে মনে করছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত মূল্যবান লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে আরব আমিরাতের আল রুওয়াইস ও আল সাদার এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে থাকা তিনটি অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যাটারি সিস্টেম রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের মাত্র আটটি ‘টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড ব্যাটারি রয়েছে বলে জানা যায়, যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে মোতায়েন করা আছে। এ ব্যবস্থা তৈরি করতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার (১ বিলিয়ন ডলার) খরচ হয়। প্রতিটি ব্যাটারি পরিচালনায় প্রায় ১০০ সেনার একটি দল প্রয়োজন হয়। আর এটি থেকে উৎক্ষেপণ করা প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ (প্রায় ১২ দশমিক ৭ মিলিয়ন) ডলার।
আয়ারল্যান্ডের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল মার্ক মেলেট বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, এসব ব্যাটারি একটি ‘অত্যন্ত জটিল’ আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু, যা দ্রুত বা সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহকারী ও নজরদারি বিমানে ইরানি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ বিমানবন্দর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বিমান ও গর্ত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।
ইরান যদি নতুন করে হামলা চালায়, তবে সংঘাতের শুরুর দিকে (যুক্তরাষ্ট্রের) যে পরিমাণ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ছিল, এবার তার সামান্য অংশ দিয়ে তা মোকাবিলা করতে হবে।কেলি গ্রিকো, স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ভূস্থানিক ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান মায়ারের (এমএআইএআর) একজন বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিগ্রস্ত একটি বিমানকে ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ নজরদারি বিমান হিসেবে শনাক্ত করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি প্রতিস্থাপন করতে ৭০ কোটি (৭০০ মিলিয়ন) ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
অন্য জায়গার মধ্যে কুয়েতের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটি ও ক্যাম্প আরিফজানেও হামলা চালিয়েছে ইরান। সংঘাতের সময়ে একাধিকবার আক্রান্ত হওয়া আলী আল সালেম ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্রে জ্বালানি মজুত রাখার ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংকার, বিমানের হ্যাঙ্গার ও সেনাদের থাকার জায়গা শনাক্ত করেছেন মায়ারের বিশ্লেষকেরা।
পাশাপাশি ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি জেনস ক্যাম্প আরিফজানে স্যাটেলাইট যোগাযোগ যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি শনাক্ত করেছে।
মার্কিন স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে মে মাসে পেন্টাগনের একটি আনুমানিক হিসাবে অপারেশন এপিক ফিউরির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার (২৯ বিলিয়ন ডলার)। এ অর্থের এক বড় অংশ এ সংঘাতে ধ্বংস হওয়া ‘সরঞ্জাম মেরামত বা প্রতিস্থাপনের খরচে’ ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির মতে, প্রকৃত খরচ সম্ভবত এর চেয়েও বেশি।
পেন্টাগনের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৪২টি বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে এফ-১৫ ও এফ-৩৫ ফাইটার জেট, ২৪টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং একটি এ-১০ অ্যাটাক প্লেন রয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ব্যয়বহুল যুদ্ধাস্ত্রের তুলনায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে কম দামি ও সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য ড্রোন ব্যবহার করেছে।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের সঙ্গে আলাপকালে বিশেষজ্ঞরা জানান, সংঘাত চলাকালে ইরানের যুদ্ধকৌশল পরিবর্তিত হয়েছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শহর ও ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ঢালাওভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পথ থেকে সরে এসে আরও নিখুঁত ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যমুখী হামলার দিকে এগিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক কেলি গ্রিকো বলেন, ‘শুরুর দিকে ইরানের হামলাগুলো মূলত সংখ্যার দিক থেকে বেশি ছিল। ব্যাপক সংখ্যার মাধ্যমে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত করার জন্য এভাবে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।’
এই বিশ্লেষকের মতে, ‘তবে কয়েক দিনের মধ্যে ইরান আরও ছোট ও নিখুঁত লক্ষ্যমুখী আক্রমণের দিকে চলে যায়। নির্দিষ্ট উচ্চ মূল্যের লক্ষ্যবস্তুর জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বাঁচিয়ে রেখে তারা এমন সব জায়গায় আক্রমণ কেন্দ্রীভূত করে, যেখানে এগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে কাছাকাছি পড়লেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত হয়।’
মায়ারের একজন বিশ্লেষক বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, তেহরানের যুদ্ধকৌশল যখন পরিবর্তিত হচ্ছিল, তখন ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সীমার বাইরে থাকা নিজেদের বিমানগুলো সরিয়ে না নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘যুদ্ধের শুরুর দিকে একধরনের আত্মতুষ্টির পরিচয় দিয়েছে বলে মনে হয়।’
এই বিশ্লেষক বলেন, প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন বিমানগুলো ধ্বংস হওয়ার আগেও সেখানে হামলা হয়েছিল।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি বলেছেন, ‘এ অঞ্চলের কোনো জাতি ও ভূখণ্ড মার্কিন ঘাঁটির জন্য আর ঢাল হিসেবে কাজ করবে না।...সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো নিরাপদ স্থান থাকবে না। দিন দিন তারা তাদের আগের অবস্থান থেকে আরও দূরে ছিটকে পড়বে।’
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। এ চাপ তৈরির ঠিক কয়েক দিন আগে মোজতবা খামেনির এ মন্তব্য সামনে এল।
ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) গত বৃহস্পতিবার বলেছে, দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে বিমান হামলার পর তেহরানও একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
গ্রিকো সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে এবং আবার যুদ্ধ শুরু হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বর্তমান ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাগুলো সে ঝুঁকিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।সংঘাতের ফলে মার্কিন ও তার অংশীদারদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে শেষ হয়ে গেছে।’
এ বিশেষজ্ঞের মতে, ‘এই মজুত দ্রুত পূরণ করার কোনো সহজ উপায় নেই। এর অর্থ হলো, ইরান যদি নতুন করে হামলা চালায়, তবে সংঘাতের শুরুর দিকে (যুক্তরাষ্ট্রের) যে পরিমাণ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, এবার সেটার মাত্র সামান্য অংশ দিয়ে তা মোকাবিলা করতে হবে।’