
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের পাল্টাপাল্টি হামলা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এসব হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজনই শিশু।
সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইফ এলাকায় হুতিদের একটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এতে সৌদি আরবে বসবাসকারী ইয়েমেনি এক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে দুজন।
হুতিরা হামলা জোরদার করার পর চলতি মাসে সৌদি আরবে এই প্রথম কোনো প্রাণহানির ঘটনা প্রকাশ করা হলো।
ইয়েমেনে হুতিরা গতকাল দাবি করেছে, সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান তাইজ প্রদেশে তিনটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালিয়েছে।
হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, তাইজে একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ইয়েমেনের আবস শহরে হামলায় একজন আহত হয়েছেন।
পরে হুতিদের সমর্থক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সৌদি-সমর্থিত ‘ভাড়াটে যোদ্ধাদের’ হামলায় তিন শিশু নিহত এবং বেশ কয়েকজন ইয়েমেনি নাগরিক আহত হয়েছেন। ‘ভাড়াটে যোদ্ধা’ বলতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারপন্থী বাহিনীকে বোঝানো হয়েছে।
ইরানের অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হুতি হামলার পর সৌদি আরব বেইজিংয়ের কাছে সহায়তা চাওয়ায় চীন গোপনে ইরানি কর্মকর্তাদের হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছে।
তাইফে হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে কুয়েত ও বাহরাইন। কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি’ প্রকাশ করেছে। বাহরাইনও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের হামলা এবং তাইফে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার নিন্দা জানিয়েছে।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র আনোয়ার এল আনৌনি হুতিদের ‘সব ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার’ আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সৌদি আরবের প্রতি ‘পূর্ণ সংহতি’ প্রকাশ করেছেন।
সৌদি আরবের দাবি, হুতিরা মক্কার দিকে একটি ড্রোন পাঠিয়েছিল। সেটি প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
মক্কার পবিত্রতা ইয়েমেনের মানুষের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে সৌদি আরব মিথ্যাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।—আবদুল-মালিক আল-হুতি, হুতিদের নেতা
তবে হুতিদের নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। গতকাল টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘এটি একটি জঘন্য মিথ্যাচার।’ হুতিরা ইসলামের পবিত্রতম শহর মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে—সৌদি আরবের এমন দাবিকে তিনি ‘বড় ধরনের প্রচারণা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
আল-হুতি বলেন, মক্কার পবিত্রতা ইয়েমেনের মানুষের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে সৌদি আরব ‘মিথ্যাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে’ বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক ইউসুফ মাওরি বলেন, আল-হুতির ভাষণ শুধু ইয়েমেনের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া হয়নি। বিশ্ববাসীর কাছেও তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করতে চেয়েছেন যে সৌদি আরবের দাবি অনুযায়ী হুতিরা পবিত্র শহর মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করেনি।
এ উত্তেজনা অন্য আঞ্চলিক পক্ষগুলোকেও সংঘাতে টেনে নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা অংশীদার পাকিস্তান ও তুরস্ক। গত মাসে দেশ দুটির সঙ্গে সৌদি আরব একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে।
ভাষণে আল-হুতি আরও বলেন, ইয়েমেনে সংঘাতের সর্বশেষ পর্ব সৌদি আরব শুরু করেছে এবং হুতিরা আত্মরক্ষামূলক অবস্থান থেকে লড়াই করছে।
অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি বলেছেন, তাইজ, মারিব, লাহজ, আল-জাওফ, হাজ্জাহ, আল-বায়দা ও আল-দালেতে হুতিদের বাহিনী বড় ধরনের আঘাতের মুখে পড়েছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সাবার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে আল-আলিমি বলেছেন, লোহিত সাগর উপকূলে হুতিরা যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা সাময়িক। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সাবা এ খবর জানিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গতকাল এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর বিরুদ্ধে, বিশেষ করে মক্কার বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসন ‘নিন্দনীয় কাজ’।
তবে ‘মক্কার পথে থাকা’ একটি ড্রোন প্রতিহত করার ‘শুধু একটি দাবি’ হুতিদের ওই হামলার জন্য অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন ইসমাইল বাঘাই।
ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর বিরুদ্ধে, বিশেষ করে মক্কার বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসন নিন্দনীয় কাজ। তবে মক্কার পথে থাকা একটি ড্রোন প্রতিহত করার শুধু একটি দাবি হুতিদের ওই হামলার জন্য অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।—ইসমাইল বাঘাই, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র
ইসরায়েলের দিকে ইঙ্গিত করে বাঘাই আরও বলেন, ‘আমাদের এটিও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমাদের অঞ্চল “ফলস ফ্ল্যাগ” অভিযানের বহু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে।’
এদিকে ইরানের অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হুতি হামলার পর সৌদি আরব বেইজিংয়ের কাছে সহায়তা চাওয়ায় চীন গোপনে ইরানি কর্মকর্তাদের হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছে।
বেইজিং প্রকাশ্যে সংযম, সংলাপ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছে। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, চীনের ব্যক্তিগত বার্তা প্রকাশ্য অবস্থানের চেয়ে আরও কঠোর ছিল।
এ উত্তেজনা অন্য আঞ্চলিক পক্ষগুলোকেও সংঘাতে টেনে নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা অংশীদার পাকিস্তান ও তুরস্ক। গত মাসে দেশ দুটির সঙ্গে সৌদি আরব একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সাম্প্রতিক হুতি হামলার পর সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’ বাস্তবায়নের সময় এসেছে।
গতকাল পাকিস্তানি গণমাধ্যমকে দেওয়া আসিফের এ বক্তব্যের সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে ফোনে ‘আঞ্চলিক পরিস্থিতি’ নিয়ে কথা বলেছেন।